সম্পাদকের পাতা

মধ্যবর্তী নির্বাচনে বদলে যাচ্ছে ওয়াশিংটনের ক্ষমতার হিসাব

নজরুল মিন্টো

ব্যালটে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নাম ছিল না। তবু ভোটের রাতে সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ধাক্কাটি এসে লাগল তাঁর দরজাতেই। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত একের পর এক রাজ্যে ভেঙে পড়ল দলের প্রতিরোধ। সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়ে ডেমোক্র্যাটরা ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিয়েছে। হোয়াইট হাউসে ফেরার দুই বছরের মধ্যেই ট্রাম্পকে এমন এক রাজনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যেখানে তাঁর সিদ্ধান্ত ঠেকাতে কংগ্রেসে সংগঠিত বিরোধিতার পথ খুলে গেছে।

৩ নভেম্বরের নির্বাচনে কংগ্রেসের উভয় কক্ষে ডেমোক্র্যাটদের জয় নিশ্চিত করেছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস। নতুন কংগ্রেস দায়িত্ব নেবে ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি। সেদিন থেকেই আইনসভায় রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটবে এবং ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরে প্রশাসনের ওপর নজরদারির নেতৃত্ব পাবে বিরোধীরা।

এই নির্বাচনের তাৎপর্য সবচেয়ে ভালো বোঝা যায় ডেমোক্র্যাটদের জয়ের মানচিত্রে। টেক্সাসে কেন প্যাক্সটনকে হারিয়েছেন জেমস ট্যালারিকো। কানসাসে রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন অ্যাডাম হ্যামিল্টন। ওহাইওতে জন হাস্টেডকে হারিয়ে সিনেটে ফিরছেন শেরড ব্রাউন। সাউথ ক্যারোলাইনাতেও জয় পেয়েছেন অ্যানি অ্যান্ড্রুজ। দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান দুর্গে এসব পরাজয় দলটির জন্য এক বড় রাজনৈতিক বিপর্যয়।

মেইনে সুসান কলিন্সকে হারিয়েছেন ডেমোক্র্যাট ট্রয় জ্যাকসন। আইওয়ায় অ্যাশলি হিনসনকে পরাজিত করেছেন জশ টুরেক। নর্থ ক্যারোলাইনায় জয়ী হয়েছেন রয় কুপার। এই তিন রাজ্যের সঙ্গে টেক্সাস, কানসাস, ওহাইও ও সাউথ ক্যারোলাইনা মিলিয়ে রিপাবলিকানদের দখলে থাকা সাতটি সিনেট আসন ডেমোক্র্যাটদের হাতে গেছে। সিনেটের নিয়ন্ত্রণ বদলানোর পাশাপাশি এসব জয় রিপাবলিকানদের নির্বাচনী শক্তির ভিতেও বড় আঘাত হেনেছে।

মিশিগানেও গুরুত্বপূর্ণ জয় পেয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। রিপাবলিকান মাইক রজার্সকে হারিয়ে সিনেটে নির্বাচিত হয়েছেন আবদুল এল সায়েদ। মিসরীয় অভিবাসী পরিবারের সন্তান ও সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা এল সায়েদ দায়িত্ব গ্রহণের পর হবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এই রাজ্যে তাঁর জয় ডেমোক্র্যাটদের প্রগতিশীল শিবিরের অবস্থান আরও শক্ত করেছে।

তরুণ ও হিস্পানিক ভোটারদের মধ্যেও রিপাবলিকানদের সমর্থনে ক্ষয় দেখা গেছে। এপির জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ট্রাম্প যে সমর্থন পেয়েছিলেন, এবার প্রতিনিধি পরিষদের রিপাবলিকান প্রার্থীরা এসব গোষ্ঠীর কাছ থেকে তার তুলনায় কম সমর্থন পেয়েছেন। আগের নির্বাচনের বিজয়ী জোট ধরে রাখতে না পারার এই চিত্র দলটির ভবিষ্যৎ নির্বাচনী কৌশল নিয়েও চাপ বাড়াবে।

ফলাফলের রাজনৈতিক তাৎপর্য হলো, ট্রাম্পের প্রভাব ও ব্যক্তিগত সমর্থনও বহু রিপাবলিকান প্রার্থীকে পরাজয়ের হাত থেকে রক্ষা করতে পারেনি। তাঁর নেতৃত্বের বিরুদ্ধে জমে ওঠা ক্ষোভ আঘাত হেনেছে দলের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটিতেও। ফলে এই পরাজয় রিপাবলিকান পার্টিতে ট্রাম্পের নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক কৌশলের কার্যকারিতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।

সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা ট্রাম্পের ক্ষমতা প্রয়োগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। সিনেটের অনুমোদন প্রয়োজন এমন বিচারপতি ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে তাঁর মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়োগ আটকে দিতে পারবে দলটি। কমিটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর নজরদারি চালানোর সুযোগও পাবে ডেমোক্র্যাটরা। ফলে নিয়োগ ও প্রশাসনিক জবাবদিহির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে বিরোধীদের প্রতিরোধ মোকাবিলা করেই এগোতে হবে ট্রাম্পকে।

প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে তুলে দেবে তদন্ত, নথি তলব এবং কর্মকর্তাদের সাক্ষ্য নেওয়ার শক্তিশালী ক্ষমতা। এনবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলটির নেতৃত্ব ট্রাম্প প্রশাসন ও তাঁর পরিবারের ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্তের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এতে প্রশাসনের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত ব্যবসায়িক স্বার্থও কংগ্রেসের অনুসন্ধানের মুখে পড়তে পারে।

প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার পদে উঠে আসছেন ডেমোক্র্যাট নেতা হাকিম জেফ্রিস। নির্বাচিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে ওই পদে বসবেন তিনি। তাঁর নেতৃত্বে পরিষদের কমিটি ও আলোচ্যসূচির নিয়ন্ত্রণ পাবে ডেমোক্র্যাটরা। ট্রাম্পের নীতির বিরুদ্ধে দলটির প্রতিরোধ তখন আইনসভার কার্যক্রমে সরাসরি প্রতিফলিত হবে।

ক্ষমতার এই পরিবর্তন বাজেট ও সরকারি অর্থায়ন নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে ডেমোক্র্যাটদের সংঘাত তীব্র করতে পারে। প্রশাসনের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পের অর্থ বরাদ্দ নিয়ে শর্ত আরোপ ও দরকষাকষির সুযোগ পাবে দলটি। অন্যদিকে ট্রাম্পও ভেটো ও নির্বাহী ক্ষমতা ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নিতে চাইবেন। ফলে আইন প্রণয়ন, অর্থায়ন এবং প্রশাসনিক কর্তৃত্ব ঘিরে হোয়াইট হাউস ও কংগ্রেসের মধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।

মধ্যবর্তী নির্বাচনের এই রায় ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে তাঁর কর্তৃত্বের ওপর বড় আঘাত। যে কংগ্রেসে এত দিন রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রণ তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি এগিয়ে নেওয়ার পথ সহজ করেছিল, সেখানেই এখন গড়ে উঠছে বিরোধীদের প্রতিরোধের কেন্দ্র। মেয়াদের বাকি দুই বছরে ট্রাম্পের প্রতিটি বড় উদ্যোগকে মোকাবিলা করতে হবে সেই বদলে যাওয়া ক্ষমতার বাস্তবতা।

তথ্যসূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি), এনবিসি নিউজ, রয়টার্স

Back to top button
🌐 Read in Your Language