উত্তর আমেরিকা

ফ্লোরিডায় কিশোরদের জন্য ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে কঠোর বিধিনিষেধ

ফ্লোরিডা, ০৮ অক্টোবর – কিশোর-কিশোরীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি ও অনলাইন ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় মেটার মালিকানাধীন ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ চেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্য। ১৪ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের ব্যবহারের সময়ও নির্দিষ্ট করে দিতে চায় রাজ্যটি।

এ লক্ষ্যে বুধবার (৭ অক্টোবর) পাসকো কাউন্টির একটি আদালতে আবেদন করেছেন ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমেইয়ার। মামলার বিচার শেষ হওয়ার আগেই এসব বিধিনিষেধ কার্যকর করতে বিচারকের কাছে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা জারির আবেদন জানানো হয়েছে।

১৪ বছরের কম বয়সীদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরানোর দাবি

আদালতে দেওয়া আবেদনে ফ্লোরিডা বলেছে, মেটাকে ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে ১৪ বছরের কম বয়সী ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে হবে এবং তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দিতে হবে।

অন্যদিকে ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সী কিশোরদের জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে আরও একাধিক বিধিনিষেধ।

এর মধ্যে রয়েছে মেটার সব অ্যাপ মিলিয়ে দৈনিক সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টা ব্যবহারের সীমা। অর্থাৎ ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ মেটার অন্যান্য অ্যাপ ব্যবহারের সময় একসঙ্গে হিসাব করে দিনে দুই ঘণ্টার বেশি ব্যবহার করতে পারবে না কিশোররা।

বন্ধ করতে হবে ‘অটোপ্লে’ ও ‘ইনফিনিট স্ক্রল’

কিশোরদের ক্ষেত্রে ‘অটোপ্লে’ ও ‘ইনফিনিট স্ক্রল’-এর মতো ফিচার বন্ধ করারও দাবি জানিয়েছে ফ্লোরিডা।

অটোপ্লে ব্যবস্থায় একটি ভিডিও শেষ হওয়ার পর পরবর্তী ভিডিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু হয়। আর ইনফিনিট স্ক্রলের মাধ্যমে ব্যবহারকারী একের পর এক নতুন কনটেন্ট দেখতে থাকেন। ফ্লোরিডার অভিযোগ, এসব ফিচার তরুণ ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে পারে এবং অতিরিক্ত ব্যবহারের প্রবণতা বাড়াতে পারে।

এর পাশাপাশি ১৪ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের কাছে কোনো বিজ্ঞাপন না দেখানোর প্রস্তাবও রাখা হয়েছে।

ফ্লোরিডা চায়, মামলার বিচার চলার সময়ই এসব ব্যবস্থা কার্যকর করা হোক।

মেটার আপত্তি, প্রশ্ন উঠেছে ইউটিউব-টিকটক নিয়েও

ফ্লোরিডার উদ্যোগের বিরোধিতা করেছে মেটা। কোম্পানিটির এক মুখপাত্রের বক্তব্য, কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যদি লক্ষ্য হয়, তাহলে শুধু ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ওপর কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত নয়।

মেটা বিশেষভাবে ইউটিউব ও টিকটকের মতো অন্যান্য জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলেছে। কোম্পানিটির যুক্তি, অভিভাবকদের ক্ষমতায়ন এবং কিশোরদের সুরক্ষায় যদি সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়, তাহলে সব বড় প্ল্যাটফর্মকে একই নীতির আওতায় আনা উচিত।

মেটা আরও বলেছে, বহু বছর ধরে চলা একটি মামলায় ভিত্তিহীন অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাওয়ার পরিবর্তে কিশোরদের সুরক্ষায় অন্যান্য প্ল্যাটফর্মের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

মেটার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ ফ্লোরিডার?

ফ্লোরিডার অভিযোগ, মেটা জেনেশুনে এমনভাবে তাদের প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যাতে তরুণ ব্যবহারকারীরা এতে আসক্ত হয়ে পড়েন।

রাজ্যটির আরও দাবি, প্রতিষ্ঠানটি তাদের সেবার নিরাপত্তা নিয়ে ভোক্তাদের বিভ্রান্ত করেছে। তবে এসব অভিযোগ মেটা স্বীকার করেনি। কোম্পানিটির দাবি, কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তারা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে এবং বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছে। এখানেই মামলার বড় একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন ফিচার যদি ব্যবহারকারীদের দীর্ঘ সময় প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখে, তাহলে তরুণদের ক্ষেত্রে সেই নকশার দায় কতটা প্রযুক্তি কোম্পানির ওপর বর্তাবে?

৪৮ অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সমঝোতা, ফ্লোরিডা কেন আলাদা?

মেটার বিরুদ্ধে ফ্লোরিডার মামলা যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে চলা একাধিক আইনি পদক্ষেপের অংশ। বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের প্রভাব নিয়ে মেটার বিরুদ্ধে মামলা করেছে।

গত আগস্টে মেটা ওয়াশিংটন ডিসিসহ আরও ৪৮টি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সমঝোতায় পৌঁছায়। ওই সমঝোতার আওতায় প্রতিষ্ঠানটি সর্বোচ্চ ১৮ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ এবং কিশোর ব্যবহারকারীদের সুরক্ষায় কিছু পরিবর্তন আনতে সম্মত হয়।

তবে সমঝোতায় রাজি হলেও মেটা কোনো অনিয়মের অভিযোগ স্বীকার করেনি।

কোম্পানিটির অবস্থান, কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য তারা আগে থেকেই বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আসছে।

সমঝোতায় না গিয়ে মামলা চালিয়ে যাচ্ছেন উথমেইয়ার

রিপাবলিকান নেতা ও ফ্লোরিডার অ্যাটর্নি জেনারেল জেমস উথমেইয়ার অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোর সঙ্গে হওয়া সমঝোতায় যোগ না দিয়ে নিজের মামলাটি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।

আদালতে জমা দেওয়া নথিতে ফ্লোরিডা বলেছে, মেটার সঙ্গে হওয়া সমঝোতার শাস্তি ‘হাতে চড় মারার মতো সামান্য’। রাজ্যটির মতে, এমন শাস্তি মেটার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যবসা পরিচালনার স্বাভাবিক খরচ হয়ে উঠতে পারে এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের আচরণ ঠেকাতে যথেষ্ট কার্যকর হবে না।

ফ্লোরিডার অবস্থান হলো, শুধু আর্থিক শাস্তি নয়—ব্যবহারকারীদের জন্য সরাসরি ও কঠোর নিরাপত্তামূলক বিধিনিষেধ প্রয়োজন।

মেটার সমঝোতার চেয়েও কঠোর ফ্লোরিডার প্রস্তাব

ফ্লোরিডা যে বিধিনিষেধ চেয়েছে, তা মেটা অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যে সমঝোতা করেছে তার চেয়েও কঠোর। বিশেষ করে দৈনিক ব্যবহারের সময়সীমা শেষ হয়ে গেলে কিশোরদের বার্তা আদান-প্রদানের সুবিধাও বন্ধ করে দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি তাদের কোনো বিজ্ঞাপন দেখানো যাবে না।

ফ্লোরিডার যুক্তি, মেটা যখন অন্যান্য অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে সমঝোতায় গিয়ে প্ল্যাটফর্মে পরিবর্তন আনতে রাজি হয়েছে, তখন আরও কঠোর নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থা প্রযুক্তিগতভাবেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

সামনে বড় আইনি লড়াই

ফ্লোরিডার এই পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত শুধু একটি মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে কি না, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। কারণ কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ইতিমধ্যে সক্রিয় হয়েছে।

একদিকে ফ্লোরিডা বলছে, কিশোরদের সুরক্ষায় আরও কঠোর ব্যবস্থা জরুরি। অন্যদিকে মেটার প্রশ্ন, একই ধরনের ঝুঁকি থাকা ইউটিউব ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মগুলোকে বাদ দিয়ে শুধু ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ওপর কেন কঠোরতা আরোপ করা হবে?

আদালত ফ্লোরিডার অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন কীভাবে বিবেচনা করে, এখন সেদিকেই নজর। সিদ্ধান্তটি কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ওপর ভবিষ্যতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ কতটা কঠোর হতে পারে, সেই বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language