
টরন্টোর মেয়র নির্বাচনের আগে জনমত জরিপগুলোতে কখনো এগিয়ে ছিলেন অলিভিয়া চাউ, কখনো তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে এসে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এমন অবস্থায় পৌঁছায় যে, কে জয়ী হবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ২৬ অক্টোবর সোমবার ভোটের ফল প্রকাশের পর দেখা গেল ভিন্ন চিত্র। চাউ শুধু পুনর্নির্বাচিতই হননি, ২০২৩ সালের উপনির্বাচনের তুলনায় শহরের প্রতিটি ওয়ার্ডে নিজের সমর্থন বাড়িয়েছেন। এমনকি যেসব এলাকায় রক্ষণশীল রাজনীতিকদের প্রভাব রয়েছে কিংবা যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী দীর্ঘদিন কাউন্সিলর ছিলেন, সেখানেও অলিভিয়ার ভোটের হার বেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, বাড়ির কর, আবাসন সংকট, যানজট, অপরাধ ও সাইকেল লেন নিয়ে এত বিতর্কের পরও কীভাবে তিনি এত বড় ব্যবধানে জয়ী হলেন?
নির্বাচনের পর প্রকাশিত ভোটের তথ্য এবং বিভিন্ন জনমত জরিপ বিশ্লেষণ করলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ সামনে আসে। এর মধ্যে রয়েছে শহরজুড়ে সমর্থনের বিস্তার, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ভোটারদের প্রত্যাশা, নগর পরিষেবা রক্ষার প্রতিশ্রুতি, প্রতিদ্বন্দ্বীর কিছু প্রস্তাব নিয়ে উদ্বেগ এবং নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে ভোটারদের অবস্থান পরিবর্তন।
টরন্টো সিটির প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, অলিভিয়া চাউ পেয়েছেন ৫ লাখ ৩২ হাজার ২০১ ভোট, যা মোট বৈধ ভোটের প্রায় ৫৪ দশমিক ১৬ শতাংশ। অন্যদিকে ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ড পেয়েছেন ৪ লাখ ৪ হাজার ১৩ ভোট বা প্রায় ৪১ দশমিক ১ শতাংশ। তাঁদের ভোটের ব্যবধান প্রায় ১ লাখ ২৮ হাজার। ২০২৩ সালের উপনির্বাচনে চাউ পেয়েছিলেন ২ লাখ ৬৯ হাজার ৩৭২ ভোট, অর্থাৎ ৩৭ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে এবারের নির্বাচনে তাঁর ভোটসংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে এবং ভোটের হার বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ পয়েন্ট।
এবারের নির্বাচনে আরও দুটি রেকর্ড গড়েছেন অলিভিয়া চাউ। টরন্টোর ইতিহাসে মেয়র পদে কোনো প্রার্থী এর আগে এত ভোট পাননি। একই সঙ্গে তিনিই শহরটির প্রথম নারী মেয়র, যিনি দ্বিতীয়বার নির্বাচিত হলেন। ফলে এবারের জয় শুধু বড় ব্যবধানের কারণে নয়, টরন্টোর নির্বাচনী ইতিহাসেও বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে ২৮ অক্টোবর প্রকাশিত টরন্টো স্টারের একটি বিশ্লেষণে। সাংবাদিক মার্কো চাউন ওভেড এবং নাথান পিলার তৈরি ওয়ার্ডভিত্তিক প্রতিবেদনে দেখা যায়, টরন্টোর ২৫টি ওয়ার্ডের প্রতিটিতেই ২০২৩ সালের তুলনায় অলিভিয়ার ভোটের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। কোথাও বৃদ্ধি সামান্য, কোথাও উল্লেখযোগ্য। সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হয়েছে উত্তর-পশ্চিম ইটোবিকো এবং বিচেস-ইস্ট ইয়র্কে। এসব এলাকায় তাঁর ভোটের হার আগের নির্বাচনের তুলনায় ২০ শতাংশ পয়েন্টেরও বেশি বেড়েছে।
উত্তর-পশ্চিম ইটোবিকো ঐতিহ্যগতভাবে ফোর্ড পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের অংশ। অন্যদিকে বিচেস-ইস্ট ইয়র্ক ছিল ব্র্যাড ব্র্যাডফোর্ডের নিজের রাজনৈতিক ঘাঁটি। সেখানে তিনি দুই মেয়াদে সিটি কাউন্সিলর ছিলেন। ফলে এই দুই অঞ্চলে অলিভিয়ার সমর্থন বৃদ্ধি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এর অর্থ, তাঁর ভোট শুধু আগে থেকেই অনুগত সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। শহরের ভিন্ন রাজনৈতিক প্রবণতার ভোটারদের মধ্যেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে।
ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ডেনিস পিলন টরন্টো স্টারকে বলেছেন, শহরজুড়ে নানা বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে নিজের সমর্থকদের একত্র করতে পেরেছেন অলিভিয়া। তাঁর মতে, নির্বাচনের ফলাফলে এই রাজনৈতিক সমর্থন ধরে রাখার সক্ষমতার প্রতিফলন দেখা যায়।
অলিভিয়া চাউয়ের জয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে তাঁর অবস্থান। টরন্টোর বাসিন্দাদের কাছে বাড়িভাড়া, আবাসনের অপ্রতুলতা, গণপরিবহনের খরচ এবং দৈনন্দিন ব্যয় বড় উদ্বেগের বিষয়। নির্বাচনী প্রচারে অলিভিয়া সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণ, ভাড়াটিয়াদের সুরক্ষা, গণপরিবহন এবং স্কুলশিক্ষার্থীদের খাবারের কর্মসূচি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেন। অন্যদিকে ব্র্যাডফোর্ড বাড়ির কর স্থগিত রাখা, পুলিশের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নগর প্রশাসনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দেন। ফলে ভোটারদের সামনে দুটি পৃথক নীতিগত অগ্রাধিকার উঠে আসে।
অক্টোবরের জরিপে দেখা যায়, অলিভিয়ার সমর্থন বিশেষভাবে শক্তিশালী ছিল তরুণ ও তুলনামূলক কম আয়ের ভোটারদের মধ্যে। বিপরীতে ব্র্যাডফোর্ডের সমর্থন বেশি ছিল উচ্চ আয়ের পরিবার এবং নির্দিষ্ট বয়সের ভোটারদের মধ্যে। এই পার্থক্য থেকে বোঝা যায়, আবাসন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে অলিভিয়ার প্রচার তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভোটারগোষ্ঠীর প্রত্যাশার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
নির্বাচনে অলিভিয়ার পক্ষে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল নগর পরিষেবা রক্ষার প্রতিশ্রুতি। ব্র্যাডফোর্ড বাড়ির কর এক বছরের জন্য স্থগিত রাখার কথা বলেছিলেন। এর বিপরীতে অলিভিয়া যুক্তি দেন, কর থেকে আয় না বাড়িয়ে নগর পরিষেবার মান বজায় রাখা কঠিন হতে পারে। তিনি অতীতের পরিষেবা সংকোচনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে গণপরিবহন, গ্রন্থাগার ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন।
ব্র্যাডফোর্ডের একটি প্রস্তাব নির্বাচনের শেষ দিকে বিশেষ বিতর্ক তৈরি করে। তিনি টরন্টোর পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থাকে পৃথক পৌর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালনার প্রস্তাব দেন। তাঁর দাবি ছিল, এতে সাধারণ পরিবারের পানির বিল প্রায় ২৫ শতাংশ কমানো সম্ভব হবে। কিন্তু অলিভিয়া অভিযোগ করেন, এ ধরনের পরিবর্তনে পানি ব্যবস্থার ওপর নগর কর্তৃপক্ষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হতে পারে এবং ভবিষ্যতে বেসরকারীকরণের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ব্র্যাডফোর্ড অবশ্য অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ সরকারি মালিকানাধীন থাকবে এবং প্রচলিত আইনেও বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ নেই।
এই বিতর্কের রাজনৈতিক গুরুত্ব বোঝা যায় পোলারা স্ট্র্যাটেজিক ইনসাইটসের জরিপে। ২৩ অক্টোবর প্রকাশিত জরিপে ৬৩ শতাংশ উত্তরদাতা পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সম্ভাব্য বেসরকারীকরণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। অর্থাৎ বিষয়টি শুধু অলিভিয়ার সমর্থকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। নির্বাচনের শেষ পর্যায়ে পানি ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রচার ভোটারদের সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।
অলিভিয়ার পক্ষে আরও একটি রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের সঙ্গে তাঁর কাজের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে। রাজনৈতিক অবস্থানে দুজন ভিন্ন ধারার হলেও নগর ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পায়। গত ১৬ সেপ্টেম্বর ফোর্ড প্রকাশ্যে অলিভিয়ার প্রশংসা করেন এবং তাঁদের কাজের সম্পর্ককে অত্যন্ত ভালো বলে উল্লেখ করেন। যদিও তিনি সরাসরি আনুষ্ঠানিক সমর্থন ঘোষণা করেননি, তাঁর বক্তব্যে অলিভিয়ার প্রতি ইতিবাচক মনোভাব স্পষ্ট ছিল। যে ইটোবিকো অঞ্চলে ফোর্ড পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে, সেখানেও অলিভিয়ার সমর্থন বৃদ্ধি পেয়েছে।
অন্যদিকে ভোটের ফলাফল এটাও দেখিয়েছে যে, সব নীতিতে একমত না হয়েও ভোটাররা একজন মেয়রকে সমর্থন করতে পারেন। টরন্টো স্টারের ভোট কম্পাসের ২৯টি প্রশ্নের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আবাসন নির্মাণের পরিবর্তে সবুজ জায়গাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়ে অলিভিয়ার অবস্থানের সঙ্গে ৮২ শতাংশ অংশগ্রহণকারীর মত মিলেছে। কিন্তু নতুন আবাসন নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় সড়ক, পানি ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর ব্যয়ে আবাসন নির্মাতাদের আরও বেশি অংশ বহন করতে হবে না, এমন অবস্থানের সঙ্গে একমত হয়েছেন মাত্র ৯ শতাংশ।
গণপরিবহনের ভাড়া অপরিবর্তিত রাখা ও যাতায়াতের ব্যয় কমানোর প্রতিশ্রুতিও অলিভিয়ার নির্বাচনী প্রচারে গুরুত্ব পেয়েছে। তিনি টিটিসির ভাড়া টানা চতুর্থ বছরের মতো না বাড়ানোর পাশাপাশি সপ্তাহে ১০টি যাত্রার ভাড়া পরিশোধের পর বাকি যাত্রা বিনামূল্যে করার প্রতিশ্রুতি দেন। নিয়মিত বাস, স্ট্রিটকার ও সাবওয়ে ব্যবহারকারী কর্মজীবী মানুষের জন্য এই প্রস্তাবের সরাসরি আর্থিক গুরুত্ব রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উদ্বিগ্ন ভোটারদের কাছে এটি তাঁর প্রচারের একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল।
নির্বাচনী ফলাফলে বড় ভূমিকা রেখেছে ভোটার উপস্থিতিও। ২০২৩ সালের মেয়র উপনির্বাচনে ভোট দিয়েছিলেন ৭ লাখ ২৫ হাজার ৩৩৩ জন। এবার বৈধ ভোটের সংখ্যা প্রায় ৯ লাখ ৮৩ হাজার। ভোটার উপস্থিতির হার প্রায় ৪৫ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০১৪ সালের পর টরন্টোর পৌর নির্বাচনে সর্বোচ্চ। আগাম ভোটেও অংশ নিয়েছিলেন রেকর্ডসংখ্যক ২ লাখ ২২ হাজার ৫৫০ জন। ক্ষমতাসীন মেয়র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এমন নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতির এই বৃদ্ধি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তবে এই বিজয়ের সঙ্গে নতুন প্রত্যাশাও যুক্ত হয়েছে। ২০২৩ সালের উপনির্বাচনে মেয়র হওয়ার পর এবারই প্রথম পূর্ণ চার বছরের মেয়াদে দায়িত্ব পালন করতে যাচ্ছেন অলিভিয়া চাউ। সামনে রয়েছে আবাসন সংকট, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয়, যানজট, গণপরিবহন এবং নাগরিক নিরাপত্তার মতো বড় চ্যালেঞ্জ। নির্বাচনের আগে যেসব বিষয়ে ভোটারদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল, সেগুলোও শেষ হয়ে যায়নি। বরং আগামী চার বছরে তাঁর প্রশাসনের সিদ্ধান্তগুলো সেই মতবিরোধের মধ্যেই মূল্যায়িত হবে। টরন্টোর ভোটাররা তাঁকে নতুন করে দায়িত্ব দিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচনে পাওয়া বিস্তৃত সমর্থনকে তিনি নগর পরিচালনার বাস্তব অগ্রগতিতে কতটা রূপ দিতে পারেন।
তথ্যসূত্র: Toronto Star, TorontoToday, CityNews







