সম্পাদকের পাতা

আলো-আঁধারের শহর টরন্টো

নজরুল মিন্টো

রাত যত গভীর হয়, টরন্টোর নিঃসঙ্গ অলিগলিতে তখন জেগে ওঠে এক অদ্ভুত জীবন—জীবন নয়, যেন জীবনের ছায়া। শহরের ঝকঝকে আলো আর উচ্চাভিলাষী মানুষের ভিড়ে তারা নেই কোথাও। নেই কোনো ঠিকানা, নেই কোনো নিরাপত্তা, নেই কোনো স্বপ্ন। তারা থাকে, নিঃশব্দে বেঁচে থাকে। কেউ ফুটপাতে, কেউ দোকানের ছাউনি তলায়, কেউবা পার্কের বেঞ্চে রাত পার করে। এদের বলে গৃহহীন। অর্থাৎ হোমলেস।

এই শহর টরন্টো—পৃথিবীর অন্যতম ধনী দেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নগরী। যাকে বলা হয় ‘দ্য সেফেস্ট মেট্রো সিটি ইন দ্য ওয়ার্ল্ড।’ এখানে সুউচ্চ অট্টালিকা, রাজকীয় মেট্রো লাইনের ছুটে চলা, বহুজাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর ফ্যাশনদার মানুষের ভিড়ে কেউ কখনো ভাবেই না—এই শহরে প্রতিরাতে প্রায় ৫ হাজার মানুষ গৃহহীন। এরা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান। ২০২৪ সালের সিটি অফ টরন্টো হাউজিং রিপোর্ট অনুযায়ী, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ধারণক্ষমতার চেয়ে প্রায় ৩০% বেশি মানুষ থাকে। অনেকেই ঠাঁই পান না।

গৃহহীনদের মধ্যে ৪০% মানসিক অসুস্থতায় ভোগেন, ৩৫% মাদকাসক্ত, ২৫% শারীরিকভাবে অক্ষম। প্রতি পাঁচজন গৃহহীনের মধ্যে একজন নারী। এবং গড়ে প্রতি মাসে তিনজন গৃহহীন মারা যান টরন্টোর রাস্তায়—শীত, অপুষ্টি কিংবা সহিংসতায়।

২০১৯ সালে টরন্টো স্ট্রীট নিডস অ্যাসেসমেন্ট অনুযায়ী, শহরের ১০% গৃহহীন হচ্ছে ইমিগ্র্যান্ট বা নতুন অভিবাসী, যাদের অনেকেই প্রথম বছরে চাকরি না পেয়ে রাস্তায় নেমে আসে।

একটি জরিপে দেখা গেছে, ১৮-২৪ বছর বয়সী গৃহহীনদের মধ্যে ২৫% হলেন LGBTQ+ যুবক-যুবতী, যারা পারিবারিক নির্যাতনের কারণে বাড়ি থেকে পালিয়েছে।

কিছুদিন আগে চার্চের পাশে একটি পরিবার কাঠের ঘর বানিয়ে বসবাস শুরু করলে পুলিশ তাদের উচ্ছেদ করে। ঘটনা পত্রিকায় এলেও প্রাদেশিক সরকার নিশ্চুপ। নেই কোনো তাৎক্ষণিক সহায়তা, নেই কোনো সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা।

হাউজিং ফার্স্ট নীতিমালার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা প্রায় অকার্যকর। ২০২৩-২৪ বাজেটে ওন্টারিও সরকার গৃহহীনদের জন্য যে বরাদ্দ রেখেছে, তা বিগত বছরের তুলনায় ১২% কম। অথচ টরন্টোর হাউজিং ও ভাড়াব্যবস্থা এখন সবচেয়ে সংকটময় পর্যায়ে। এক বেডরুম অ্যাপার্টমেন্টের গড় ভাড়া এখন $২,৬০০ ডলার।

টরন্টোতে প্রতি বছর সাবওয়েতে গড়ে ৩০-৩৫টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে। তবে সেগুলোর কোনো খবর বড় পত্রিকায় দেখা যায় না। মিডিয়ার এক ধরনের ‘সোশ্যাল কম্প্যাক্ট’ রয়েছে। প্রথম প্রথম বুঝতাম না। ভাবতাম কেনো এসব সংবাদ এরা প্রকাশ করে না। এখন বুঝি তারা কেনো প্রকাশ করে না। কানাডায় মিডিয়ার এক নীরব নীতিমালা রয়েছে—অপরাধ সংক্রান্ত অনেক বিষয় তারা প্রচার করে না। আত্মহত্যা, এসিড হামলা, কিংবা চরম সহিংসতার ঘটনা একপ্রকার চেপে যায়। এর পেছনে রয়েছে একটি সামাজিক দায়বদ্ধতা—মানসিকভাবে দুর্বল মানুষরা যেন এই খবর দেখে অনুপ্রাণিত না হয়, সে জন্যই।

আমার নিজের অভিজ্ঞতা বলি। ১৯৯৭ সালে ফারুক নামে এক তরুণ আত্মহত্যা করলো সাবওয়েতে। আমি খবরটি ছাপালাম। কয়েকদিন পরে বিভাস নামে আরেকজন একইভাবে আত্মহত্যা করলো। তার স্ত্রী হেলেন একদিন আমাকে বললেন—“পত্রিকায় ফারুকের খবরটা পড়ে বিভাস বলেছিল, একটা সহজ উপায় পাওয়া গেলো।” বুকটা কেঁপে উঠেছিল। মনে হয়েছিল, আমিও যেন মৃত্যুর দায়ে অংশীদার।

২০২৩ সালে টরন্টোতে রিপোর্টেড ভায়োলেন্ট ক্রাইমের সংখ্যা ছিলো প্রায় ৪৫,০০০। যার মধ্যে হত্যাকাণ্ড ছিলো ৮৬টি, ছিনতাই ১,৯০০-এর বেশি, যৌন হেনস্থা ৬,০০০ এবং অস্ত্র ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ প্রায় ২,৫০০।

বিশ্বাস করুন আর নাই করুন, এই শহরে প্রতিদিন গড়ে একটির বেশি ব্যাংক ডাকাতির ঘটনা ঘটে। অথচ কোনো সংবাদমাধ্যমে সেসব খবর দেখা যায় না। কেনো দেখা যায় না? কারণ মানুষ যদি জানতে পারে যে ব্যাংকে যাওয়াটাই এখন এক ধরনের ঝুঁকি, তবে তারা ব্যাংকে যাবে না।

আর ব্যাংকে মানুষ না গেলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবাহ থমকে যাবে। উন্নত দেশের মানুষের চিন্তা কত উন্নত, আর মিডিয়ার নীরবতা কত কৌশলী—সহজেই অনুমেয়!

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, টরন্টোর এই ডাকাতিগুলো পরিচালনা করে মূলত তিনটি গ্যাং—অ্যাস্ট্রো, ভ্যান ও কারজ্যাক। তারা নিজেদের মধ্যে শহরের ভূগোল ভাগ করে নিয়েছে, যেন আধুনিক অপরাধচক্রের ‘জোনাল অপারেশন।’

অ্যাস্ট্রো গ্যাং সক্রিয় স্কারবোরো এলাকায়। তারা সাধারণত ‘অ্যাস্ট্রো ভ্যান’ ব্যবহার করে পালায়, সেখান থেকেই তাদের নাম—অ্যাস্ট্রো।

ভ্যান গ্যাং টরন্টোর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে কাজ করে। ডাকাতির সময় ব্যাংকের সামনে একটি নির্দিষ্ট ভ্যান দাঁড় করিয়ে রাখে, তাই তাদের নাম ভ্যান গ্যাং।

আর কারজ্যাক গ্যাং শহরের মূল কেন্দ্রে ঘোরাফেরা করে। তারা চমৎকারভাবে ডাকাতি শেষে প্রথম যে গাড়ি পায়, সেটি হাইজ্যাক করে পালায়। ‘কার হাইজ্যাক’ থেকে সংক্ষিপ্ত করে হয়েছে ‘কারজ্যাক।’

এই গ্যাংগুলো কোনো ছেলেখেলা করে না। তাদের পরিকল্পনা নিখুঁত, অস্ত্র আধুনিক। মুখোশ পরে, শর্টগান হাতে, নিমিষেই ব্যাংকে ঢুকে পড়ে এবং পুরো জায়গাটা নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। নিরাপত্তারক্ষীদের নিষ্ক্রিয় করে দিয়ে তারা কাজ সেরে পালিয়ে যায়।

পুলিশ বলছে, তারা মারধর খুব একটা করে না, কিন্তু কেউ বলতে পারে না ভবিষ্যতে গুলি ছোঁড়া শুরু করবে না। সত্যিই, এক আধুনিক শহরের এক আদিম উদ্বেগ।

সম্প্রতি টিডি ব্যাংক এবং সিআইবিসির একটি শাখায় ডাকাতরা এসে প্রচুর অর্থ লুটপাট করে নিয়ে যায়। তদন্ত চলছে, কিন্তু এখনো কাউকে ধরা যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে ঘোষণা হয়েছে—তথ্যদাতাকে $১০,০০০ ডলার পুরস্কার।

টরন্টোর আরও একটি অন্ধকার জগত হলো ড্রাগ সিন্ডিকেট। প্রতি বছর অন্তত ১০০ কোটি ডলার মূল্যের ড্রাগ এই শহরে প্রবেশ করে। স্কুলপড়ুয়া অনেক কিশোরও এখন গ্যাংয়ের হয়ে কাজ করে। স্কুল শেষে তারা মাদক বহন করে, টাকা তুলে দেয় সিন্ডিকেটের হাতে।

টরন্টো ডিস্ট্রিক্ট স্কুল বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, শহরের ১০% পাবলিক স্কুল ছাত্র গ্যাং বা গ্যাং-সম্পর্কিত অপরাধে জড়িত।

কিছুদিন আগে মধ্য রাতে, শেরবোর্ন স্ট্রিটের সাইডওয়াক ধরে হাঁটছিলাম। হঠাৎ দেখি, কুয়াশার মধ্যে এক বৃদ্ধা কাঁথা মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। গায়ে উলের চাদর, পাশে একটা খালি চা কাপ, চোখে নির্লিপ্ত চাহনি। আমি তাকে একটি হট ডগ কিনে দিলাম।

ভুপেন হাজারিকার বিখ্যাত একটি গানের লাইন—আমি দেখেছি অনেক গগনচুম্বী অট্টালিকার সারি, তার ছায়াতেই দেখেছি অনেক গৃহহীন নরনারী…।

এই শহর আলো ঝলমলে, কিন্তু তার অনেক কিছুই কেবল রঙিন পোস্টকার্ডের ছবি। বাস্তবতা হচ্ছে, এখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ঘুমায় না—তারা শুধু চোখ বন্ধ রাখে, লড়াই করে।

একটা বিষয় আমার কাছে এখন স্পষ্ট—গৃহহীনরা অপরাধী নয়, তারা অবহেলিত। আর অপরাধীরা গৃহহীন নয়, তারা প্রভাবশালী আর সুশৃঙ্খল।


Back to top button
🌐 Read in Your Language