
টরন্টো শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত জেরার্ড স্ট্রিট এক সময় ছিল নিঃসঙ্গ, সুনসান এক সড়ক। কিন্তু ষাট ও সত্তরের দশকে যখন দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের ঢেউ আছড়ে পড়ে কানাডার বুকে, সেই সড়ক বদলে যেতে থাকে ধীরে ধীরে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অভিবাসীরা এদেশে শুধু স্বপ্ন নিয়ে আসেননি—তাঁরা এনেছেন সংস্কৃতি, খাবার, সংগীত ও শিল্পের ঐতিহ্যের ধারা। তাদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে ‘জেরার্ড ইন্ডিয়া বাজার’—একটি ক্ষুদ্র উপমহাদেশ, যা রূপ নিতে থাকে কানাডার সবচেয়ে প্রাচীন ও বিখ্যাত দক্ষিণ এশীয় বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক হাবে। অনেকে জেরার্ড ষ্ট্রিটকে দক্ষিণ এশিয়ার ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’ হিসেবে অভিহিত করে থাকেন।

১৯৮১ সালে টরন্টো সিটি কর্পোরেশন এই এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে Business Improvement Area (BIA) হিসেবে ঘোষণা করে। এটি ছিল অভিবাসী ব্যবসায়ীদের জন্য একটি সুসংগঠিত ও সহায়ক কাঠামোর সূচনা, যেখানে একটি বাজার শুধু ব্যবসার জন্য নয়, হয়ে ওঠে একটি জীবন্ত সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু।

২০০২ সাল। টরন্টোর গ্রীষ্মকালীন বাতাসে প্রথমবারের মতো প্রতিধ্বনিত হয় দক্ষিণ এশিয়ার সুর। জেরার্ড ষ্ট্রিট এর বুকে শুরু হয় ফেস্টিভাল অফ সাউথ এশিয়া—একটি স্ট্রিট ফেস্টিভ্যাল যা আজ উত্তর আমেরিকার সবচেয়ে বড় দক্ষিণ এশীয় উৎসব হিসেবে পরিচিত।

ব্যস্ততম জেরার্ড স্ট্রিটের একটি প্রধান অংশ—যেখানে TTC-র স্ট্রিটকার প্রতিনিয়ত চলাচল করে—সেই রাস্তা দু’দিনের জন্য রূপ নেয় এক বিশাল পায়ে হাঁটার জনপথে। স্ট্রিটকারের রুট সাময়িকভাবে পরিবর্তন করে, সড়কের মাঝে গড়ে তোলা হয় অস্থায়ী মঞ্চ আর নানান বর্ণের, নানান পণ্যের শত শত স্টল। দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশ অবাধ—কোনো টিকিট নয়, শুধু খোলা মন আর উৎসুক চোখ। এই উৎসবটি হয়ে ওঠে কানাডার বহু সংস্কৃতির মিলনমেলা—সংস্কৃতি, শিল্প, গান, খাবার আর মানুষে মানুষে সংলাপ ও সহাবস্থানের এক অনন্য প্ল্যাটফর্ম।

গত শনিবার ও রবিবার (১৯ ও ২০ জুলাই ২০২৫) দু’দিনব্যাপী উত্তর আমেরিকার বৃহত্তম দক্ষিণ এশীয় উৎসব ফেস্টিভাল অফ সাউথ এশিয়া অনুষ্ঠিত হয়। এতে ২৫০,০০০-এরও বেশি দর্শক আসেন এবং একাধিক মঞ্চে ২০০-এর বেশি লাইভ পরিবেশনা উপভোগ করেন। অংশগ্রহণকারী দর্শকরা ঐতিহ্যবাহী ও আধুনিক সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি উপভোগ করেন, ফ্যাশন, শিল্প ও কারুশিল্পে ভরপুর একটি প্রাণবন্ত বাজার ঘুরে দেখেন এবং স্থানীয় বিক্রেতা ও রেস্তোরাঁ থেকে দক্ষিণ এশিয়ান খাবারের স্বাদ নেন।

প্রতিবছরের মতো ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের অংশগ্রহণ এবছরও ছিল উৎসবে। তবে আলাদা করে এবছর যে প্যাভিলিয়নটি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় ছিল তা হলো—বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন। উৎসবের প্রবেশমুখেই স্থাপিত এই প্যাভিলিয়নটিতে লিখা ছিল: “হৃদয়ে বাংলাদেশ”।

Bangla Events GTA ও YCP Foundation-এর সম্মিলিত উদ্যোগে এই প্যাভিলিয়নটি হয়ে ওঠে উৎসবের প্রাণকেন্দ্র। সকাল থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত এখানে চলেছে নৃত্য, সংগীত ও আবৃত্তি। প্যাভিলিয়নের সামনে রাখা হয় একটি রিকশা—বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী বাহন—যেখানে দর্শনার্থীরা উৎসবের স্মৃতিকে বন্দি করে রাখছেন ফটোফ্রেমে। এই একটি রিকশাই যেন হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতীক।

জেরার্ড ষ্ট্রিটে আয়োজিত প্রতিবছরের এই উৎসব এখন শুধু একটি সাংস্কৃতিক প্রদর্শনী নয়, বরং একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক ইঞ্জিন। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, উৎসব চলাকালে স্থানীয় ভেন্ডর ও রেস্তোরাঁগুলোর বিক্রয় ছুঁয়ে যায় $৮-১২ মিলিয়নের ঘর। পোশাক, অলংকার, হস্তশিল্প এবং খাদ্যপণ্যের চাহিদা এতটাই বেশি যে অনেক ব্যবসায়ী উৎসব উপলক্ষে অতিরিক্ত কর্মী নিয়োগ দেন।

Toronto City Corporation উৎসবের প্রধান স্থানীয় সহযোগী। তারা BIA প্রোগ্রামের মাধ্যমে $১৫০,০০০ – $২০০,০০০ ডলার এবং স্পেশাল ইভেন্ট গ্রান্ট হিসেবে $৫০,০০০ – $১০০,০০০ ডলার অর্থায়ন করে থাকে। ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, রাস্তা বন্ধের অনুমতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তায় সহযোগিতা প্রদান করে। Toronto Tourism উৎসব প্রচারে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট ও সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে উল্লেখযোগ্য প্রচার চালায়।

অন্যদিকে, অন্টারিও সরকার Ontario Cultural Attractions Fund (OCAF) থেকে $৫০,০০০ – $১০০,০০০ ডলার এবং Ontario Tourism Development Fund থেকে $৭৫,০০০ ডলার অর্থ সহায়তা করে থাকে।
ফেডারেল সরকারের পক্ষ থেকে Canada Heritage Grants-এর মাধ্যমে Multiculturalism Program থেকে $১২০,০০০ ডলার সহায়তা আসে।
সর্বমোট ২০২৫ সালে সরকারি সহায়তার পরিমাণ দাঁড়ায় আনুমানিক $৬৭০,০০০ ডলার, যা এই উৎসবের সফলতা ও টিকে থাকার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।
এছাড়াও Gerrard India Bazaar-এর ইনফ্রাস্ট্রাকচার আপগ্রেডে ২০২৩-২০২৬ মেয়াদে $২ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে।
টিডি ব্যাংক এই উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। প্রতিবছর তারা $২০০,০০০ থেকে $৫০০,০০০ ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করে, যা ব্যবহৃত হয় মঞ্চ নির্মাণ, সিকিউরিটি, মার্কেটিং ও লজিস্টিকস খাতে।

Rogers, Scotiabank, Uber ও Amazon-এর মতো প্রতিষ্ঠানও সমর্থন প্রদান করে থাকে, যাদের সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণ $১ মিলিয়নেরও বেশি। স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও পিছিয়ে নেই—জুয়েলারি স্টোর, ফ্যাশন হাউস ও রেস্তোরাঁ মিলিয়ে তাদের সম্মিলিত অবদান প্রায় $১০০,০০০ – $৩০০,০০০ ডলার।
এই ফেস্টিভ্যাল সরাসরি ও পরোক্ষভাবে তৈরি করে প্রায় ১,২০০+ অস্থায়ী চাকরি। ইভেন্ট স্টাফ, ভেন্ডর হেল্পার, সিকিউরিটি গার্ড ও লজিস্টিক সাপোর্ট কর্মীরা সাময়িক হলেও স্থায়ী রোজগারের সুযোগ পান।
Gerrard India Bazaar-এর ব্যবসায়িক কার্যক্রম ফেস্টিভ্যাল-পূর্ব ও ফেস্টিভ্যাল-পরবর্তী সময়ে ২০-৩০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়। নতুন ভিজিটররা ফিরে যান নতুন গ্রাহক হিসেবে। এর ফলে এলাকাটি হয়ে উঠেছে পর্যটনের অন্যতম আকর্ষণ, যা টরন্টো শহরের সামগ্রিক পর্যটন প্রবৃদ্ধিতেও অবদান রাখছে।

এই ফেস্টিভ্যাল শুধুমাত্র অর্থনীতি নয়, একটি সামাজিক ঐক্যের মঞ্চ। এখানে পাঞ্জাবি, বাংলা, তামিল, উর্দু, গুজরাটি ও হিন্দি ভাষাভাষী মানুষ একত্রিত হন। “আর্টিস্ট স্পটলাইট” প্রোগ্রামের মাধ্যমে প্রতি বছর ৫০ জনের বেশি স্থানীয় শিল্পী প্রথমবার বড় মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পান। তরুণদের অংশগ্রহণও উল্লেখযোগ্য। কয়েক হাজার যুবক ও কিশোর কিশোরী স্বেচ্ছাসেবক, পারফর্মার ও অর্গানাইজার হিসেবে ফেষ্টিভ্যালে যুক্ত থাকে।
প্রতি বছর $২০ মিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থনৈতিক কার্যক্রমের লক্ষ্য নির্ধারণ করে আগামীতে জেরার্ড ষ্ট্রিটের দক্ষিণ এশিয়া ফ্যাষ্টিভেলকে আরও বিস্তৃত ও সুন্দর করার লক্ষ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। এর মধ্যে টরন্টো সিটি পরিকল্পনা করেছে “Tier 1 Cultural Event” হিসেবে উৎসবকে স্বীকৃতি এবং বার্ষিক বাজেট $৫০০,০০০ ডলার এ উন্নীত করা। এছাড়া অন্টারিও সরকারের “Explore Ontario” প্রোগ্রামে অতিরিক্ত $১৫০,০০০ ডলার বরাদ্দের পরিকল্পনা।
এই ফেস্টিভ্যাল এখন শুধু দক্ষিণ এশীয় অভিবাসীদের নস্টালজিয়া নয়—এটি হয়ে উঠেছে টরন্টোর অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও ভবিষ্যতের অংশ। প্রতি বছর এই উৎসব ঘিরে যে উত্তেজনা, প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণ দেখা যায়, তা প্রমাণ করে দক্ষিণ এশীয়রা শুধু এই শহরের কেবল অভিবাসী নয়, এই শহরের নির্মাতা—যাঁরা তাঁদের ভাষা, গান, পোশাক আর খাবার-দাবারকে তুলে ধরেছেন কানাডার অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক মানচিত্রে।

বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নের সাফল্য এবছর যেমন গোটা উৎসবকে নতুন এক সুরে বেঁধে দিয়েছে। আগামী বছর এ প্যাভিলিয়ন আরও বড় পরিসরে, আরও নান্দনিক আয়োজনে, আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম নিয়ে ফিরে আসবে—এমন প্রত্যাশা করাই যায়। একদিকে থাকবে বাউল গানের অনুরণন, অন্যদিকে শিশুকণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল; একদিকে ঐতিহ্যবাহী পিঠা, অন্যদিকে আধুনিক ডিজিটাল ইনস্টলেশন—সব মিলিয়ে এক নতুন মাত্রার বাংলাদেশ।









