সম্পাদকের পাতা

যৌন নিপীড়নের অভিযোগে নিউইয়র্কে বাংলাদেশি চিকিৎসক গ্রেপ্তার

নজরুল মিন্টো

বাংলাদেশি চিকিৎসক

চিকিৎসকের কাছে রোগী যান নিজের অসুস্থতার কথা বলতে, পরীক্ষা করাতে এবং সুস্থ হওয়ার আশায়। এই সম্পর্কের ভিত্তি আস্থা। কিন্তু পরীক্ষাকক্ষে চিকিৎসকের স্পর্শই যখন যৌন নিপীড়নের অভিযোগ হয়ে আদালতে পৌঁছায়, তখন প্রশ্ন ওঠে সেই আস্থার নিরাপত্তা নিয়ে। নিউইয়র্কের কুইন্সে বাংলাদেশি চিকিৎসক ডা. ফজলুল ইউসুফের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগে সামনে এসেছে তেমনই দুটি ঘটনার বিবরণ। তাঁর দুই রোগীর একজন ১৫ বছরের কিশোরী, অন্যজন ২০ বছরের তরুণী।

৭২ বছর বয়সী এই শিশুরোগ বিশেষজ্ঞকে গত ২৭ অক্টোবর মঙ্গলবার সকালে গ্রেপ্তার করে নিউইয়র্ক পুলিশ বিভাগের বিশেষ ভিকটিমস স্কোয়াড। অভিযোগ, ফ্লাশিংয়ে নিজের বাড়িতে পরিচালিত চিকিৎসাকেন্দ্রে একই বিকেলে পৃথক দুটি ঘটনায় তিনি রোগীদের সম্মতি ছাড়াই তাঁদের শরীরের স্পর্শকাতর অংশে হাত দেন। ওই দিনই তাঁকে কুইন্সের ফৌজদারি আদালতে হাজির করা হয়। আদালতে ইউসুফ নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন।

আদালতে দাখিল করা অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার বিকেলে ফ্লাশিংয়ের ৫৭-০৭, ১৪৬ নম্বর স্ট্রিটের চিকিৎসাকেন্দ্রে ঘটনাগুলো ঘটে। প্রথম ঘটনায় ২০ বছর বয়সী এক নারী রোগীর পোশাকের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে তাঁর স্তনে হাত বুলিয়ে দেন বলে ইউসুফের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। এ সময় তরুণীকে সুন্দরী বলে নিজের ক্লিনিকে কাজ করার প্রস্তাব দেন তিনি।

একই দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ১৫ বছর বয়সী আরেক রোগীর উরু এবং পোশাকের ওপর দিয়ে স্তন চেপে ধরেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী, এই কিশোরীকেও সুন্দরী বলে নিজের ক্লিনিকে কাজ করার প্রস্তাব দেন তিনি। দুই রোগীর সঙ্গে পৃথক ঘটনায় একই ধরনের মন্তব্য করার বিষয়টিও অভিযোগপত্রে উঠে এসেছে।

ইউসুফের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক স্পর্শের দুটি, কিশোরীর মানসিক ক্ষতি হতে পারে এমন আচরণের একটি, তৃতীয় মাত্রার যৌন নিপীড়নের দুটি এবং দ্বিতীয় মাত্রার হয়রানির দুটি অভিযোগ আনা হয়েছে। শুনানি শেষে বিচারক ইন্দিরা খান নগদ ১০ হাজার মার্কিন ডলার অথবা নির্ধারিত শর্তে ৩০ হাজার ডলারের বন্ডের মাধ্যমে জামিনের শর্ত নির্ধারণ করেন। পাশাপাশি একটি অস্থায়ী সুরক্ষা আদেশও জারি করেন আদালত।

ডা. ইউসুফের পেশাগত পরিচয় অনুসন্ধান করলে বাংলাদেশের চিকিৎসাশিক্ষা ও উত্তর আমেরিকার বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সংগঠনের সঙ্গে তাঁর যোগসূত্র পাওয়া যায়। চিকিৎসকদের তথ্যভান্ডার ওয়েবএমডিতে তাঁর নাম রয়েছে ডা. ফজলুল এইচ ইউসুফ হিসেবে। ওই তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে পড়াশোনা করেছেন। শেয়ারকেয়ারে প্রকাশিত তাঁর পেশাগত পরিচিতিতে ঢাকা শিশু হাসপাতালে প্রশিক্ষণ নেওয়ার তথ্যও রয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন অব নর্থ আমেরিকা বা বিএমানার ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাবেক নির্বাহী কমিটির তালিকায় নিউইয়র্কের ডা. ফজলুল এইচ ইউসুফের নাম পাওয়া যায়। সংগঠনের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৫ মেয়াদে কোষাধ্যক্ষ এবং ২০১৯ থেকে ২০২১ মেয়াদে সম্পাদক ছিলেন। ফলে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বাংলাদেশি চিকিৎসকদের সাংগঠনিক কার্যক্রমেও তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্য রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি চিকিৎসকের বিরুদ্ধে নারী রোগীদের যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। নিউইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসে কর্মরত ডা. ফেরদৌস খন্দকারের বিরুদ্ধেও রোগীরা যৌন নির্যাতনের অভিযোগে দেওয়ানি মামলা করেছিলেন। ২০২১ সালে প্রকাশিত অনুসন্ধানী সংবাদে বলা হয়, পাঁচ নারী তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেন। অভিযোগের মধ্যে ছিল চিকিৎসার প্রয়োজন ছাড়াই স্তন পরীক্ষা এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীদের অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে স্পর্শ করা। এসব ছিল মামলায় উত্থাপিত অভিযোগ।

ফেরদৌস খন্দকারের বিরুদ্ধে পরে কঠোর ব্যবস্থা নেয় নিউইয়র্কের স্বাস্থ্য বিভাগ। সরকারি নথি অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৫ অক্টোবর কর্মদিবস শেষে নিউইয়র্কে তাঁর চিকিৎসা করার সুযোগ বন্ধ হয়ে যায়। নিউইয়র্কের লাইসেন্স ব্যবহার করে অন্য কোথাও চিকিৎসা করার পথও বন্ধ করা হয়। এর আগেই নতুন রোগী নেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছিল। নারী রোগীদের পরীক্ষা বা চিকিৎসার সময়ও কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত একজন পর্যবেক্ষককে উপস্থিত রাখা বাধ্যতামূলক ছিল।

এরও আগে বাংলাদেশি চিকিৎসক জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে রোগীকে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআইয়ের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৩ অক্টোবর পেনসিলভানিয়ার ফিলাডেলফিয়ার একটি বড় হাসপাতালে অস্ত্রোপচারের পর সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকা এক নারী রোগীকে যৌন নির্যাতনের অভিযোগে তাঁকে খোঁজা হচ্ছে। কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, ওষুধ দিয়ে রোগীকে আচ্ছন্ন করে তিনি ধর্ষণ করেন। অঙ্গরাজ্যে অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর ১৯৯৭ সালের জুলাইয়ে তাঁর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়। এফবিআইয়ের ওয়েবসাইটে তাঁর জন্মস্থান বাংলাদেশ এবং জাতীয়তা বাংলাদেশি হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।

পৃথক স্থানে সংঘটিত, পৃথক সময়ের এসব ঘটনায় রোগীর নিরাপত্তা, চিকিৎসকের পেশাগত সীমা এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগের বিষয়টি সামনে আসে। বিশেষ করে অপ্রাপ্তবয়স্ক রোগীর ক্ষেত্রে পরীক্ষাকক্ষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা চিকিৎসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কোনো চিকিৎসকের পরিচিতি, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা কিংবা সামাজিক অবস্থানের কারণে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ উপেক্ষা করা উচিত নয় বলে মনে করেন চিকিৎসা পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

ডা. ইউসুফের বিরুদ্ধে তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে নিউইয়র্ক পুলিশের বিশেষ ভিকটিমস স্কোয়াড। একই চিকিৎসকের কাছে অন্য কেউ নিপীড়নের শিকার হয়ে থাকলে তাঁকেও এগিয়ে এসে তথ্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে পুলিশ।

তথ্যসূত্র: ABC7NY, New York Post

Back to top button
🌐 Read in Your Language