উত্তর আমেরিকা

ইরানে হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্রের, ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় সামরিক বাহিনী

সামরিক বাহিনী

ওয়াশিংটন, ০৪ নভেম্বর-ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন সামরিক বাহিনীর মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক ইউনিট সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বুধবারই হামলা চালানোর পরিকল্পনা তৈরি করে রেখেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুমোদন পাওয়া যায়নি। এরই মধ্যে ইরান ক্ষেপণাস্ত্রে রাসায়নিক অস্ত্র যুক্ত করার প্রযুক্তি উন্নত করছে বলে যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করেছে ইসরায়েল। যদিও ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের কর্মকর্তারা।

মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরদিনই ইরানে হামলার সম্ভাবনা নিয়ে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে নিউইয়র্ক টাইমস। সংবাদমাধ্যমটির তথ্য অনুযায়ী, সেন্টকমের হামলার পরিকল্পনা প্রস্তুত রয়েছে। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা ইরানে সামরিক হামলার পরিবর্তে হরমুজ প্রণালিতে মার্কিন অবরোধ অব্যাহত রাখার পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের ধারণা, অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করা সম্ভব। অন্যদিকে, কয়েকজন কর্মকর্তার যুক্তি, দেশটির শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করতে সামরিক পদক্ষেপই বেশি কার্যকর হতে পারে।

এদিকে, ইসরায়েলি গোয়েন্দারা যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে, ইরান দ্রুত এমন প্রযুক্তি তৈরি করছে, যার মাধ্যমে ক্ষেপণাস্ত্রে রাসায়নিক অস্ত্র যুক্ত করা সম্ভব হবে। এমনকি অন্য দেশে রাসায়নিক অস্ত্র পাচার করে হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জনেরও চেষ্টা করছে তেহরান। গত দুই সপ্তাহে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির চেয়েও রাসায়নিক অস্ত্রের হুমকিকে বেশি জরুরি বলে তুলে ধরেছেন।

তবে এসব তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখলেও অন্যদের ধারণা, ইসরায়েল সরকার ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করতে ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান রাসায়নিক অস্ত্র তৈরি করছে কি না, তা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে বড় কোনো মতভেদ নেই। মূল বিতর্ক হচ্ছে, ইরানের নেতারা এসব অস্ত্র বাস্তবে ব্যবহার করবেন কি না, বিশেষ করে দেশটির ওপর নতুন করে হামলা না হলে।

ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোর কর্মকর্তাদের সঙ্গেও কিছু গোয়েন্দা তথ্য ভাগ করেছে। তবে কয়েকটি দেশ ইরানের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছে। তাদের ধারণা, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আরও তীব্র করতে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। এক আঞ্চলিক কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইসরায়েল উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের রাসায়নিক অস্ত্রের সক্ষমতা নিয়ে কিছু মূল্যায়ন জানিয়েছে, কিন্তু এর পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয়নি। এ কারণে কয়েকটি উপসাগরীয় সরকার এসব দাবিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।

ইসরায়েলের এই সতর্কবার্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু কর্মকর্তার মনে ২০০২ সালে ইরাকের গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ে দেওয়া ভুল গোয়েন্দা তথ্যের ঘটনাও ফিরে এসেছে। সে সময় ইরাকের কাছে এ ধরনের অস্ত্র রয়েছে বলে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলো জোরালোভাবে জানিয়েছিল। কিন্তু পরে দেখা যায়, দেশটি তাদের পারমাণবিক, রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র কর্মসূচি অনেকটাই বন্ধ বা স্থগিত করেছিল।

ইরানের রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়েও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। তাদের মতে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রে রাসায়নিক অস্ত্র যুক্ত করা তুলনামূলক সহজ হলেও এসব রাসায়নিক উপাদান কার্যকরভাবে ছড়িয়ে দেওয়া কঠিন। এ ছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে বোমা পাচার করাও সহজ নয়। এ ক্ষেত্রে ড্রোন ব্যবহারের সম্ভাবনার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

অন্যদিকে, ইসরায়েল রাসায়নিক হামলার আশঙ্কার কথা জানালেও দেশটির হোম ফ্রন্ট কমান্ডের চলমান সামরিক মহড়ায় এ ধরনের হামলা মোকাবিলার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, এ ধরনের হামলা থেকে সুরক্ষার বিষয়ে নির্দেশনা সেনা কর্মকর্তা বা সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়নি। এ বিষয়ে ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টাও চলছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে এমন একটি চুক্তির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেওয়া, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমাধানে পৌঁছানো এবং নতুন করে সামরিক সংঘাত এড়ানোর পথ তৈরি হতে পারে। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি বিমানবাহী রণতরি অবস্থান করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে ট্রাম্প এখনো বড় ধরনের সামরিক হামলার অনুমোদন দেননি।

ইরান রাসায়নিক অস্ত্র কর্মসূচি থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। তেহরানের দাবি, এ ধরনের অভিযোগ ইসরায়েলের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের অংশ। ২০০৩ সালে ইরান স্বীকার করেছিল, ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় তারা রাসায়নিক অস্ত্র তৈরির সক্ষমতা গড়ে তুলেছিল। তবে পরে সেই কর্মসূচি ভেঙে ফেলার দাবি করে দেশটি।

ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে আসা প্রতিটি হুমকি তারা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং তা মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে, নিউইয়র্ক টাইমসের প্রশ্নের জবাব দেয়নি হোয়াইট হাউস। তবে একজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যেকোনো সম্ভাব্য হুমকি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের রক্ষা করবেন ট্রাম্প।

এস এম/ ০৪ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language