কানাডা ও আমেরিকার প্রবীণদের কাছ থেকে ১০ লাখ ডলার হাতিয়ে নিয়ে জর্জিয়ার নারী দোষী সাব্যস্ত
নজরুল মিন্টো

কম্পিউটারের পর্দায় হঠাৎ ভেসে উঠল বিপদের বার্তা। ভয়ংকর ভাইরাস ঢুকে পড়েছে, যেকোনো মুহূর্তে হারিয়ে যেতে পারে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। নিচে দেওয়া টেলিফোন নম্বরে দ্রুত যোগাযোগ করলেই মিলবে সমাধান। প্রযুক্তি সম্পর্কে খুব বেশি ধারণা নেই, এমন একজন প্রবীণ মানুষের কাছে এই বার্তাই যথেষ্ট আতঙ্কের কারণ। উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি ফোন করলেন। অপর প্রান্ত থেকে ভরসা দিলেন এক কথিত প্রযুক্তিবিশেষজ্ঞ। সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়ে চাওয়া হলো টাকা। কিন্তু তিনি বুঝতেই পারলেন না, কম্পিউটারের ভাইরাস নয়, আসল বিপদ অপেক্ষা করছে তাঁর ব্যাংক হিসাবে। এভাবেই কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বহু প্রবীণ মানুষের কাছ থেকে প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলার হাতিয়ে নেয় একটি আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। শেষ পর্যন্ত সেই প্রতারণার জাল অনুসরণ করতে গিয়ে তদন্তকারীরা পৌঁছে যান যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের এক নারীর কাছে। আদালতের বিচারে বেরিয়ে আসে, প্রযুক্তিসেবার আড়ালে কীভাবে পরিচালিত হচ্ছিল এই বিপুল অর্থ আত্মসাতের কারবার।
কম্পিউটার মেরামত ও ভাইরাস প্রতিরোধী সফটওয়্যার বিক্রির নামে পরিচালিত এই প্রতারণার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ৪৮ বছর বয়সী এক নারীকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন আদালতের জুরি সদস্যরা। তাঁর নাম ফাতাউমাতা কেইতা (Fataoumata Keita)। তিনি জর্জিয়ার বুফোর্ড শহরের বাসিন্দা। তদন্ত ও বিচারকালে উঠে এসেছে, ২০২১ সাল থেকে পরিচালিত এই প্রতারণায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংগৃহীত অর্থের একটি অংশ পাঠানো হয়েছে কানাডা, চীন ও ভারতে অবস্থানরত সহযোগীদের কাছে।
গত ৩০ অক্টোবর গুইনেট কাউন্টি ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নির কার্যালয় জানায়, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং অর্থের লেনদেন পরিচালনার দায়ে কেইতাকে অঙ্গরাজ্যের র্যাকেটিয়ার ইনফ্লুয়েন্সড অ্যান্ড করাপ্ট অর্গানাইজেশনস, সংক্ষেপে রিকো (RICO) আইনে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। সংগঠিত অপরাধচক্রের ধারাবাহিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড মোকাবিলায় এই আইন প্রয়োগ করা হয়। তবে তাঁর কারাদণ্ড বা অন্য কোনো সাজা এখনো ঘোষণা করা হয়নি। আগামী ডিসেম্বরে সাজা নির্ধারণের কথা রয়েছে।
প্রতারণার কৌশল ছিল পরিকল্পিত। চক্রটির সদস্যরা এমনভাবে কম্পিউটারের পর্দায় সতর্কবার্তা প্রদর্শনের ব্যবস্থা করতেন, যাতে ব্যবহারকারীরা বিশ্বাস করেন তাঁদের যন্ত্রে ভাইরাস ঢুকেছে অথবা কম্পিউটার ঠিকমতো কাজ করছে না। বার্তার সঙ্গে দেওয়া থাকত যুক্তরাষ্ট্রের ১-৮০০ দিয়ে শুরু হওয়া একটি টোল-ফ্রি টেলিফোন নম্বর। সমস্যার সমাধানের জন্য ওই নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হতো।
আতঙ্কিত হয়ে কেউ ফোন করলে অপর প্রান্ত থেকে কথা বলতেন চক্রটির সদস্যরা। তাঁরা নিজেদের প্রযুক্তিসেবা প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকসেবা প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দিতেন। এরপর কম্পিউটারে গুরুতর সমস্যা রয়েছে বলে বোঝানোর চেষ্টা করতেন। সমস্যা দূর করতে নতুন সফটওয়্যার কেনা কিংবা বিশেষ প্রযুক্তিগত সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন বলে দাবি করতেন তাঁরা। অথচ এসব সেবার প্রকৃত কোনো প্রয়োজন ছিল না। কম্পিউটার সুরক্ষার নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করাই ছিল তাঁদের উদ্দেশ্য।
প্রতারণার পরবর্তী ধাপ ছিল অর্থ সংগ্রহ। যাঁরা কথিত সফটওয়্যার বা প্রযুক্তিসেবা কিনতে রাজি হতেন, তাঁদের চেক পাঠাতে বলা হতো জর্জিয়ার বুফোর্ড শহরের একটি ডাকঘরের নির্দিষ্ট পোস্ট অফিস বক্সে। অনেক ক্ষেত্রে একেকটি চেকের পরিমাণ ছিল দেড় হাজার মার্কিন ডলারের বেশি। এভাবে বিভিন্ন স্থানের মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হতো।
বিচারকালে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, কেইতা এই অর্থের লেনদেন পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন ব্যাংক হিসাবগুলোতে অর্থ জমা হতো। এরপর অর্থের একটি অংশ পাঠিয়ে দেওয়া হতো আন্তর্জাতিক চক্রটির অন্য সদস্যদের কাছে। তদন্তে কানাডা, চীন ও ভারতে অবস্থানরত সহযোগীদের কাছে অর্থ পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়। ফলে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রে থাকলেও সংগৃহীত অর্থের প্রবাহ ছড়িয়ে পড়েছিল আরও কয়েকটি দেশে।
আদালতে উপস্থাপিত ব্যাংক নথিতে দেখা যায়, কেইতার নিয়ন্ত্রণে থাকা হিসাবগুলোতে এক বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে একপর্যায়ে চার লাখ ৫০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি অর্থ জমা হয়েছিল। তদন্তকারীদের হিসাবে, পুরো প্রতারণা কার্যক্রমে সংগৃহীত অর্থের পরিমাণ প্রায় ১০ লাখ মার্কিন ডলারে পৌঁছায়। এই চক্রের কারণে কয়েক ডজন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন। শেষ পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে প্রতারণার কার্যক্রম বন্ধ হয়।
মামলাটির প্রাথমিক তদন্ত পরিচালনা করে গুইনেট কাউন্টি পুলিশের ইলেকট্রনিক অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইমস ইউনিট। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে সংঘটিত অপরাধ ও আর্থিক লেনদেনের তদন্তে নিয়োজিত এই ইউনিট প্রতারণার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করে। পরে মামলাটি আদালতে পরিচালনা করেন সহকারী ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি হান চুং ও জন ওয়াইটনাওয়ার। তদন্তকারী কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগীদের সহায়তাকারী প্রতিনিধিরাও বিচারপ্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখেন।
গুইনেট কাউন্টির ডিস্ট্রিক্ট অ্যাটর্নি প্যাটসি অস্টিন-গ্যাটসন বলেছেন, ভুয়া কম্পিউটার সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা অত্যন্ত নিন্দনীয়। বিশেষ করে প্রবীণ মানুষদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে প্রতারণার ঘটনা কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না। এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে আইনের সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করার কথাও জানান তিনি।
এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রতারণার আন্তর্জাতিক বিস্তার। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দাদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করা হলেও এর সঙ্গে আরও কয়েকটি দেশে অবস্থানরত ব্যক্তিদের যোগাযোগ পাওয়া গেছে। তবে কানাডা, চীন ও ভারতে থাকা সহযোগীদের পরিচয়, তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক কোনো মামলা হয়েছে কি না কিংবা তাঁরা গ্রেপ্তার হয়েছেন কি না, সে সম্পর্কে ৩০ অক্টোবরের সরকারি ঘোষণায় বিস্তারিত জানানো হয়নি। একইভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে কতজন কানাডার বাসিন্দা, সেই সংখ্যাও প্রকাশ করা হয়নি।
প্রযুক্তিনির্ভর এই প্রতারণার সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, অপরাধীরা সরাসরি টাকা দাবি করার পরিবর্তে প্রথমে একটি কৃত্রিম সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। এরপর সেই সমস্যার সমাধান দেওয়ার নামে নিজেদের বিশ্বাসযোগ্য করে তুলে অর্থ আদায় করত। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা অনেক সময় বুঝতেই পারতেন না, তাঁরা কোনো প্রকৃত প্রযুক্তিসেবা কিনছেন, নাকি প্রতারণার শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের সাধারণ পরামর্শ অনুযায়ী, কম্পিউটারের পর্দায় হঠাৎ ভাইরাসের সতর্কবার্তা দেখা গেলে সেখানে দেওয়া নম্বরে ফোন করা উচিত নয়। অপরিচিত কারও নির্দেশে সফটওয়্যার কেনা, কম্পিউটারের নিয়ন্ত্রণ অন্যের হাতে তুলে দেওয়া কিংবা চেক পাঠানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচয় স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। বিশেষত পরিবারের প্রবীণ সদস্যদের এ ধরনের প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে সচেতন করা জরুরি।
প্রযুক্তির ওপর মানুষের নির্ভরতা যত বাড়ছে, সেই প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে প্রতারণার সুযোগও তত বিস্তৃত হচ্ছে। তাই ডিজিটাল নিরাপত্তার পাশাপাশি প্রতারণার কৌশল সম্পর্কে সচেতনতাও এখন ব্যক্তিগত আর্থিক সুরক্ষার অপরিহার্য অংশ।
তথ্যসূত্র: Gwinnett County District Attorney’s Office; CBS News Atlanta







