ব্রিটেনে কিশোর সেজে কিশোরীদের ফাঁদে ফেলা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত শিক্ষক শাহরিয়ারের ২৫ বছরের কারাদণ্ড
নজরুল মিন্টো

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক সৈয়দ শাহরিয়ার আহমেদ। বয়স ৩৮ বছর। পূর্ব লন্ডনের ইলফোর্ডের বার্কিংসাইড এলাকার বাসিন্দা। পেশায় গণিতশিক্ষক। নিজের ছবি বদলে বয়স কম দেখিয়ে অনলাইনে কিশোর সাজতেন তিনি। সেই পরিচয়ে কিশোরীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিশ্বাস অর্জন করতেন। তারপর দেখা করার ব্যবস্থা করে ধর্ষণ ও যৌন নির্যাতন করতেন। অবশেষে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর একে একে বেরিয়ে আসে তাঁর অপরাধের বিবরণ। দুই দফার বিচারে ১৮ কিশোরীর ওপর নির্যাতনসহ মোট ৫৬টি যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন তিনি। বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর লন্ডনের সাউথওয়ার্ক ক্রাউন কোর্ট তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন। এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম দফার বিচারে তাঁর ১৫ বছরের কারাদণ্ড হয়। দুই মামলায় তাঁর কারাবাসের মোট মেয়াদ দাঁড়িয়েছে ২৫ বছর।
ঘটনাটি প্রথম পুলিশের নজরে আসে ২০২৩ সালের মে মাসে। দুই কিশোরী আলাদাভাবে আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানিয়েছিল। তাদের একজনের বয়স ছিল ১৪ বছর। আহমেদের আচরণে আতঙ্কিত হয়ে তাঁর চলন্ত গাড়ি থেকে লাফ দিয়েছিল মেয়েটি। এই দুই অভিযোগের সূত্র ধরে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জব্দ করা হয় তাঁর দুটি মোবাইল ফোন।
ফোন দুটি পরীক্ষা করতে গিয়ে তদন্তকারীরা পান বিপুলসংখ্যক বার্তা, ছবি ও ভিডিও। মাসের পর মাস সেগুলো খতিয়ে দেখতে হয়। একেকটি কথোপকথন ধরে খোঁজ করতে গিয়ে সামনে আসতে থাকে আরও কিশোরীর ওপর নির্যাতনের তথ্য। অপরাধের সূত্র পাওয়া যায় ২০১৯ সাল পর্যন্ত।
আহমেদ তখন এসেক্সের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে গণিত পড়াতেন। ২০২৩ সালের মে মাসে গ্রেপ্তার হওয়ার পর চাকরি ছেড়ে দেন।
পুলিশের বিবরণ অনুযায়ী, তাঁর লক্ষ্য ছিল ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সী মেয়েরা। ভুয়া পরিচয়ে তাদের সঙ্গে আলাপ করতেন। ধীরে ধীরে আস্থা অর্জন করে যৌন কথোপকথনে জড়াতেন। কাউকে অনলাইনে তাঁর নির্দেশমতো যৌন কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত করতেন। কারও সঙ্গে দেখা করার আয়োজন করতেন। নিজের গাড়ি নিয়ে পৌঁছে যেতেন সেই সাক্ষাতে। এরপর ঘটাতেন ধর্ষণসহ গুরুতর যৌন অপরাধ। নির্যাতনের বহু ছবি ও ভিডিও নিজের কাছে রেখেছিলেন তিনি।
তদন্তে দেখা যায়, ভুক্তভোগীরা একই এলাকার বাসিন্দা নয়। বিভিন্ন কাউন্টিতে ছড়িয়ে আছে তাঁর অপরাধ। মামলার ব্যাপকতা ও জটিলতার কারণে তদন্তের দায়িত্ব নেয় লন্ডনের মেট্রোপলিটন পুলিশ। তাদের সঙ্গে কাজ করে কেমব্রিজশায়ার, টেমস ভ্যালি, হার্টফোর্ডশায়ার, এসেক্স ও কেন্টের পুলিশ।
প্রথম দফার বিচারে ২০২৫ সালে আহমেদ ১৪টি যৌন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন। শিশুদের যৌন নির্যাতনের ছবি–সংক্রান্ত আরও পাঁচটি অপরাধ আগেই স্বীকার করেছিলেন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে আদালত তাঁকে সাজা দেন। তবে সাজা হওয়ার পরও তাঁর ফোনে পাওয়া বার্তা, ছবি ও ভিডিও পরীক্ষা চালিয়ে যান তদন্তকারীরা।
শত শত গিগাবাইট তথ্যের ভেতর থেকে শনাক্ত করা হয় আরও ১২ কিশোরীকে। তাদের সঙ্গে আহমেদের যোগাযোগ ও তাদের ওপর নির্যাতনের প্রমাণের ভিত্তিতে দ্বিতীয় দফার মামলা এগোয়। সামনে আসে আরও ৩৭টি যৌন অপরাধের বিবরণ।
দ্বিতীয় দফার বিচারে গত ১০ জুলাই আরও ৩৭টি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন আহমেদ। এর মধ্যে ধর্ষণের সাতটি এবং যৌন নিপীড়নের ছয়টি অপরাধ রয়েছে। আরও রয়েছে কিশোরীদের সঙ্গে যৌন কথোপকথন, যৌন নির্যাতনের উদ্দেশ্যে বিশ্বাস অর্জন করে দেখা করা, যৌন কর্মকাণ্ডে প্ররোচনা, নির্যাতনের ছবি তোলা এবং ব্ল্যাকমেইল।
৫ নভেম্বর দ্বিতীয় মামলার সাজা ঘোষণা করেন আদালত। দুই মামলায় মোট ২৫ বছরের কারাবাসের পাশাপাশি মুক্তির পর তাঁকে আট বছর শর্তসাপেক্ষ তদারকিতে থাকতে হবে।
ক্রাউন প্রসিকিউশন সার্ভিসের বিশেষ কৌঁসুলি ক্লেয়ার ব্রিনটন বলেছেন, শিশুদের সুরক্ষার বিষয়ে প্রশিক্ষণ পাওয়া একজন শিক্ষকই এসব অপরাধ করেছেন, যা ঘটনাটিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। ভুক্তভোগীদের সাহসিকতা আহমেদকে বিচারের মুখোমুখি করতে বড় ভূমিকা রেখেছে।
তথ্যসূত্র: Metropolitan Police, London; Crown Prosecution Service







