সম্পাদকের পাতা

যুক্তরাজ্যে অনলাইনে যৌনালাপ হতে পারে জেল ও ডিপোর্টেশন

নজরুল মিন্টো

যুক্তরাজ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে অনলাইন যৌন যোগাযোগের আইনি ঝুঁকি
যুক্তরাজ্যে অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যৌন প্রকৃতির অনলাইন যোগাযোগ নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারও সঙ্গে যৌন বিষয়ক আলোচনা, ব্যক্তিগত ছবি চাওয়া, নিজের অন্তরঙ্গ ছবি পাঠানো কিংবা দেখা করার পরিকল্পনা যুক্তরাজ্যে বড় আইনি বিপদ ডেকে আনতে পারে। অনলাইনে পরিচিত কারও বয়স সম্পর্কে অনুমানের সঙ্গে ব্রিটিশ আইনের হিসাব সবসময় মেলে না। বিশেষ করে অপর প্রান্তের ব্যক্তি অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে কয়েকটি বার্তা বা ছবিই গড়াতে পারে পুলিশি তদন্ত, আদালত ও কারাদণ্ড পর্যন্ত। বিদেশি নাগরিকের ক্ষেত্রে এর সঙ্গে যোগ হতে পারে ভিসা বাতিল কিংবা ডিপোর্টেশনের ঝুঁকি।

বাংলাদেশ থেকে পড়াশোনা, চাকরি কিংবা অন্য কোনো ভিসায় যুক্তরাজ্যে যাওয়া মানুষের জন্য তাই দেশটির এ-সংক্রান্ত আইন জানা জরুরি। কারণ অনলাইনে পরিচয়, বন্ধুত্ব কিংবা ব্যক্তিগত কথাবার্তার যে সীমা সাধারণভাবে নিরীহ বলে মনে হতে পারে, বয়স ও কথোপকথনের বিষয়বস্তুর কারণে সেটিই আইনের চোখে গুরুতর অপরাধ হয়ে উঠতে পারে।

ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে যৌন সম্পর্কে সম্মতির আইনগত বয়স ১৬ বছর। অর্থাৎ ১৬ বছরের কম বয়সী কারও সঙ্গে যৌন সম্পর্ক আইনগতভাবে গুরুতর বিষয়। তবে অনলাইন যোগাযোগের ক্ষেত্রে শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত পৌঁছানোও প্রয়োজন হয় না। Sexual Offences Act 2003 অনুযায়ী, ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী কোনো ব্যক্তি যৌন তৃপ্তির উদ্দেশ্যে ১৬ বছরের কম বয়সী কারও সঙ্গে যৌন প্রকৃতির যোগাযোগ করলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে সেটিই অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে।

এই যোগাযোগ টেক্সট মেসেজ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-মেইল, অনলাইন চ্যাট কিংবা সরাসরি কথাবার্তা, যেকোনো মাধ্যমেই হতে পারে। নিজের পক্ষ থেকে যৌন বার্তা পাঠানোর পাশাপাশি অপর পক্ষকে যৌন প্রকৃতির বার্তা, ছবি বা অন্য কিছু পাঠাতে উৎসাহিত করাও আইনের আওতায় আসতে পারে। এ ধরনের অপরাধে ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো বয়স। অনলাইনে কেউ নিজের বয়স বেশি লিখেছে কিংবা দেখতে বয়সে বড় মনে হয়েছে, শুধু এই যুক্তিই সব ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করে না।

অনলাইনে যোগাযোগের পর দেখা করার পরিকল্পনাও আলাদা আইনি ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। অপ্রাপ্তবয়স্ক কারও সঙ্গে যৌন উদ্দেশ্যে যোগাযোগ চালিয়ে গিয়ে পরে দেখা করার আয়োজন করা বা সেই উদ্দেশ্যে কোথাও যাত্রা করার বিষয়েও ব্রিটিশ আইনে পৃথক অপরাধের বিধান রয়েছে। ফলে অপরাধের প্রশ্নটি কেবল শারীরিক সম্পর্ক পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, যৌন উদ্দেশ্যে দেখা করার দিকে এগোনোও আইনের আওতায় আসতে পারে।

ছবি ও ভিডিওর ক্ষেত্রে বয়সের হিসাব আরও সতর্কতার সঙ্গে বুঝতে হয়। যৌন সম্পর্কে সম্মতির বয়স ১৬ হলেও অশালীন বা যৌন প্রকৃতির ছবি ও ভিডিওর আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে শিশু হিসেবে গণ্য করা হয়। ফলে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সী কারও অন্তরঙ্গ ছবি চাওয়া, নিজের কাছে রাখা, অন্যকে পাঠানো কিংবা ছড়িয়ে দেওয়া পরিস্থিতিভেদে ফৌজদারি অপরাধের পর্যায়ে যেতে পারে।

এখানেই অনেকের ভুল হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কেউ হয়তো ধরে নিতে পারেন, একজনের বয়স ১৬ পার হলেই সব ধরনের যৌন যোগাযোগ আইনসম্মত। বাস্তবে বিষয়টি এত সরল নয়। যৌন সম্পর্কের সম্মতির বয়স, যৌন ছবি বা ভিডিও এবং বিশ্বাসভিত্তিক ক্ষমতার সম্পর্কের ক্ষেত্রে আলাদা বিধান রয়েছে। শিক্ষক, কেয়ার ওয়ার্কার কিংবা নির্দিষ্ট দায়িত্ব ও কর্তৃত্বের অবস্থানে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সীর সম্পর্কেও বিশেষ আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

যুক্তরাজ্যে এসব আইনের প্রয়োগ কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন মামলায় ভুয়া পরিচয় ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে যোগাযোগ, যৌন বার্তা পাঠানো, ছবি চাওয়া কিংবা দেখা করার চেষ্টা থেকে দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড পর্যন্ত হয়েছে।

প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন আইনকেও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে তৈরি শিশুদের যৌন প্রকৃতির ছবি এবং বাস্তব মানুষের মুখ বা অবয়ব ব্যবহার করে বানানো কৃত্রিম যৌন ছবির বিরুদ্ধেও যুক্তরাজ্যে আইনি ব্যবস্থা আরও কঠোর করা হয়েছে। ফলে ছবিটি বাস্তবে তোলা হয়নি বা কম্পিউটারে তৈরি হয়েছে, এমন যুক্তি দিয়ে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

যুক্তরাজ্যের ফৌজদারি আইন সবার জন্যই প্রযোজ্য। তবে অভিযুক্ত ব্যক্তি বিদেশি নাগরিক হলে আদালতের মামলার পাশাপাশি তাঁর অভিবাসন স্টেটাসও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে। শিক্ষার্থী বা কর্মী ভিসায় থাকা কেউ অপরাধে দোষী হলে সাজা ও অপরাধের প্রকৃতির ওপর নির্ভর করে তাঁর যুক্তরাজ্যে থাকার অনুমতি বাতিল হতে পারে, এমনকি নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে UK Borders Act 2007 অনুযায়ী ডিপোর্টেশনের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় এখন দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু অনলাইনে কারও প্রকৃত বয়স বা পরিচয় সবসময় নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না। সে কারণে কারো সাথে যৌন প্রকৃতির আলোচনা, অন্তরঙ্গ ছবি চাওয়া বা পাঠানো এবং দেখা করার পরিকল্পনায় এগোনো বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

একটি ফোন, কয়েকটি মেসেজ কিংবা কয়েক মিনিটের কথোপকথন প্রথমে খুব সাধারণ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু অপর প্রান্তের মানুষের বয়স, বার্তার বিষয়বস্তু এবং যোগাযোগের উদ্দেশ্যের ওপর নির্ভর করে সেই কথোপকথনই একসময় পুলিশের তদন্তের বিষয় হয়ে উঠতে পারে। তাই প্রবাসজীবনে আইন জানা যেমন প্রয়োজন, অনলাইন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সীমারেখা বুঝে চলাও ততটাই জরুরি।

তথ্যসূত্র: UK Government, CPS ও UK Legislation




FAQ

প্রশ্ন: England ও Wales-এ যৌন সম্পর্কে সম্মতির বয়স কত?
উত্তর: ১৬ বছর। তবে ১৬–১৭ বছর বয়সী ব্যক্তিকে ঘিরে সব ধরনের যৌন আচরণ বা ছবি আইনসম্মত—এমন নয়।

প্রশ্ন: ১৬ বছরের কম বয়সী কারও সঙ্গে যৌন মেসেজ পাঠানো কি অপরাধ?
উত্তর: নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হ্যাঁ। Sexual Offences Act 2003-এর section 15A ১৮+ ব্যক্তির যৌন উদ্দেশ্যে ১৬ বছরের কম বয়সী কারও সঙ্গে sexual communication-কে অপরাধ করে।

প্রশ্ন: অপ্রাপ্তবয়স্ক নিজে ছবি পাঠালে প্রাপক কি নিরাপদ?
উত্তর: না। ছবির বয়স, প্রকৃতি, গ্রহণ/সংরক্ষণ/বিতরণের পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির উদ্দেশ্যের ওপর আইনি দায় নির্ভর করতে পারে।

প্রশ্ন: ১৬ বা ১৭ বছরের ব্যক্তির অন্তরঙ্গ ছবি রাখা কি বৈধ?
উত্তর: ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তিকে child হিসেবে গণ্য করা হয় child sexual image আইনে। তাই এমন ছবির ক্ষেত্রে গুরুতর ফৌজদারি আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে।

প্রশ্ন: বিদেশি নাগরিকের ভিসা কি অপরাধের পর বাতিল হতে পারে?
উত্তর: নির্দিষ্ট criminality grounds পূরণ হলে entry clearance বা permission বাতিল হতে পারে। ১২ মাস বা তার বেশি custodial/suspended sentence, persistent offending বা serious harm-এর ক্ষেত্রে বর্তমান নিয়মে বাধ্যতামূলক cancellation-এর বিধান রয়েছে।

প্রশ্ন: অনলাইনে পরিচিত অপ্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে দেখা করতে গেলে কি আলাদা অপরাধ হতে পারে?
উত্তর: যৌন উদ্দেশ্য ও অন্যান্য আইনি শর্ত পূরণ হলে Sexual Offences Act 2003-এর section 15-এর অধীনে আলাদা অপরাধ হতে পারে।

Back to top button
🌐 Read in Your Language