ব্যবসা

মেয়াদপূর্তির আগেই ১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকার ট্রেজারি বন্ড কিনল সরকার

ঢাকা, ০৮ অক্টোবর – সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় নতুন এক পদ্ধতির সূচনা করেছে বাংলাদেশ। প্রথমবারের মতো মেয়াদপূর্তির আগেই বাজারে থাকা ১ হাজার ৭১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকার দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ড কিনে নিয়েছে সরকার। বৃহস্পতিবার (৮ সেপ্টেম্বর) অনুষ্ঠিত ‘বাইব্যাক’ নিলামের মাধ্যমে এসব বন্ড কেনা হয়।

সরকারি ঋণের মেয়াদ কাঠামো আরও ভারসাম্যপূর্ণ করা, বাজারে থাকা বন্ডের সংখ্যা কমানো এবং ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় নমনীয়তা বাড়াতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর ইস্যু করা দুই বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের ওপর এই বাইব্যাক নিলাম অনুষ্ঠিত হয়। নিলামে মোট ৫৬টি বিডের মাধ্যমে ২ হাজার ১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকার বন্ড বিক্রির প্রস্তাব আসে। এর মধ্যে নিলাম কমিটির নির্ধারিত দরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ১ হাজার ৭১৬ কোটি ১৪ লাখ টাকার বিড গ্রহণ করা হয়েছে। অর্থাৎ বিনিয়োগকারীরা যতটা বন্ড সরকারের কাছে ফেরত বিক্রি করতে চেয়েছেন, তার পুরোটা সরকার কেনেনি। নির্ধারিত দর ও নিলাম প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে নির্বাচিত প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে।

‘বাইব্যাক’ কী এবং কেন গুরুত্বপূর্ণ?

সরকার যখন ট্রেজারি বন্ড ইস্যু করে, তখন বিনিয়োগকারীরা সেই বন্ড কিনে সরকারকে অর্থ ধার দেন। সাধারণত নির্ধারিত মেয়াদ শেষে সরকার বিনিয়োগকারীদের মূল অর্থ ফেরত দেয়। কিন্তু মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই সরকার যদি বাজারে থাকা নিজের ইস্যু করা বন্ড বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে আবার কিনে নেয়, তাকে বলা হয় বাইব্যাক। বাংলাদেশের সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারে এ ধরনের নিলাম এবারই প্রথম। ফলে এটি শুধু বন্ড কেনার একটি ঘটনা নয়; সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় একটি নতুন বাজারভিত্তিক কৌশলেরও সূচনা।

কেন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই বন্ড কিনল সরকার?

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এর প্রধান উদ্দেশ্য সরকারি ঋণের মেয়াদ কাঠামোকে আরও সুষম করা।

সরকারের বিভিন্ন সময়ে নেওয়া ঋণ যদি একই সময়ে বড় পরিমাণে পরিশোধযোগ্য হয়ে ওঠে, তখন অর্থ ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। আগাম বন্ড কিনে নেওয়ার মাধ্যমে সেই দায়ের কাঠামো প্রয়োজন অনুযায়ী পুনর্বিন্যাস করা সম্ভব। এর পাশাপাশি বাজারে থাকা সরকারি বন্ডের সংখ্যা কমানোর সুযোগও তৈরি হয়। অর্থাৎ সরকার এখন শুধু নতুন বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহের দিকেই নজর দিচ্ছে না; বাজারে ইতিমধ্যে থাকা ঋণপত্রের কাঠামোও প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে।

এক মাসের সুদও দিতে হবে না

এই বাইব্যাকের একটি তাৎক্ষণিক আর্থিক দিকও রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সাধারণত বন্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সরকার তা পরিশোধ করে। কিন্তু এবার মেয়াদ শেষ হওয়ার এক মাস আগেই বন্ডগুলো কিনে নেওয়া হয়েছে। ফলে ওই শেষ এক মাসের জন্য সরকারকে সুদ পরিশোধ করতে হবে না।

অবশ্য সরকারের প্রকৃত আর্থিক সাশ্রয় কতটা হবে, তা শুধু এক মাসের সুদের ওপর নির্ভর করবে না। বন্ডগুলো যে দামে পুনরায় কেনা হয়েছে এবং বিকল্পভাবে সরকারের অর্থায়নের খরচ কত—এসব বিষয়ও হিসাবের মধ্যে আসবে।

ভবিষ্যতে ঋণ ব্যবস্থাপনায় বাড়বে নমনীয়তা

বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বাইব্যাকের ফলে ভবিষ্যতের অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় সরকারের নমনীয়তা বাড়বে। একই সঙ্গে ঋণের খরচ ও ঝুঁকি আরও কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার সুযোগ তৈরি হবে।

বাজারে সুদের হার, তারল্য পরিস্থিতি, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা এবং সরকারের সামগ্রিক ঋণ কাঠামো বিবেচনা করে কোন বন্ড কখন বাজারে থাকবে বা কখন তা কমিয়ে আনা হবে—এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হতে পারে। এ দিক থেকে দেখলে, বাইব্যাককে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক মানের ব্যবস্থাপনার দিকে অগ্রগতি

বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এই প্রক্রিয়া সরকারের দায় ব্যবস্থাপনা কার্যক্রমকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে সহায়ক হবে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনায় বন্ড বাইব্যাক একটি পরিচিত পদ্ধতি। বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এটি চালু হওয়ায় সরকারি সিকিউরিটিজ বাজারে ঋণ ব্যবস্থাপনার নতুন একটি উপকরণ যুক্ত হলো। এর ফলে সরকারের হাতে ভবিষ্যতে প্রয়োজন অনুযায়ী পুরোনো ঋণপত্র কমিয়ে আনা এবং ঋণের মেয়াদ কাঠামো পুনর্বিন্যাস করার আরও একটি পথ তৈরি হলো।

আবারও হতে পারে বাইব্যাক নিলাম

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, ভবিষ্যতে বাজার পরিস্থিতি, তারল্য, বিনিয়োগকারীদের চাহিদা এবং সরকারের ঋণের কাঠামো বিবেচনা করে প্রয়োজন হলে আবারও বাইব্যাক নিলাম আয়োজন করা হবে। অর্থাৎ এবারের উদ্যোগকে এককালীন কোনো ব্যবস্থা হিসেবে দেখছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজার পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এটি ভবিষ্যতে সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার নিয়মিত কৌশলগুলোর একটি হয়ে উঠতে পারে।

১ হাজার ৭১৬ কোটি টাকার বন্ড আগাম কিনে নেওয়ার তাৎপর্য শুধু টাকার অঙ্কে নয়, সরকারি ঋণ ব্যবস্থাপনার ধরন পরিবর্তনের মধ্যেও রয়েছে। এতদিন যেখানে মূলত বন্ড ইস্যু করে অর্থ সংগ্রহ ও মেয়াদ শেষে তা পরিশোধের কাঠামোই দেখা গেছে, সেখানে এখন প্রয়োজন অনুযায়ী বাজার থেকে পুরোনো বন্ড ফিরিয়ে নেওয়ার সুযোগও তৈরি হলো।

সঠিক সময়ে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা গেলে সরকারের ঋণের পরিশোধের চাপ ছড়িয়ে দেওয়া, সুদ ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ অর্থায়নের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় এটি কার্যকর হতে পারে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে সরকার কোন সময়ে, কী দামে এবং কী ধরনের বাজার পরিস্থিতিতে ভবিষ্যতে বাইব্যাক পরিচালনা করে তার ওপর।

এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language