জাতীয়

চট্টগ্রাম বন্দর ছাড়িয়ে বাংলাদেশে আরও বিনিয়োগে আগ্রহ ডিপি ওয়ার্ল্ডের, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চেয়ারম্যানের বৈঠক

ঢাকা, ০৮ অক্টোবর – চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও আধুনিকায়নের পাশাপাশি বাংলাদেশে আরও বিস্তৃত পরিসরে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড। বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে প্রতিষ্ঠানটির প্রতিনিধিদল বন্দর, লজিস্টিকস ও নতুন বিনিয়োগের বিভিন্ন সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেছে।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের বোর্ড অব ডিরেক্টরসের চেয়ারম্যান এসা কাজিমের নেতৃত্বে প্রতিনিধিদলটি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে। এ সময় বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বন্দর ব্যবস্থাপনা, লজিস্টিকস খাতের উন্নয়ন এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় আলোচনায় আসে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আলোচনার কেন্দ্রে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল

বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা ও আধুনিকায়নে বাংলাদেশ ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত ১৫ বছর মেয়াদি কনসেশন চুক্তি। চুক্তির আওতায় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল এবং এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করবে ডিপি ওয়ার্ল্ড।

সরকারের প্রত্যাশা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের অভিজ্ঞতা ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে টার্মিনালটির আধুনিকায়ন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পরিচালন দক্ষতা বাড়বে এবং চট্টগ্রাম বন্দরের বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর সক্ষমতাও বৃদ্ধি পাবে।

বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের বড় অংশ চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর হওয়ায় টার্মিনালটির সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি দেশের সামগ্রিক বাণিজ্য ব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

ফ্রি ট্রেড জোনে আগ্রহ, আলোচনায় রেলভিত্তিক ডিপো

বৈঠকের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্ভাব্য বিনিয়োগের পরিধি শুধু চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনায় সীমাবদ্ধ থাকছে না।

প্রধানমন্ত্রী প্রতিনিধিদলের কাছে বাংলাদেশে ফ্রি ট্রেড জোন এবং রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো স্থাপনের বিষয়ে তাদের আগ্রহের কথা জানতে চান।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের প্রতিনিধিদল এসব খাতে সহযোগিতা ও বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

এটি বাস্তবায়িত হলে বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহন ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে একটি আরও সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

রেলভিত্তিক ডিপো কেন গুরুত্বপূর্ণ?

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনার ওঠানামার পর দেশের বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক এলাকায় তা পরিবহনের ক্ষেত্রে সড়কপথের ওপর বড় ধরনের নির্ভরতা রয়েছে।

রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো গড়ে উঠলে বন্দর থেকে দেশের অভ্যন্তরে কনটেইনার পরিবহনে রেলকে আরও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে। এতে বন্দরের ওপর সরাসরি চাপ কমানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের লজিস্টিকস সংযোগ আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

বিশেষ করে শিল্পাঞ্চল ও অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর সঙ্গে বন্দরভিত্তিক পরিবহনব্যবস্থা সমন্বিত হলে আমদানি-রপ্তানির পুরো সরবরাহব্যবস্থা আরও কার্যকর করার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশের জন্য বিনিয়োগের সম্ভাব্য গুরুত্ব

ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ শুধু অর্থের প্রবাহ বাড়ানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে আধুনিক বন্দর ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, লজিস্টিকস দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও যুক্ত হতে পারে।

বাংলাদেশের রপ্তানি খাত সম্প্রসারণ এবং বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরির ক্ষেত্রে বন্দর ও লজিস্টিকস অবকাঠামোর দক্ষতা গুরুত্বপূর্ণ। ফলে নিউমুরিং টার্মিনালের আধুনিকায়নের পাশাপাশি যদি রেলভিত্তিক ডিপো ও ফ্রি ট্রেড জোনের মতো প্রকল্পে বিনিয়োগ আসে, তাহলে এর প্রভাব বন্দর ছাড়িয়ে বৃহত্তর বাণিজ্যিক অবকাঠামোয় পড়তে পারে।

বাংলাদেশ-সংযুক্ত আরব আমিরাত সম্পর্কেও বাড়তে পারে গতি

বৈঠকে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণের বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ায় এটি দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ বাস্তবে রূপ নিলে বাংলাদেশে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিনিয়োগের পরিধি আরও বিস্তৃত হতে পারে। একই সঙ্গে বন্দর ও লজিস্টিকস খাতে আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের বাণিজ্য অবকাঠামো উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।

সামনে কী?

বৃহস্পতিবারের বৈঠকে ফ্রি ট্রেড জোন, রেলভিত্তিক ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো এবং নতুন বিনিয়োগের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করা হলেও এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত আলোচনা, প্রকল্প কাঠামো ও বিনিয়োগ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করতে হবে।

তবে আলোচনার পরিধি থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট—বাংলাদেশে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সম্ভাব্য ভূমিকা শুধু নিউমুরিং টার্মিনাল পরিচালনায় সীমাবদ্ধ রাখার পরিকল্পনা নেই।

চট্টগ্রাম বন্দর, রেলপথ, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো ও ফ্রি ট্রেড জোনকে একটি সমন্বিত লজিস্টিকস ব্যবস্থার আওতায় আনার সম্ভাবনাই এখন সামনে আসছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা ও পণ্য পরিবহন অবকাঠামোয় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এনএন/ ০৮ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language