
টরন্টোর মেয়র নির্বাচনের ভোটগ্রহণের আর তিন সপ্তাহও বাকি নেই। ঠিক এমন সময় নির্বাচনী লড়াই থেকে সরে দাঁড়ালেন সাবেক ফেডারেল অভিবাসনমন্ত্রী ক্রিস আলেকজান্ডার। মঙ্গলবার সকালে তাঁর এই ঘোষণার পর এতদিনের তিনজনকে ঘিরে চলা আলোচিত প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত অলিভিয়া চাও ও ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের সরাসরি লড়াইয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আলেকজান্ডার সরে যাওয়ায় তাঁর সমর্থকদের ভোট কোথায় যাবে, সেটিই এখন টরন্টোর নির্বাচনী রাজনীতির বড় প্রশ্ন।
আলেকজান্ডার এমন এক সময়ে সরে দাঁড়ালেন, যখন টরন্টোয় আগাম ভোট শুরু হয়েছে। ২৬ অক্টোবর মূল ভোটগ্রহণ। সাম্প্রতিক প্রায় সব জরিপেই বর্তমান মেয়র অলিভিয়া চাও এগিয়ে ছিলেন, দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন বিচেস-ইস্ট ইয়র্কের কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড। আলেকজান্ডারের অবস্থান ছিল অনেক পেছনে। ৩ ও ৪ অক্টোবর পরিচালিত Liaison Strategies-এর জরিপে decided ও leaning voters-এর মধ্যে চাওয়ের সমর্থন ছিল ৪৮ শতাংশ, ব্র্যাডফোর্ডের ৪০ এবং আলেকজান্ডারের ৯ শতাংশ।
সংখ্যার হিসাবে এই ৯ শতাংশ এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ চাও ও ব্র্যাডফোর্ডের ব্যবধান যেখানে আট পয়েন্ট, সেখানে আলেকজান্ডারের সমর্থনের বড় অংশ যদি ব্র্যাডফোর্ডের দিকে যায়, তাহলে নির্বাচনের হিসাব বদলে যেতে পারে। আর সেই কারণেই আলেকজান্ডারের প্রস্থানকে প্রথম দেখায় ব্র্যাডফোর্ডের জন্য স্বস্তির খবর বলে মনে হতে পারে। কিন্তু রাজনীতির অঙ্ক সব সময় যোগ-বিয়োগের সাধারণ নিয়মে চলে না।
আলেকজান্ডার সাবেক কনজারভেটিভ এমপি। স্টিফেন হারপারের সরকারে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত তিনি অভিবাসনমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন। অন্যদিকে ব্র্যাডফোর্ডও এবারের নির্বাচনে কর, নগর ব্যবস্থাপনা, জননিরাপত্তা ও ব্যয়ের প্রশ্নে চাওয়ের বিপরীতে অবস্থান নিয়ে ভোটারদের সামনে নিজেকে বিকল্প হিসেবে তুলে ধরেছেন। ফলে রাজনৈতিক অবস্থানের কিছু মিলের কারণে আলেকজান্ডারের ভোটারদের একটি অংশের কাছে ব্র্যাডফোর্ড স্বাভাবিক পরবর্তী পছন্দ হতে পারেন।
কিন্তু আগের জরিপের ভেতরের হিসাব বলছে, ছবিটি এত সরল নয়। আলেকজান্ডার জুলাইয়ের শেষ দিকে নির্বাচনে প্রবেশ করার আগে Forum Research-এর একটি জরিপে চাও, ব্র্যাডফোর্ড ও ‘অন্য প্রার্থী’ এই তিনটি বিকল্প দেওয়া হয়েছিল। পরে আলেকজান্ডারের নাম যোগ করা হলে তাঁর পাওয়া ১১ শতাংশ সমর্থনের মধ্যে ছয় পয়েন্ট এসেছিল আগে ‘অন্য প্রার্থী’ বেছে নেওয়া ভোটারদের কাছ থেকে, চার পয়েন্ট ব্র্যাডফোর্ডের কাছ থেকে এবং মাত্র এক পয়েন্ট চাওয়ের কাছ থেকে। অর্থাৎ আলেকজান্ডারের সব ভোট ব্র্যাডফোর্ডের সম্ভাব্য ভোট ছিল, এমনটি বলা যায় না। তাঁর বড় একটি অংশ এসেছিল এমন ভোটারদের কাছ থেকে, যারা চাও কিংবা ব্র্যাডফোর্ড কাউকেই বেছে নিচ্ছিলেন না।
এখানেই আলেকজান্ডারের প্রস্থান নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক প্রশ্নটি সামনে আসে। তাঁর সমর্থকদের কতজন ব্র্যাডফোর্ডের দিকে যাবেন, কতজন চাওকে বেছে নেবেন, কতজন অন্য কোনো প্রার্থীকে ভোট দেবেন, আর কতজন শেষ পর্যন্ত ভোট দিতেই যাবেন না?
Liaison Strategies-এর প্রধান David Valentin আগেই সতর্ক করেছিলেন, আলেকজান্ডার সরে গেলে তাঁর সমর্থন সরাসরি ব্র্যাডফোর্ডের ঘরে চলে যাবে, এমন ধরে নেওয়ার কারণ নেই। তাঁদের কেউ অন্য প্রার্থীকে বেছে নিতে পারেন, কেউ ভোট দেওয়া থেকে বিরত থাকতে পারেন।
এই দুই প্রার্থীকে ঘিরে আরেকটি রাজনৈতিক চিত্রও এখন সামনে আসছে। বিশেষ করে ফেডারেল লিবারেল রাজনীতির পরিচিত কয়েকটি মুখ দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গেছেন। অলিভিয়া চাওকে সমর্থন জানিয়েছেন Scarborough Southwest-এর এমপি Doly Begum, Guildwood–Rouge Park-এর Gary Anandasangaree, Scarborough–Agincourt-এর Jean Yip, Scarborough Centre–Don Valley East-এর Salma Zahid এবং Don Valley West-এর Rob Oliphant। অন্যদিকে ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের পাশে দাঁড়িয়েছেন Liberal MP Vince Gasparro, Leslie Church, Ali Ehsassi, Jennifer McKelvie, Judy Sgro, James Maloney এবং Yvan Baker। Conservative MP Scott Aitchison এবং Ontario Liberal MPP Stephanie Smyth-ও Bradford-কে সমর্থন জানিয়েছেন। অর্থাৎ মেয়র নির্বাচনটি কোনো সরল দলীয় বিভাজনের পথে এগোচ্ছে না। একই দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও এখানে ভিন্ন প্রার্থীর পাশে দাঁড়িয়েছেন। ফলে Chow ও Bradford-এর প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গে টরন্টোর বিভিন্ন রাজনৈতিক বলয়ের অবস্থানও ক্রমে দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
অলিভিয়া চাওয়ের পক্ষে আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ইঙ্গিত এসেছে অন্টারিওর প্রিমিয়ার Doug Ford-এর কাছ থেকে। চাওকে পাশে নিয়ে এক অনুষ্ঠানে Ford তাঁদের সম্পর্ককে “phenomenal” বলে উল্লেখ করেন, মেয়র হিসেবে তাঁর কাজেরও প্রশংসা করেন এবং শেষে সাংবাদিকদের বলেন, “read between the lines.” মন্তব্যটি অনেকেই চাওয়ের পুনর্নির্বাচনের প্রতি পরোক্ষ সমর্থন হিসেবে দেখেন। তবে পরদিন Ford-এর দপ্তর জানায়, প্রিমিয়ার আনুষ্ঠানিকভাবে চাও কিংবা অন্য কোনো প্রার্থীকে endorsement দেননি। তবু ২০২৩ সালের মেয়র নির্বাচনে চাওকে নিয়ে Ford-এর কঠোর অবস্থানের সঙ্গে এবারের উষ্ণ বক্তব্যের পার্থক্য টরন্টোর রাজনৈতিক মহলে আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে।
আরও একটি বিষয় এবারের পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক করে তুলেছে। নির্বাচনে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময়সীমা আগেই শেষ হয়ে গেছে। ফলে প্রচার থেকে সরে দাঁড়ালেও আলেকজান্ডারের নাম ব্যালটে থেকে যাচ্ছে। অর্থাৎ ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোটাররা এখনও তাঁর নাম দেখতে পাবেন। ফলে তাঁর সরে দাঁড়ানোর খবর না জানা কিংবা জেনেও তাঁকেই ভোট দিতে চাওয়া কিছু ভোটার আলেকজান্ডারের নামের পাশেই চিহ্ন দিতে পারেন। তাই তাঁর ৯ বা ১০ শতাংশ সমর্থনকে পুরোপুরি অন্য দুই প্রার্থীর মধ্যে ভাগ করে হিসাব করাও ঠিক হবে না।
আলেকজান্ডার নিজেও সরে দাঁড়ানোর সময় ব্র্যাডফোর্ড কিংবা চাও কাউকেই সমর্থন দেননি। সাম্প্রতিক জরিপে তাঁর সামনে জয়ের কোনো বাস্তব পথ দেখতে না পাওয়াকেই তিনি সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তাঁর এই নিরপেক্ষ প্রস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যদি সরাসরি ব্র্যাডফোর্ডকে সমর্থন দিতেন, তাহলে নিজের সমর্থকদের একটি অংশকে সেদিকে নিয়ে যাওয়ার রাজনৈতিক বার্তা তৈরি হতে পারত। সেটি তিনি করেননি।
তবে ব্র্যাডফোর্ডের জন্য একটি পরিবর্তন ইতিমধ্যে ঘটেছে। এখন তাঁকে আর চাওবিরোধী ভোটের জন্য আলেকজান্ডারের সঙ্গে একইভাবে প্রতিযোগিতা করতে হচ্ছে না। নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে তিনি বর্তমান মেয়রের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নিজের প্রচারকে আরও কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে আলেকজান্ডারের সমর্থকদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টাও তাঁর প্রচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠতে পারে।
চাওয়ের জন্যও পরিস্থিতি বদলেছে। তিন প্রার্থীর বিতর্কে প্রতিপক্ষের আক্রমণ ও মনোযোগ ভাগ হয়ে যাওয়ার যে সুবিধা ছিল, এখন তা কমে এসেছে। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে কর, জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসন, TTC, জননিরাপত্তা এবং নগরসেবার মতো ইস্যুতে চাও ও ব্র্যাডফোর্ডের অবস্থান আরও সরাসরি মুখোমুখি হচ্ছে।
আলেকজান্ডারের ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেই নতুন বাস্তবতার একটি আভাস পাওয়া গেছে। ৬ অক্টোবর Forum Research-এর জরিপে decided ও leaning voters-এর মধ্যে চাও পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪২ শতাংশ। ব্যবধান মাত্র চার পয়েন্ট। একই দিনে প্রকাশিত Liaison Strategies-এর জরিপে অবশ্য ব্যবধান ছিল আট পয়েন্ট। দুটি জরিপের পদ্ধতি, নমুনা এবং সময় আলাদা হওয়ায় একটিমাত্র ফল থেকে নির্বাচনের গতিপথ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। তবে সংখ্যাগুলো দেখাচ্ছে, নির্বাচনের শেষ কয়েক সপ্তাহে ভোটের গতিবিধি নিবিড়ভাবে দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
ক্রিস আলেকজান্ডার প্রচারের মাঠ থেকে সরে যাওয়ায় টরন্টোর মেয়র নির্বাচন এখন আরও সরাসরি এক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এসে দাঁড়িয়েছে। সামনে অলিভিয়া চাও ও ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড, আর মাঝখানে এমন একদল ভোটার, যাঁদের সিদ্ধান্তই শেষ পর্যন্ত নির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণকে নতুন রূপ দিতে পারে। তাই শেষ কয়েক সপ্তাহে শুধু দুই প্রার্থীর প্রচার নয়, নজর থাকবে সেই দ্বিধাগ্রস্ত ও সরে আসা ভোটারদের দিকেও, যাঁদের পছন্দই নির্ধারণ করবে টরন্টোর মেয়র নির্বাচনের চূড়ান্ত চিত্র।
তথ্যসূত্র: Toronto Star; CityNews Toronto







