
মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারে বাংলাদেশিদের অবস্থান অত্যন্ত দৃঢ়। প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক সেখানে কাজ করছে নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতা, পরিবহণসহ বিভিন্ন খাতে। অল্প মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, এবং কঠিন জীবনযাপন সত্ত্বেও তারা সৎ ও পরিশ্রমী। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্সেই টিকে আছে দেশের রিজার্ভ।
বাংলাদেশিরা আরবিদের কাছে খুবই বিশ্বস্ত। এরা দেশে যা-ই করুক, বিদেশে সৎভাবেই জীবন যাপন করে। বাংলাদেশিরা তেমন কোনো ধরনের অপরাধের সাথে জড়িত না। নিয়মিত, সময়মতো কর্মস্থলে উপস্থিত থাকে। মধ্যপ্রাচ্যের নিয়োগকর্তাদের মধ্যে বাঙালিরা তথা বাংলাদেশিরা হচ্ছে প্রথম পছন্দ।
ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত আসে, যখন কোনো জাতির সম্মানে আঘাত লাগলে, তখন সাধারণ মানুষও হয়ে ওঠে অন্য রকম। সংযমের গভীরে জমে থাকা ক্ষোভ কখনো কখনো এমন বিস্ফোরণ ঘটায়, যা বছরের পর বছর স্মৃতিতে রয়ে যায়। এমন একটি ঘটনা ঘটেছিল আমিরাতের মাটিতে। পরে সেটি আর নিছক কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকেনি, বরং হয়ে উঠেছিল একটি জাতির সম্মান রক্ষার প্রতীক।
২০০৭ সাল। আরব আমিরাত আদালত ছয় বাংলাদেশির শিরচ্ছেদের রায় দিয়েছে। তাদের অপরাধ তারা এক পাকিস্তানিকে রান্নাঘরের বটি দিয়ে দুই টুকরো করে ফেলেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপট: আরবিদের পুরনো একটি বড় বাড়িতে বেশ ক’জন ব্যাচেলর বাঙালি, পাকিস্তানি এবং ভারতীয় কয়েকটি রুম ভাগাভাগি করে বসবাস করে। পেশায় এরা সবাই সাধারণ শ্রমিক। তারা বিভিন্ন কন্ট্রাকটারের অধীনে খুব অল্প বেতনে কাজ করে। ছোট্ট একটা রুমে যেখানে থাকার কথা দুইজনের, সেখানে গাদাগাদি করে থাকে দশজন। দেশে থাকা পরিবার পরিজনের স্বার্থে এ কষ্টের জীবন তারা এভাবেই মেনে নিয়েছে।
এক শুক্রবার ছুটির দিন বিকেলে ঘরের বারান্দায় দুই রুমমেট সোহাগ ও নয়ন রান্নার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। রুমের ভেতর ক্যাসেট প্লেয়ারে বাজছে বাংলা গান। এমন সময় এক পাকিস্তানির আগমন ঘটে।
একথা-সেকথা বলার পর বাংলাদেশ ও বাঙালিদের নিয়ে বিদ্রুপ করে নানান মন্তব্য করতে থাকে পাকিস্তানি লোকটি। এক পর্যায়ে বলে-‘তোমাদের খাওয়াদাওয়া, চলাফেরা সব ইন্ডিয়ানদের মতো।’
সোহাগ প্রতিবাদের সুরে উত্তর দেয়-‘ইন্ডিয়ানদের মতো হতে যাবে কেন? আমরা তো বাংলাদেশি! আমরা আমাদের মতো করে খাই, আমরা আমাদের স্টাইলে চলি। মূর্খের মতো কথা বল কেন?’
পাকিস্তানিটি তখন উত্তেজিত হয়ে বলে-‘তোমাদের জন্মটা কি আমার অজানা? ইন্ডিয়াকে পাকিস্তানিরা… করে …করেছিল আর তারপরে তোমাদের ঐ তথাকথিত সোনার বাংলার জন্ম।’ সে বিদ্রুপ করতেই থাকে।
নয়ন তখন তাকে মুখ সামলে কথা বলার জন্য হুশিয়ারি দেয়। সোহাগ তাকে এখান থেকে চলে যাওয়ার জন্য বলে।
পাকিস্তানিটি তখন আরও গলা উঁচিয়ে তাদের উদ্দেশ্য করে বলে-‘৭১ সালে পাকিস্তানিরা ৯৯% বাঙালি নারীকে গর্ভবতী করে এসেছিল; এরপর থেকে বাঙালি একটা কালো, একটা সাদা, যেমনটি তোমরা দুইজন দুইরকম…।’
সেই মুহূর্তেই বিস্ফোরণটি ঘটে যায়। কথা শেষ না-হতেই নয়ন তার কাছে থাকা বটি দিয়ে এক কোপে পাকিস্তানিকে দুই টুকরা করে ফেলে। অর্থাৎ শরীর থেকে মাথা আলাদা হয়ে যায়। পলকের মধ্যে ঘটে যায় ঘটনা। ছুটে আসে আশপাশের মানুষ। আসে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে হাতকড়া লাগিয়ে ঘরের মধ্যে যে-ক’জন ছিল সবাইকে ধরে নিয়ে যায়।
ঘটনার পর স্থানীয় মিডিয়ায় ফলাও করে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনাটি প্রকাশ পায়। মুখে-মুখেও খবরটি পৌঁছে যায় এক শহর থেকে অন্য শহরে। মামলা ওঠে আদালতে। নয়ন একা খুন করেছে বলে স্বীকারোক্তি দিলেও তাকে সহযোগিতা করার অপরাধে বাকিদের দোষী সাব্যস্ত করে আদালত।
আমিরাতের নিয়ম অনুযায়ী হত্যার সাজা হত্যা অর্থাৎ শিরচ্ছেদ। তবে নিহতের নিকটাত্মীয় (স্ত্রী, সন্তান, মা, বাবা) যদি ক্ষমা করে দেয় তাহলে সাজা মওকুফ হতে পারে। অথবা যদি আদালত কর্তৃক নির্ধারিত নগদ অর্থদন্ড (Blood Money) পরিশোধ করা যায় তবে শিরচ্ছেদ রহিত হতে পারে। বিভিন্নভাবে চেষ্টা করা হলো নিহতের পরিবারের সাথে, কিন্তু লাভ হলো না। তারা কেবল আদালত কর্তৃক নির্ধারিত অর্থদন্ডের পক্ষে অবস্থান নিলো।
দন্ডপ্রাপ্তদের বাড়ি চট্টগ্রামের কোনো-এক প্রত্যন্ত গ্রামে। বলতে গেলে সবাই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। কেউ কেউ অতি দরিদ্র পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। এত টাকা তারা পাবে কোথায়?
এদিকে প্রকৃত ঘটনা জানাজানি হওয়ায় ভেতরে ভেতরে ফুঁসতে থাকে আমিরাত-প্রবাসী বাঙালিরা। আদালতের রায় তারা মেনে নিতে পারছিল না। আলাপ-আলোচনায়, টেলিফোনে-সাক্ষাতে একই কথা-‘খুন করেছে বেশ করেছে। উচিত শিক্ষা দিয়েছে। নয়নের জায়গায় আমরা হলেও একই কাজ করতাম।’
আবেগপ্রবণ বাঙালির অন্তরাত্মা কেঁদে ওঠে। হত্যাকারী যুবক যে একজন দেশপ্রেমিক তাতে কারও কোনো সন্দেহ নাই। দেশের অপমান সহ্য করতে পারেনি বলেই সে পাকিস্তানিকে হত্যা করেছে। অল্প সময়ের মধ্যে একজন বীর হিসেবে যুবকটি সকল বাংলাদেশির হৃদয়ে স্থান করে নিলো। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে।
জনমত তৈরি হতে বেশি দিন লাগলো না। শুরু হলো প্রচারণা এবং অর্থসংগ্রহ। দলমত নির্বিশেষে সকল বাঙালি এক কাতারে। এ যুবকদের বাঁচাতেই হবে। জাতীয় মর্যাদার প্রশ্ন। চট্টগ্রামের চেম্বার এবং স্থানীয় ব্যাবসায়ীরাও অর্থ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এলেন।
সহযোগিতার জন্য দূতাবাসের ওপরও চাপ সৃষ্টি করা হলো। খবর চলে গেল পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় হয়ে সরকারের উচ্চমহলে। আমিরাত কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনা হলো। তারা জানালো, যদি নির্দিষ্ট তারিখের আগে উল্লেখিত অর্থ পরিশোধ করা হয় তাহলে দন্ডপ্রাপ্তরা শিরচ্ছেদ থেকে মুক্তি পেতে পারে।
অতঃপর বাংলাদেশ সরকার মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত ৬ বাংলাদেশিকে বাঁচাতে দুই লক্ষ দিরহাম (প্রায় ৫৪ হাজার ইউএস ডলার) প্রদান করার জন্য শ্রম মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিলো। আবুধাবীতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নির্দিষ্ট তারিখের একদিন আগে সমুদয় অর্থ পরিশোধ করলে শিরচ্ছেদের আদেশ থেকে যুবকেরা রেহাই পায়।
২০১০ সালের এপ্রিল মাসে মুক্তিপ্রাপ্ত যুবকদের দেশে পাঠিয়ে দেওয়ার জন্য দুবাই বিমানবন্দরে নিয়ে আসা হয়। আমিরাতের বিভিন্ন শহর থেকে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি বিমানবন্দরে ছুটে আসেন তাদেরকে একনজর দেখার জন্য। স্থানীয়ভাবে যে অর্থ সংগ্রহ হয়েছিল, তা ওই তরুণদের উপঢৌকন হিসেবে প্রদান করা হয়।
সর্বোপরি এ ঘটনায় পুরো আরবভূখন্ডে তীব্র চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশিদের প্রতি পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে যেতে থাকে। এই ঘটনার মাধ্যমে প্রবাসজীবনে বাংলাদেশিদের দেশপ্রেম বিশ্ববাসীর চোখে নতুনভাবে উদ্ভাসিত হয়। সহিষ্ণুতা আর আত্মমর্যাদার রক্ষাকল্পে ঘটে যাওয়া এই বিস্ফোরণ বাংলাদেশিদের তুলে ধরে এক সম্মানিত জাতি হিসেবে।
তথ্যসূত্র:
১. AFP (Agence France-Presse): 28 July 2007 & 7 April 2010
২. Reuters: 29 July 2007 & 8 April 2010
৩. BBC News: 30 July 2007
৪. Gulf News (UAE): 31 July 2007









