পশ্চিমবঙ্গ

ভোটার তালিকা সংশোধন ও ২০২৬ সালের নির্বাচন: পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের পতনের নেপথ্য কারণ

কলকাতা, ৫ মে – পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল কংগ্রেস শাসনের অবসান ঘটিয়ে নীল সাদা প্রাসাদের দায়িত্ব বুঝে নিয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি। এই বিশাল রাজনৈতিক পরিবর্তনের পেছনে নির্বাচন কমিশনের স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া সবথেকে বেশি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজ্যজুড়ে ৯০ লক্ষের বেশি ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়া নিয়ে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল, ভোটের ফলাফলে তার গভীর প্রতিফলন দেখা গেছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে শুরু থেকেই অভিযোগ করা হয়েছিল যে, ভোটার তালিকা সংশোধনের এই প্রক্রিয়াটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতে গণহারে নাম বাদ দেওয়াকে শাসক দল তাদের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংককে লক্ষ্য করে চালিত একটি কৌশল হিসেবে বর্ণনা করেছিল।

মমতা ব্যানার্জির নেতৃত্বাধীন দলটির আশঙ্কা ছিল যে, এই প্রক্রিয়ার ফলে তাদের একটি বড় অংশের জনসমর্থন গাণিতিক হিসাব থেকে হারিয়ে যাবে। নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল বলছে, তৃণমূলের সেই আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হয়েছে এবং এই ভোটার বিয়োজনই তাদের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যে ১৪৭টি কেন্দ্রে ২৫ হাজারের বেশি নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছে, সেখানে বিজেপির জয়জয়কার স্পষ্ট। এই কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বিজেপি একাই ৯৫টি আসনে জয়লাভ করেছে, যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৫১টি আসন।

শতাংশের হিসেবে দেখা যাচ্ছে যে, যে সমস্ত এলাকায় ভোটার তালিকায় বড় ধরনের রদবদল হয়েছে, সেখানেই বিজেপির জয়ের হার সবথেকে বেশি। এই তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, ভোটার তালিকার শুদ্ধিকরণ প্রক্রিয়া আদতে রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়েছে। মাঝারি ধরনের নাম বাদ পড়া কেন্দ্রগুলোতেও বিরোধী শিবিরের আধিপত্য ছিল লক্ষ্যণীয়। যে ৬৭টি আসনে ১৫ হাজার থেকে ২৫ হাজারের মধ্যে ভোটার বিয়োজন হয়েছে, সেখানেও বিজেপি ৪৭টি আসন দখল করে তাদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রেখেছে। তৃণমূল সেখানে মাত্র ১৯টি আসনে জয়ী হতে পেরেছে।

এমনকি যেখানে ৫ হাজার থেকে ১৫ হাজারের মধ্যে নাম বাদ গেছে, সেই ৬২টি আসনের মধ্যে ৫০টিতেই বিজেপি জয়ী হয়েছে। অর্থাৎ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সংখ্যার সাথে সরাসরি বিজেপির জয়ের একটি গাণিতিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে। মুর্শিদাবাদ জেলার চিত্রটি এবারের নির্বাচনে সবথেকে বেশি চমকপ্রদ ছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস এই জেলায় ২২টির মধ্যে ২০টি আসনেই জয়লাভ করেছিল। কিন্তু এবারের এসআইআর প্রক্রিয়ায় এই জেলাতেই সবথেকে বেশি প্রায় ৪.৫৬ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ে।

এর সরাসরি প্রভাব ব্যালট বক্সে দেখা গেছে, যেখানে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ২০ থেকে কমে ৯-এ দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংখ্যালঘু ভোটে ফাটল এবং হিন্দু ভোটের মেরুকরণ এই পতনের প্রধান কারণ। একই দৃশ্যপট তৈরি হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা জেলাতেও। গত নির্বাচনে এই জেলায় তৃণমূলের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল এবং তারা ৩৩টির মধ্যে ২৮টি আসনেই জয়ী হয়েছিল। তবে এবারের নির্বাচনে সেই সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে কমে গিয়ে মাত্র ৮-এ দাঁড়িয়েছে। এই জেলায় প্রায় ৩.২৫ লক্ষ ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়েছিলেন, যার বড় অংশই সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা ছিলেন।

তৃণমূলের এই শক্ত ঘাঁটিতে ফাটল ধরাতে ভোটার তালিকা সংশোধনের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। মালদহ জেলার ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা গেছে যেখানে ১২টি আসনের মধ্যে তৃণমূলের আসন সংখ্যা ৮ থেকে কমে ৬-এ দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এই রাজ্যে অনুপ্রবেশকারী এবং ভুয়া ভোটার চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশন যে বিশেষ অভিযান চালিয়েছিল, তাতে প্রায় ৯১ লক্ষ ভোটারকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়।

গত বছর নভেম্বরে শুরু হওয়া এই প্রক্রিয়ায় ধাপে ধাপে খসড়া তালিকা এবং চূড়ান্ত তালিকার মাধ্যমে এত বিশাল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়া হয় যা পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী ইতিহাসে আগে কখনও দেখা যায়নি। পরিশেষে নির্বাচন কমিশনের এই এসআইআর প্রক্রিয়াটিই এবারের বিধানসভা নির্বাচনের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে কাজ করেছে। কমিশনের দাবি অনুযায়ী, মৃত এবং দ্বৈত ভোটারদের সরিয়ে তালিকা স্বচ্ছ করার এই পদক্ষেপটি ছিল প্রশাসনিক রুটিন কাজ। তবে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল রাজ্যে এই প্রশাসনিক পদক্ষেপটিই শেষ পর্যন্ত এক যুগের বেশি সময় ধরে চলা রাজনৈতিক জমানার পতনের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

এস এম/ ৫ মে ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language