সম্পাদকের পাতা

একের পর এক মহাপ্রকল্পে বদলে যাচ্ছে কানাডার অর্থনৈতিক মানচিত্র

নজরুল মিন্টো

কানাডাজুড়ে এখন প্রকল্প আর প্রকল্প। কোথাও বিশাল জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, কোথাও নতুন তেল পাইপলাইন, কোথাও পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। তৈরি হচ্ছে বন্দর, খনি, মহাসড়ক, সাবওয়ে, ব্যাটারি কারখানা ও নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থা। আটলান্টিক থেকে প্রশান্ত মহাসাগর, অন্টারিওর শিল্পাঞ্চল থেকে সুদূর উত্তরের খনিজভূমি পর্যন্ত যেন নতুন করে আঁকা হচ্ছে দেশের অর্থনৈতিক মানচিত্র।

এই কর্মযজ্ঞের পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সরকার আগামী পাঁচ বছরে কানাডায় মোট ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সচল করতে চাইছে। সেই লক্ষ্য এখন আর শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ নেই। গত ২২ আগস্ট কার্নি জানিয়েছেন, সরকারের Major Projects Office-এর আওতায় ইতোমধ্যে ২৭টি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ এগোচ্ছে, যেগুলো প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ প্রতিনিধিত্ব করছে।

এই নতুন কানাডার সবচেয়ে বড় প্রকল্পগুলোর একটি এখন তৈরি হচ্ছে দেশের পূর্ব প্রান্তে। নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর ও কুইবেক মিলে Churchill Falls বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্প্রসারণ, নতুন Gull Island জলবিদ্যুৎকেন্দ্র, ল্যাব্রাডরে বায়ুবিদ্যুৎ এবং শত শত কিলোমিটার নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন তৈরির যে পরিকল্পনা নিয়েছে, তার মোট বিনিয়োগ প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার। সরকার এটিকে উত্তর আমেরিকার ইতিহাসের বৃহত্তম পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বিনিয়োগ বলছে। সব মিলিয়ে প্রায় ১৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি হবে, কর্মসংস্থান হবে প্রায় ২৩ হাজার মানুষের এবং ২০৪০-এর দশকের গোড়া পর্যন্ত কানাডার অর্থনীতিতে প্রায় ৩১ বিলিয়ন ডলার যোগ হওয়ার হিসাব রয়েছে।

পশ্চিমেও চলছে আরেক বিশাল প্রস্তুতি। আলবার্টার তেল প্রশান্ত মহাসাগর দিয়ে এশিয়ার বাজারে নিতে প্রস্তাবিত West Coast Pipeline এখন Major Projects Office-এর হাতে। নির্মাণের চূড়ান্ত অনুমোদন এখনো হয়নি, তবে সরকারি হিসাবে নির্মাণের সর্বোচ্চ পর্যায়ে সরাসরি ও পরোক্ষ মিলিয়ে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হতে পারে। এর সঙ্গে রয়েছে আলবার্টার Pathways কার্বন নিঃসরণ নিয়ন্ত্রণ উদ্যোগ। অর্থাৎ কানাডা একই সঙ্গে পুরোনো জ্বালানি সম্পদ থেকে নতুন বাজার খুঁজছে এবং সেই শিল্পের কার্বন নিঃসরণ কমানোর পথও তৈরি করছে।

ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় LNG Canada-এর দ্বিতীয় পর্যায়ে সম্ভাব্য বিনিয়োগ প্রায় ৩৩ বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে রয়েছে নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন, বন্দর সম্প্রসারণ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্যপথের একের পর এক প্রকল্প। পশ্চিমের এই বিনিয়োগের লক্ষ্যও একই, কানাডার পণ্য যেন শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে আটকে না থাকে, সরাসরি এশিয়ার বাজারেও পৌঁছাতে পারে।

আটলান্টিকেও পরিকল্পনার পরিধি কম নয়। নোভা স্কশিয়াকেন্দ্রিক Wind West প্রকল্পে শুধু সমুদ্রের বাতাস থেকেই ৬০ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর সঙ্গে নোভা স্কশিয়া, নিউ ব্রান্সউইক, প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড ও নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরকে আরও শক্তিশালী বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থায় যুক্ত করার প্রস্তুতি চলছে। প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড ও নিউ ব্রান্সউইকের মধ্যে নতুন সমুদ্রতল বিদ্যুৎ কেবলও সেই পরিকল্পনার অংশ।

এর চেয়েও উচ্চাভিলাষী একটি ধারণা এখন আটলান্টিকের আরও গভীরে। North Atlantic Transmission One Link বা NATO-L নামে প্রস্তাবিত প্রকল্পটি পূর্ব কানাডা থেকে আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশ দিয়ে সরাসরি উত্তর সাগরের সঙ্গে বিদ্যুৎ সংযোগ তৈরি করতে চায়। প্রায় ৬ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ বহনের সক্ষমতার এই সংযোগের সম্ভাব্য ব্যয় উদ্যোক্তারা প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার ধরছেন। বাস্তবায়িত হলে কানাডার জল ও বায়ুবিদ্যুৎ সরাসরি ইউরোপে পৌঁছানোর নতুন পথ তৈরি হতে পারে। প্রকল্পটি এখনো পরিকল্পনা পর্যায়ে, তবে এর পরিধিই বলে দেয় কানাডার জ্বালানি নিয়ে চিন্তা এখন আর শুধু উত্তর আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই।

এই জাতীয় কর্মযজ্ঞের মধ্যেও আলাদা করে চোখে পড়ে ডাগ ফোর্ডের অন্টারিও। আগামী ১০ বছরে শুধু প্রাদেশিক অবকাঠামোতেই ২১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে অন্টারিও সরকার। সড়ক, সাবওয়ে, হাসপাতাল, বিদ্যুৎ ও শিল্প অবকাঠামো মিলিয়ে এটি কানাডার ইতিহাসে কোনো প্রাদেশিক সরকারের সবচেয়ে বড় মূলধনী কর্মসূচি বলে দাবি করছে সরকার।

এর সবচেয়ে বড় অধ্যায় পারমাণবিক শক্তি। Darlington-এ চারটি নতুন ছোট পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর নির্মিত হচ্ছে। ব্যয় ২০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। চারটি চালু হলে প্রায় ১২ লাখ বাড়ির প্রয়োজনের সমপরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাবে। নির্মাণপর্বে প্রায় ১৮ হাজার মানুষের কাজের সুযোগ তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদে কানাডার অর্থনীতিতে প্রায় ৩৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে।

Pickering-এর পুরোনো পারমাণবিক কেন্দ্রকে আরও কয়েক দশক চালু রাখতে ২৬ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সংস্কার অনুমোদিত হয়েছে। নির্মাণ ও পরবর্তী পরিচালনা মিলিয়ে প্রায় ৩৭ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সঙ্গে এটি যুক্ত হবে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিকল্পনাটি Port Hope-এর Wesleyville-এ। সেখানে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মেগাওয়াটের নতুন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরির সম্ভাবনা পরীক্ষা করা হচ্ছে। বাস্তবায়িত হলে এটি বিশ্বের বৃহত্তম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একটি হতে পারে এবং প্রায় এক কোটি বাড়ির প্রয়োজন মেটানোর মতো বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে। দীর্ঘমেয়াদে অন্টারিওর অর্থনীতিতে প্রায় ২৩৫ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে এবং প্রায় ১০ হাজার ৫০০ মানুষের কর্মসংস্থান সমর্থনের হিসাব রয়েছে।

Bruce Power-এ প্রস্তাবিত Bruce C-ও ছোট নয়। সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৮০০ মেগাওয়াটের কেন্দ্রটি প্রায় ৪৮ লাখ বাড়ির সমপরিমাণ বিদ্যুৎ দিতে পারবে। নির্মাণপর্বে প্রায় ১৮ হাজার ৯০০ এবং চালু হলে আরও প্রায় ৬ হাজার ৭০০ মানুষের কর্মসংস্থানের হিসাব করা হয়েছে।

এর বাইরে Lambton ও Nanticoke-এও ভবিষ্যৎ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা দেখা হচ্ছে। অর্থাৎ অন্টারিওর পারমাণবিক মানচিত্র আর শুধু Darlington, Pickering ও Bruce-এ আটকে থাকছে না।

ফোর্ডের পরিকল্পনাও শুধু বিদ্যুতে সীমাবদ্ধ নয়। Highway 413, Bradford Bypass এবং টরন্টোর Ontario Line, Scarborough Subway Extension, Eglinton Crosstown West Extension ও Yonge North Subway Extension মিলিয়ে চলছে বিশাল পরিবহন কর্মসূচি। শুধু গণপরিবহনেই আগামী দশ বছরে প্রায় ৬৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে।

এরপর রয়েছে উত্তর অন্টারিওর Ring of Fire। বহুদিন ধরে দুর্গম পড়ে থাকা এই অঞ্চলে নিকেল, তামা ও ক্রোমাইটসহ বিপুল খনিজসম্পদ রয়েছে। এখন সেখানে সড়ক তৈরি শুরু হয়েছে। সরকার হিসাব করছে, অঞ্চলটির সম্ভাবনা কাজে লাগানো গেলে আগামী ৩০ বছরে অন্টারিওর অর্থনীতিতে প্রায় ২২ বিলিয়ন ডলার যোগ হতে পারে এবং ৭০ হাজারের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এই খনিজের সঙ্গে দক্ষিণ অন্টারিওর নতুন শিল্পের সরাসরি যোগ রয়েছে। উইন্ডসরে ৫ বিলিয়ন ডলারের NextStar ব্যাটারি কারখানা উৎপাদনে গেছে। সেন্ট থমাসে Volkswagen-এর PowerCo প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের ব্যাটারি কারখানা তৈরি করছে। অর্থাৎ উত্তরের খনিজ থেকে দক্ষিণের ব্যাটারি, তারপর গাড়ি কারখানা, পুরো ব্যবস্থাকে একটি শিল্পশৃঙ্খলে বাঁধার চেষ্টা চলছে।

তুলনামূলকভাবে ছোট হলেও এই বিশাল ছবির আরও অনেক অংশ রয়েছে। কুইবেকে নতুন কনটেইনার টার্মিনাল ও গ্রাফাইট প্রকল্প, সাসকাচুয়ানে তামার খনি, নর্থওয়েস্ট টেরিটোরিজ ও নুনাভুটে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প, নোভা স্কশিয়া ও নিউ ব্রান্সউইকের মধ্যে নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ, প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড ও নিউ ব্রান্সউইকের মধ্যে সমুদ্রতল বিদ্যুৎ কেবল এবং ব্রিটিশ কলাম্বিয়ায় নতুন বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন তারই অংশ। এগুলোর প্রত্যেকটির আলাদা গল্প আছে, কিন্তু সবকিছু বিস্তারিত বলতে গেলে মূল ছবিটি হারিয়ে যায়। সেই মূল ছবিটি হলো, কানাডা এখন আবার বড় প্রকল্প নির্মাণের পথে ফিরেছে। আর এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন শুধু কোথায় কী নির্মিত হচ্ছে, সেটি নয়; এসব প্রকল্পে প্রয়োজনীয় বিপুল বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

তার একটি বড় উত্তর পাওয়া যেতে পারে আগামী ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর টরন্টোতে। সেখানে অনুষ্ঠিত হবে প্রথম Canada Investment Summit। বিশ্বের বৃহত্তম বিনিয়োগ তহবিল, পেনশন তহবিল, রাষ্ট্রীয় সম্পদ তহবিল ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা সেখানে আসবেন। প্রধানমন্ত্রী কার্নির সাম্প্রতিক বক্তব্য অনুযায়ী, অংশ নিতে যাওয়া বিনিয়োগকারীরা সম্মিলিতভাবে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করেন। কানাডা তাদের সামনে তুলে ধরবে বিদ্যুৎ, খনিজ, পারমাণবিক শক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অবকাঠামো ও শিল্পে বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা।

ট্রাম্পের শুল্কযুদ্ধ এই কর্মযজ্ঞকে নতুন তাৎপর্য দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে নতুন বাজার, নতুন শিল্প এবং নিজের জ্বালানি ও খনিজসম্পদকে কাজে লাগানোর তাগিদ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। কার্নির লক্ষ্য পাঁচ বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ সচল করা। ইতোমধ্যে ২৭টি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগে প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলারের বেসরকারি বিনিয়োগের কথা সামনে এসেছে। অন্টারিও একাই আগামী দশকে ২১০ বিলিয়ন ডলারের বেশি সরকারি অবকাঠামো কর্মসূচি নিয়ে এগোচ্ছে। আর আটলান্টিকের তলদেশ দিয়ে ইউরোপ পর্যন্ত বিদ্যুৎ পাঠানোর মতো উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাও এখন আলোচনার টেবিলে।

সব মিলিয়ে কানাডা এমন এক অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে এগোচ্ছে, যেখানে জ্বালানি, খনিজ, শিল্প, যোগাযোগ ও প্রযুক্তিকে একই সুতোয় গাঁথার চেষ্টা চলছে। দেশের এক প্রান্তে নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্য প্রান্তে খনি ও বন্দর; কোথাও নতুন পাইপলাইন, কোথাও সাবওয়ে, ব্যাটারি কারখানা কিংবা মহাসড়ক। বিনিয়োগের অঙ্ক কয়েকশ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে ট্রিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যের দিকে যাচ্ছে, আর এর সঙ্গে তৈরি হচ্ছে বিপুল কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা। একের পর এক এই মহাপ্রকল্পই এখন বদলে দিচ্ছে কানাডার অর্থনৈতিক মানচিত্র।

তথ্যসূত্র:
Prime Minister of Canada, Major Projects Office
Government of Ontario


Back to top button
🌐 Read in Your Language