
টরন্টোর মেয়র নির্বাচনকে সামনে রেখে মুখোমুখি হলেন বর্তমান মেয়র অলিভিয়া চাও ও তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী কাউন্সিলর ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড। Toronto Metropolitan University-এর Student Learning Centre-এ মঞ্চে ছিলেন শুধু অলিভিয়া ও ব্র্যাডফোর্ড। ফলে দুজনের দীর্ঘ রাজনৈতিক রেকর্ড, বর্তমান প্রশাসনের কাজ এবং ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি পাশাপাশি দেখে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পেলেন টরন্টোর ভোটাররা।
বিতর্কটি ঘিরে আগ্রহও ছিল উল্লেখযোগ্য। সাধারণ টরন্টোবাসীদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে দর্শক নির্বাচন করা হয়। TMU শিক্ষার্থীদের জন্যও ছিল আলাদা লটারি, নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা একজন অতিথি সঙ্গে নিয়ে সরাসরি অনুষ্ঠান দেখার সুযোগ পান। মঞ্চের বাইরেও ছিল বড় দর্শকসমাজ। বিতর্কটি অনলাইনে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়, আর CityNews 24/7 সন্ধ্যা ৭টা থেকে তা লাইভ দেখায়। ফলে অডিটোরিয়ামে উপস্থিত দর্শকদের বাইরেও ঘরে বসে বহু মানুষ দুই প্রধান প্রার্থীর প্রথম সরাসরি মুখোমুখি লড়াই দেখেছেন।
দুই ঘণ্টার সেই বিতর্কে আবাসন, জীবনযাত্রার ব্যয়, গণপরিবহন, জননিরাপত্তা ও নতুন অভিবাসীদের প্রয়োজনসহ নগরজীবনের নানা সংকট উঠে এসেছে। কিন্তু নীতিগত প্রশ্নের পাশাপাশি বারবার সামনে এসেছে আরেকটি বিষয়, বিশ্বাসযোগ্যতা। কে অতীতের অবস্থান থেকে সরে এসেছেন, কার প্রতিশ্রুতির সঙ্গে আগের রেকর্ডের মিল আছে, আর আগামী চার বছরের জন্য কাকে বিশ্বাস করবেন টরন্টোর ভোটাররা, শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নটিই বিতর্কের অন্যতম প্রধান সুর হয়ে ওঠে।
দৈনিক টরন্টো স্টার, United Way Greater Toronto এবং Toronto Metropolitan University-এর Democratic Engagement Exchange যৌথভাবে বিতর্কটির আয়োজন করে। সঞ্চালনায় ছিলেন টরন্টো স্টারের কলামিস্ট এড কেনান।
অলিভিয়া শুরু থেকেই ব্র্যাডফোর্ডের আট বছরের সিটি কাউন্সিলের রেকর্ড সামনে আনেন। TTC, আবাসন, আশ্রয়কেন্দ্র ও বাইক লেনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে তাঁর আগের সিদ্ধান্তের সঙ্গে বর্তমান নির্বাচনী অবস্থানের অসঙ্গতি তুলে ধরেন তিনি। একপর্যায়ে অলিভিয়া সরাসরি প্রশ্ন করেন, মানুষ তাঁকে বিশ্বাস করবে কীভাবে। এরপর বলেন, ব্র্যাডফোর্ড পরিবর্তনের কথা বললেও তিনি বারবার নিজের মতই পরিবর্তন করেছেন।
ব্র্যাডফোর্ড পাল্টা অলিভিয়ার আক্রমণকে ভয় দেখানোর রাজনীতি বলে অভিহিত করেন। তাঁর বক্তব্য, অলিভিয়ার প্রচার শিবির নতুন ধারণা নিয়ে কথা না বলে তাঁর পরিকল্পনাকে সেবা কাটছাঁটের পরিকল্পনা হিসেবে তুলে ধরছে। ব্র্যাডফোর্ড বলেন, সিটি হলের বাজেট খাত ধরে স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তাঁর দাবি, সরাসরি জনসেবা কমানো নয়, বরং ব্যয়ের ধরন আধুনিক করে কোথায় অর্থ সাশ্রয় করা যায়, সেটিই খুঁজে বের করতে চান তিনি।
আবাসন নিয়ে দুই প্রার্থীর বিরোধ আরও প্রকট হয়। ব্র্যাডফোর্ড অলিভিয়াকে মনে করিয়ে দেন, আগের নির্বাচনে ২০৩০ সালের মধ্যে ৬৫ হাজার বিশেষভাবে ভাড়ার জন্য নির্মিত বাড়ি তৈরির লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর দাবি, এখন পর্যন্ত প্রায় ১,৫০০ ইউনিট তৈরি হয়েছে, যা লক্ষ্যের সামান্য অংশ। অলিভিয়া পাল্টা ব্র্যাডফোর্ডের কাউন্সিল রেকর্ড তুলে ধরে বলেন, উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে তিনিও যুক্ত ছিলেন। অর্থাৎ আবাসন নির্মাণের ধীরগতি নিয়ে ব্র্যাডফোর্ড যখন বর্তমান প্রশাসনকে প্রশ্নের মুখে ফেলছেন, অলিভিয়া তখন অতীতের সিদ্ধান্তে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর ভূমিকাও সামনে আনছেন।
অর্থনীতি ও নগর সেবা নিয়েও দুই প্রার্থীর অবস্থানের পার্থক্য পরিষ্কার হয়েছে। ব্র্যাডফোর্ড প্রথম বছরে সম্পত্তি কর না বাড়ানো, সিটি বাজেটের স্বাধীন পর্যালোচনা এবং পরবর্তী সময়ে কর বৃদ্ধিকে মূল্যস্ফীতির হারের নিচে রাখার কথা বলেছেন। Toronto Water-কে শতভাগ সিটির মালিকানাধীন আলাদা একটি সংস্থায় রূপ দিয়ে পানির বিল প্রায় ২৫ শতাংশ কমানোর পরিকল্পনাও তাঁর রয়েছে। এর একটি বড় অংশের অর্থায়ন দীর্ঘমেয়াদি ঋণের মাধ্যমে করার প্রস্তাব দিয়েছেন তিনি।
অলিভিয়ার আপত্তি এখানেই। তাঁর বক্তব্য, এভাবে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ালে ভবিষ্যতে সিটির আর্থিক চাপ বাড়তে পারে এবং তার প্রভাব পড়তে পারে জনসেবায়। ব্র্যাডফোর্ড অবশ্য জোর দিয়ে বলেছেন, Toronto Water সিটির মালিকানাতেই থাকবে এবং তাঁর পরিকল্পনার উদ্দেশ্য এটি বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া নয়।
TTC ও যানজট নিয়েও দুজনের মধ্যে তীব্র বাক্যবিনিময় হয়। অলিভিয়া বলেন, ব্র্যাডফোর্ড TTC কমিশনে থাকার সময় ভাড়া বেড়েছে এবং সেবা কমেছে। নিজের প্রশাসনের পক্ষে তিনি TTC-র সেবা পুনরুদ্ধার, Gardiner Expressway-এর নির্মাণকাজ নির্ধারিত সময়ের আগে শেষ করা এবং Scarborough Busway চালুর কথা বলেন। যানজট কমাতে আরও স্মার্ট ট্রাফিক সিগন্যাল এবং সড়কের নির্মাণকাজ দ্রুত শেষ করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ব্র্যাডফোর্ডের বক্তব্য, TTC নিয়ে যাত্রীদের উদ্বেগ শুধু ভাড়া নয়, নিরাপত্তা, নির্ভরযোগ্যতা ও পরিচ্ছন্নতার সঙ্গেও জড়িত। তিনি স্টেশন ও ট্রানজিট ব্যবস্থায় আরও ইউনিফর্মধারী কর্মকর্তা, উন্নত লাইটিং এর ব্যবস্থা এবং ব্যস্ত স্টেশনগুলোর প্ল্যাটফর্মে নিরাপত্তা দরজা বসানোর কথা বলেছেন। জননিরাপত্তার বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে এক হাজার নতুন পুলিশ কর্মকর্তা নিয়োগের প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। অলিভিয়া পুলিশ নিয়োগের পাশাপাশি তরুণদের পরামর্শ ও সহায়তা এবং অপরাধের সামাজিক কারণ মোকাবিলায় কমিউনিটিভিত্তিক উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
সর্বশেষ জনমত জরিপও এই মুখোমুখি লড়াইয়ের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। ৬ অক্টোবর Forum Research-এর জরিপে যেসব ভোটার ইতিমধ্যে পছন্দের প্রার্থী ঠিক করেছেন, তাঁদের মধ্যে অলিভিয়া পেয়েছেন ৪৬ শতাংশ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪২ শতাংশ। বাকি ১২ শতাংশ অন্য কাউকে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন। একই দিনে প্রকাশিত Liaison Strategies-এর জরিপে অলিভিয়া ৪৮ এবং ব্র্যাডফোর্ড ৪০ শতাংশ সমর্থন পেয়েছেন।
আগাম ভোট শুরু হয়েছে ৬ অক্টোবর এবং চলবে ১১ অক্টোবর পর্যন্ত। মূল ভোট ২৬ অক্টোবর। ফলে এই বিতর্ক যখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তখন টরন্টোর একাংশের ভোটার ইতিমধ্যেই তাঁদের সিদ্ধান্ত ব্যালটে জানাতে শুরু করেছেন।
তথ্যসূত্র: Toronto Star; CityNews Toronto; TorontoToday; Forum Research; Liaison Strategies; City of Toronto







