সম্পাদকের পাতা

অনিশ্চয়তার অন্ধকারে আসিফ মাহমুদ প্রিন্স

নজরুল মিন্টো

সিবিসির সিবিসির অ্যাবি কোলের ক্যামেরায় আসিফ মাহমুদ প্রিন্স

উত্তর আটলান্টিকের দ্বীপ নিউফাউন্ডল্যান্ডের পূর্ব উপকূলে অবস্থিত সেন্ট জন’স। এই শহরটির রঙিন ঘরবাড়ি, ঢেউ খাওয়া পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি আর দূর থেকে ভেসে আসা নৌবাতির আলো এক অদ্ভুত সৌন্দর্য তৈরি করে। এখানে শীত দীর্ঘ, বাতাসে থাকে সামুদ্রিক স্পর্শ, আর এখানকার মানুষগুলোর মন উষ্ণ অভ্যর্থনায় ভরা।

এই শহরের প্রাণকেন্দ্রে মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউফাউন্ডল্যান্ড। কানাডার অন্যতম বড় ও বৈচিত্র্যময় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা দেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থীকে স্বাগত জানায়। সাশ্রয়ী টিউশন ফি, নিরাপদ পরিবেশ, শান্ত শহর এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের উন্নতির জন্য বিস্তৃত সুযোগ সুবিধা তরুণদের কাছে সেন্ট জন’স-কে স্বপ্ন পূরণের জায়গায় পরিণত করেছে।

সেই স্বপ্নের পথ ধরেই কানাডায় এসেছিলেন আসিফ মাহমুদ প্রিন্স। তার দেশের বাড়ি টাঙ্গাইল। ‘দেশে বিদেশে’ মিডিয়াকে তিনি জানান, ২০১৭ সালে তিনি ভিজিটর হিসেবে কানাডায় আসেন। ভর্তি হয়েছিলেন মেমোরিয়াল ইউনিভার্সিটি অব নিউফাউন্ডল্যান্ডে, ব্যবসায় প্রশাসনে পড়াশোনার জন্য। স্বপ্ন ছিল পড়াশোনা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করা, জীবনকে স্থিতিশীল করা, এবং একদিন নিজের পরিবার গড়ে তোলা। কিন্তু সেই স্বপ্নের মাঝপথেই চিকিৎসকরা এক কঠিন সংবাদ দিলেন। তিনি দূরারোগ্য ব্যধি ক্যান্সারে আক্রান্ত।

প্রিন্স জানান, ২০২২ সালে ক্যান্সার ধরা পড়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, রোগটি সম্ভবত সাত থেকে বারো বছর ধরে তাঁর দেহে ছিল। বাংলাদেশে থাকার সময় নানা শারীরিক উপসর্গ দেখা দিলেও অভিজ্ঞতার অভাবে স্থানীয় চিকিৎসকেরা রোগটি শনাক্ত করতে পারেননি। তাঁর বাবা ফার্মেসি থেকে ওষুধ এনে সাময়িকভাবে উপসর্গ কমানোর চেষ্টা করেছিলেন।

২০২৩ সালে ক্যান্সার ফুসফুসে ছড়িয়ে পড়ে এবং ২০২৪ সালে চিকিৎসকেরা জানান, তাঁর ক্যান্সার এখন iodine-refractory, তাই এটি আর নিরাময়যোগ্য নয়। তাঁদের মতে, সর্বোচ্চ আর দুই থেকে তিন বছর তিনি বাঁচতে পারেন।

চিকিৎসকেরা জানান, তার চিকিৎসা এখন কেবল উপশমমূলক। সেই মুহূর্তে একজন তরুণ ছাত্রের জীবন থমকে যায়। তিনি পড়াশোনা বন্ধ করতে বাধ্য হন।

সেন্ট ক্লেয়ার’স মার্সি হাসপাতালের সাদা করিডর থেকে বেরিয়ে এসেছিলেন মাত্র কদিন আগে। অসুস্থ শরীর, ক্লান্ত চোখ, বুকের ভেতর অজানা উদ্বেগ। সেই সময়েই জীবনের আরেক অধ্যায় তাঁর সামনে এসে দাঁড়ায়। জানানো হয় যে তিনি বাবা হতে যাচ্ছেন। সেই খবরের শব্দ এখনো তার কানে বাজে। আনন্দ আর আতঙ্ক একসঙ্গে মিশে গিয়েছিল সেই দিনে।

পুত্র টেরেন্সকে সাথে নিয়ে আসিফ মাহমুদ প্রিন্স

তিনি বাবা হয়েছেন। ছেলেটি এখন দু’বছরের। ছোট হাত দুটো তাঁর আঙুল জড়িয়ে ধরে রাখে, যেন জীবনের সাথে তাঁকে আরও কিছুটা সময়ের জন্য বেঁধে রাখতে চায়। ছোট্ট শিশুর হাসি, মায়াবী চোখ আর স্নেহময় স্পর্শই এখন তাঁর বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় শক্তি।

প্রিন্স বর্তমানে প্যালিয়েটিভ কেয়ারের অধীনে আছেন। তাঁর ঘাড়ের জুগুলার ভেইন ঘিরে ক্যান্সার ছড়িয়ে থাকায় সার্জারির ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি। কেমো বা অন্যান্য থেরাপি ব্যবহারের সম্ভাবনা মাত্র চল্লিশ শতাংশ হলেও তাতে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই চিকিৎসকেরা আপাতত নিয়মিত মনিটরিং করছেন এবং প্রতি ছয় মাস অন্তর পরীক্ষা করছেন। ভবিষ্যতে ইমিউনোথেরাপি বৈধ হলে তাঁর চিকিৎসায় আশার একটি নতুন পথ খুলতে পারে।

চিকিৎসক ড. জয় ম্যাকার্থি বলেছেন, তাঁর পক্ষে বাংলাদেশে যাওয়া নিরাপদ নয়। রক্তজমাট বাঁধার ঝুঁকি এতটাই বেশি যে কোনো ভ্রমণ তাঁর জীবনের জন্য বিপজ্জনক।

এদিকে, তাঁর ইমিগ্রেশন স্ট্যাটাস visitor হিসেবে রয়েছে। TRP বা Temporary Resident Permit প্রত্যাখ্যাত হয়েছে, তবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া এবং H&C Permanent Residency আবেদনের ফলাফলের জন্য তাঁকে extended visitor status দেওয়া হয়েছে। তাঁর H&C আবেদন এখনও IRCC–এর প্রক্রিয়ায় রয়েছে এবং অপেক্ষার এই দীর্ঘ সময়ই তাঁর সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা।

অন্যদিকে, নিউফাউন্ডল্যান্ড ও ল্যাব্রাডর সরকারের স্বাস্থ্যসেবা পরিকল্পনা এমসিপি-এর সুবিধা আগামী এপ্রিলে শেষ হয়ে যাচ্ছে। এরপর চিকিৎসা নেওয়া তাঁর পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।

সেন্ট জন’স ভিত্তিক আইনজীবী মেগান ফেল্ট তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি বলছেন, এটি একেবারে স্পষ্ট পরিস্থিতি। একজন অসুস্থ বাবা যার কানাডিয়ান সন্তানের উপর বৈধ হেফাজত রয়েছে। মানবিকতার প্রশ্নে তাঁর আবেদন দ্রুত প্রক্রিয়াকরণ হওয়া উচিত। কিন্তু নিয়মের দেয়াল যেন আরও উঁচু হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

ফেডারেল মন্ত্রীদের কাছে চিঠি লেখা হয়েছে। এমপি অফিস থেকেও জরুরি প্রক্রিয়াকরণের অনুরোধ জানানো হয়েছে। কিন্তু আইআরসিসির উত্তর একই থাকে। সব আবেদন নিয়মমাফিক কিউতে আছে এবং অপেক্ষা দীর্ঘ হবে। এই দীর্ঘ অপেক্ষাই প্রিন্সের সবচেয়ে বড় ভয়।

স্থায়ী বসবাসের জন্য আবেদন করেছেন প্রিন্স, কিন্তু সিবিসিকে আইআরসিসি জানিয়েছে, আবেদনটি প্রক্রিয়াকরণে গড়ে দশ বছর সময় লাগতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে এই সময় পঞ্চাশ বছর পর্যন্তও গেছে। এই সময়সীমা প্রিন্সের হাতে নেই। তিনি জানেন, তার জীবন এত দীর্ঘ নয়।

আইনজীবী মেগান ফেল্ট জানিয়েছেন, মানবিক কারণে আবেদনটি শেষ পর্যন্ত অনুমোদিত হবে বলে তাঁর বিশ্বাস। কিন্তু অপেক্ষার সময় যেমন দীর্ঘ, তেমনি অনিশ্চিত। এখন তাদের লক্ষ্য হচ্ছে প্রিন্সের আবেদনটি প্রাথমিক অনুমোদন পাওয়া।

এই অনুমোদন পেলে প্রিন্স ওপেন ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারবেন। তাতে তিনি আবার এমসিপি কার্ড পাবেন এবং নিজের ও সন্তানের জন্য কিছু আয়ের পথ খুলবে।

সম্প্রতি সিবিসি নিউজ তাকে নিয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে, কাজ করতে না পারায় প্রিন্সের কোনো আয়ের পথ নেই। সামাজিক সহায়তাও পান না। তাঁর খাওয়া, ঘরভাড়া, দৈনন্দিন প্রয়োজন, সবকিছুর ভার প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সিবিসি নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের সাংবাদিক অ্যাবি কোল তার গল্পটি সামনে নিয়ে এসেছেন। কারণ এটি শুধু একটি ব্যক্তির রোগের গল্প নয়, এটি এক পিতার সংগ্রাম। একজন মানুষ যার জীবনের সময় কমে আসছে, তবুও তার বুকের ভেতরে জ্বলছে দায়িত্ব আর ভালোবাসার মশাল।

গল্পটি প্রকাশের পর সামাজিক আলোচনায় উঠে এসেছে মানবিক আবেদন। একজন বাবার জীবন কি অপেক্ষার কাগজে আটকে থাকবে? নাকি মানবিকতা প্রক্রিয়ার চেয়ে আগে বিবেচিত হবে?

এতোদিন কিভাবে চললেন এ প্রশ্নের জবাবে প্রিন্স জানান, ২০১৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত তিনি নিজের আয়ে ও পরিবারের টিউশনের সহায়তায় জীবন চালিয়েছেন। ২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত কিছু স্বল্পমেয়াদি চাকরি, তিন হাজার ডলার GoFundMe সহায়তা এবং পারিবারিক সমর্থনে চলছিলেন। এরপর ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত EI সুবিধা এবং পরিবারের আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত সীমিত পারিবারিক সহায়তা পেয়েছিলেন, কিন্তু আগস্টের পর সেই সহায়তাও বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে Cancer Care Foundation এবং স্থানীয় কমিউনিটির কিছু সহায়তার ওপর নির্ভর করেই তিনি দিন পার করছেন।

প্রিন্স জানান, তাঁর দাম্পত্য জীবনে অশান্তি নেমে এসেছে। তার স্ত্রী সন্তানকে নিয়ে আলাদা থাকেন। ইমিগ্রেশন জটিলতা, রোগের ক্রমাগত যন্ত্রণা, আর্থিক অস্থিরতা, পারিবারিক টানাপোড়েন এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যত তাঁর মানসিক ভারকে আরও ভারী করে তুলেছে।

চলমান আইনি প্রক্রিয়ার কারণে তিনি নিয়মিতভাবে সন্তানকে কাছে পান না। তবুও বুকের গভীরে একটি আশার আলো ধরে রেখেছেন। তিনি বলেন, “আমার বেঁচে থাকার সবচেয়ে বড় কারণ আমার ছেলে টেরেন্স। আমি যতদিন আছি, তার ভবিষ্যৎটাকে নিরাপদ করে যেতে চাই।”

শেষ পর্যন্ত প্রিন্সের আকুতি একটাই। “আমি কাজ করতে চাই, কিছু সঞ্চয় করতে চাই, সন্তানের সঙ্গে সময় কাটাতে চাই। তার ভবিষ্যৎটাকে একটু হলেও নিরাপদ করতে চাই।”

প্রিন্স স্বপ্ন দেখেন ছেলে তাকে বাবা ডাকবে। সে যখন হাঁটতে শিখবে, কথা বলতে শিখবে, স্কুলে যাবে, তখন তিনি পাশে থাকবেন। এই স্বপ্নই তাঁকে প্রতিদিন বাঁচিয়ে রাখে।

তার এই সংগ্রামে সহায়তা করতে স্থানীয় শিক্ষার্থীরা “Donate to Help Asif Fight Cancer to Stay With His Son” নামে একটি তহবিল সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছেন। প্রিন্সের চিকিৎসা, জীবনযাপন এবং সন্তানের ভবিষ্যৎ রক্ষায় এই সহায়তাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হয়তো এক সন্তানের বাবাকে আরও কিছুদিন ধরে বাঁচিয়ে রাখতে পারে।

তহবিল সংগ্রহের লিংক: https://www.gofundme.com/…/help-asif-win-his-fight…)

তথ্যসূত্র:

১. CBC News, Abby Cole (২৫ নভেম্বর ২০২৫, আপডেট: ২৮ নভেম্বর ২০২৫)
২. দেশে বিদেশে’র সাথে বিশেষ সাক্ষাৎকার (৬ ডিসেম্বর, ২০২৫)


Back to top button
🌐 Read in Your Language