
একসময় কানাডার মানুষের কাছে ডাকপিয়নের আগমন ছিল প্রতিদিনের জীবনের পরিচিত দৃশ্য। হাতে চিঠির ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দরজায় এসে দাঁড়াতেন নীল-সাদা পোশাক পরা ডাককর্মী। কখনো দূরদেশে থাকা স্বজনের চিঠি, কখনো চাকরির নিয়োগপত্র, আবার কখনো সরকারি গুরুত্বপূর্ণ নথি পৌঁছে দিতেন তিনি। ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের যুগ আসার বহু আগে মানুষের ব্যক্তিগত যোগাযোগ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন ছিল এই ডাকব্যবস্থা। কানাডার বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে বিচ্ছিন্ন জনপদগুলোকে যোগাযোগের বন্ধনে যুক্ত করার পেছনেও রয়েছে ডাক বিভাগের দীর্ঘ ইতিহাস।
কানাডার ডাকব্যবস্থার ইতিহাস দেশটির জন্মেরও আগের। ১৭৬৩ সালে কুইবেক ও মন্ট্রিয়লের মধ্যে নিয়মিত ডাক যোগাযোগ চালু হয়। ১৮৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কানাডার নিজস্ব ডাক বিভাগ। এর ১৬ বছর পর, ১৮৬৭ সালে কানাডা কনফেডারেশন গঠিত হলে ডাক বিভাগ নতুন ফেডারেল সরকারের অন্যতম প্রথম বিভাগ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯১৮ সালে মন্ট্রিয়ল থেকে টরন্টো পর্যন্ত প্রথম সরকারি বিমান ডাক পরিবহন চালু হয়। এরপর প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ডাকব্যবস্থাও বদলেছে। ১৯৮১ সালে কানাডা পোস্ট রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন স্বতন্ত্র করপোরেশনে রূপান্তরিত হয়।
একসময় ‘দেশে বিদেশে’ পত্রিকা কানাডার বিভিন্ন শহরে গ্রাহকদের কাছে ডাকযোগে পৌঁছে দেওয়া হতো। কানাডা পোস্টের বিশেষ কর্মসূচি ‘পাবলিকেশনস মেইল’ (Publications Mail)-এর আওতায় পত্রিকাটি ডাক মাশুলে বিশেষ ছাড় পেত। প্রতিটি কপিতে আলাদা ডাকটিকিট লাগানোর প্রয়োজন হতো না। পত্রিকার সম্পাদকীয় বক্সের নিচে ছাপা থাকত কানাডা পোস্টের অনুমোদিত একটি বিশেষ নম্বর। সে সময় কোনো সংবাদপত্রের সম্পাদকীয় বক্সে এই অনুমোদিত নম্বর থাকা ছিল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিশেষ মর্যাদার বিষয়। এটি ছিল ডাক বিভাগের সঙ্গে একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির পরিচায়ক। ইন্টারনেট ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের আগে কানাডার বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষী পাঠকদের কাছে নিয়মিত ‘দেশে বিদেশে’ পৌঁছে দিতে কানাডা পোস্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
কানাডা পোস্টের আরেকটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো, দেশটির সব ডাকঘর নিজস্ব ভবন বা কার্যালয়ে পরিচালিত হয় না। বিভিন্ন শহরে ফার্মেসি, শপিং সেন্টার এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন দোকানের ভেতরেও কানাডা পোস্টের অনুমোদিত ডাকঘর রয়েছে। বিশেষ করে শপার্স ড্রাগ মার্টের অনেক শাখায় ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনার পাশাপাশি চিঠি পাঠানো, পার্সেল জমা দেওয়া কিংবা ডাকটিকিট কেনার সুবিধা পাওয়া যায়। এসব ডাকঘরের অনেকগুলোই অনুমোদিত বেসরকারি ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। কানাডা পোস্টের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে প্রায় ৫ হাজার ৮০০টি ডাকঘরের মধ্যে ২ হাজার ২০০টির বেশি এ ধরনের বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত।
ডাকঘরের অবস্থান নিয়েও রয়েছে কিছু চমকপ্রদ তথ্য। শহরাঞ্চলে যেমন ফার্মেসির ভেতরে ডাকঘর চলে, তেমনি প্রত্যন্ত অঞ্চলে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রশাসনিক কার্যালয় কিংবা গ্রামীণ ডাককর্মীর নিজস্ব বাড়িতেও ডাকসেবা পরিচালিত হয়। কানাডার বিশাল ভূখণ্ডে এমন অনেক জনপদ রয়েছে, যেখানে জনসংখ্যা কম কিন্তু ডাকসেবা চালু আছে। কানাডা পোস্টের হিসাবে, দেশটির অর্ধেকের বেশি ডাকঘর গ্রামীণ এলাকায় অবস্থিত। প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষের বাড়ি থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে একটি ডাকঘর রয়েছে।
কানাডার ডাকব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের জন্য আরও কিছু ব্যতিক্রমী সুবিধা রয়েছে। দেশটির কোনো নাগরিক ফেডারেল সংসদ সদস্য কিংবা সিনেটরের কাছে চিঠি পাঠাতে চাইলে ডাকটিকিট লাগানোর প্রয়োজন হয় না। গভর্নর জেনারেল, পার্লামেন্টের স্পিকার এবং নির্দিষ্ট কয়েকজন সংসদীয় কর্মকর্তার ক্ষেত্রেও একই সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের জন্য ব্রেইল বই, অডিও বইসহ নির্দিষ্ট পাঠসামগ্রী বিনা ডাকমাশুলে পাঠানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।
কানাডা পোস্টের ইতিহাসে শিশুদের জন্য একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগও রয়েছে। প্রতি বছর বড়দিনের আগে কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিশু সান্তা ক্লজের কাছে চিঠি পাঠায়। সেই চিঠির জন্য কানাডা পোস্ট নির্ধারণ করেছে বিশেষ ঠিকানা। সেখানে প্রাপকের নাম সান্তা ক্লজ, ঠিকানা নর্থ পোল এবং পোস্টাল কোড H0H 0H0। ইংরেজিতে সান্তা ক্লজের পরিচিত হাসি ‘হো হো হো’-এর অনুকরণেই এই কোড। ১৯৮১ সালে চালু হওয়া জাতীয় কর্মসূচির মাধ্যমে ডাক বিভাগের কর্মী ও স্বেচ্ছাসেবীরা শিশুদের চিঠির উত্তর দেওয়ার ঐতিহ্য গড়ে তুলেছেন। কানাডার ভেতর থেকে সান্তার কাছে চিঠি পাঠাতে ডাকটিকিটেরও প্রয়োজন হয় না।
এমন দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও কানাডা পোস্ট এখন বড় ধরনের পরিবর্তনের মুখে। কানাডার বৃহত্তম নগরী টরন্টোতে বাড়ি বাড়ি চিঠি পৌঁছে দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করে দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। এর পরিবর্তে চালু হচ্ছে কমিউনিটি মেইলবক্স। অর্থাৎ ডাকপিয়ন আর প্রত্যেক বাড়ির দরজায় চিঠি পৌঁছে দেবেন না। বাসিন্দাদের নির্দিষ্ট স্থানে স্থাপিত যৌথ ডাকবাক্স থেকে নিজেদের চিঠিপত্র সংগ্রহ করতে হবে। বৃহত্তর টরন্টোর বিভিন্ন এলাকায় এই পরিবর্তন বাস্তবায়নের সময়সূচিও প্রকাশ করা হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, কিছু এলাকায় চলতি নভেম্বরেই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হবে। অন্যদিকে টরন্টোর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বাড়ি বাড়ি ডাক বিলি বন্ধ হতে ২০৩১ সাল পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
টরন্টো স্টারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রথম পর্যায়ে উত্তর-পশ্চিম ইটোবিকোকের প্রায় ১৮ হাজার ঠিকানা নতুন ব্যবস্থার আওতায় আসছে। এসব বাড়িতে সরাসরি ডাক সরবরাহ বন্ধের পরিকল্পনা গত মার্চেই ঘোষণা করা হয়েছিল। এরপর ২০২৭ সালে পিকারিং, এজাক্স, মিসিসাগা ও ব্রাম্পটনের কয়েকটি এলাকায় পরিবর্তন কার্যকর হওয়ার কথা। টরন্টোর ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিবর্তনের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০৩১ সাল।
কানাডা পোস্টের এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকট। ইন্টারনেট ও ডিজিটাল যোগাযোগের প্রসারে প্রচলিত চিঠিপত্রের পরিমাণ ব্যাপকভাবে কমেছে। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫৫০ কোটি চিঠি সরবরাহ করলেও ২০২৫ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে প্রায় ২০০ কোটিতে। অথচ একই সময়ে ডাক সরবরাহের ঠিকানা বেড়েছে। ২০২৫ সালে কানাডা পোস্টের কর-পূর্ব লোকসান হয়েছে প্রায় ১৫৭ কোটি কানাডীয় ডলার। প্রতিষ্ঠানটির যুক্তি, ব্যয় কমিয়ে আর্থিকভাবে টিকে থাকতে হলে প্রচলিত ডাক সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।
তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে কানাডার দীর্ঘ শীতকালে বরফে ঢাকা রাস্তা পেরিয়ে কমিউনিটি মেইলবক্স থেকে চিঠি সংগ্রহ করা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। টরন্টোর মেয়র অলিভিয়া চাউ বাড়ি বাড়ি ডাক সরবরাহ বন্ধের বিরোধিতা করেছেন। কানাডা পোস্ট জানিয়েছে, শারীরিক সীমাবদ্ধতার কারণে যাঁরা কমিউনিটি মেইলবক্স ব্যবহার করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। প্রয়োজনে বাড়িতে সপ্তাহে এক দিন চিঠি পৌঁছে দেওয়া হতে পারে।
একদিকে বাড়ি বাড়ি চিঠি সরবরাহ বন্ধের উদ্যোগ, অন্যদিকে নতুন প্রতিযোগিতার বাজারে টিকে থাকতে সেবার সম্প্রসারণও করছে কানাডা পোস্ট। চলতি নভেম্বরের শেষ দিকে টরন্টোতে সপ্তাহান্তে পার্সেল সরবরাহ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। অটোয়া ও মন্ট্রিয়লেও এই সেবা সম্প্রসারিত হচ্ছে। অনলাইন কেনাকাটার প্রসার এবং দ্রুত পণ্য পৌঁছে দেওয়ার ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতেই এই সিদ্ধান্ত।
টরন্টোর বাসিন্দারা তাঁদের এলাকায় বাড়ি বাড়ি ডাক সরবরাহ কবে বন্ধ হতে পারে, তা কানাডা পোস্টের সরকারি ওয়েবসাইটে পোস্টাল কোড দিয়ে যাচাই করতে পারবেন। সেখানে পোস্টাল কোডের প্রথম তিনটি অক্ষর ও সংখ্যা লিখে সম্ভাব্য সময়সূচি জানা যাবে। তবে এই সময়সূচি পরিবর্তন হতে পারে এবং নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হওয়ার আগে বাসিন্দাদের চিঠি দিয়ে জানানো হবে।
তথ্যসূত্র: Toronto Star, Canada Post







