সম্পাদকের পাতা

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তৃষিতা মাওলার সাফল্যের গল্প

নজরুল মিন্টো

তৃষিতা মাওলা

নিউইয়র্কে বেড়ে ওঠা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক তরুণী। পড়াশোনা শেষ করে বেছে নিয়েছেন কূটনীতির পেশা। এরপর কখনও সুইজারল্যান্ড, কখনও ক্রোয়েশিয়া, কখনও আলবেনিয়া। একের পর এক দেশে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করতে গিয়ে পরিচিত হয়েছেন ভিন্ন ভিন্ন সমাজ, সংস্কৃতি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার সঙ্গে। অর্জন করেছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে কাজ করার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। তাঁর নাম তৃষিতা মাওলা (Trishita Maula)। তিনি মার্কিন ফরেন সার্ভিসের একজন পেশাদার কূটনীতিক।

২০০৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরে যোগ দেন তৃষিতা। তাঁর কর্মজীবনের বিশেষায়িত ক্ষেত্র ব্যবস্থাপনা। কূটনীতির কথা উঠলে সাধারণত রাষ্ট্রদূত, আন্তর্জাতিক আলোচনা কিংবা দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্কের বিষয়গুলো সামনে আসে। কিন্তু একটি দূতাবাসের কার্যক্রম সচল রাখতে পর্দার আড়ালে চলে বিশাল প্রশাসনিক আয়োজন। জনবল, অর্থব্যবস্থা, নিরাপত্তা, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, অবকাঠামো এবং দৈনন্দিন কার্যক্রমের সমন্বয় করতে হয়। ফরেন সার্ভিসের ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তারা এসব গুরুত্বপূর্ণ কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন।

তৃষিতার কূটনৈতিক কর্মজীবনেও এই ব্যবস্থাপনা-দক্ষতা বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সুইজারল্যান্ড, উত্তর মেসিডোনিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও মন্টেনেগ্রোতে বিভিন্ন ব্যবস্থাপনা-সংক্রান্ত পদে কাজ করেছেন তিনি। আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় মার্কিন দূতাবাসের ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। একেকটি দেশে কাজ করতে গিয়ে তাঁকে ভিন্ন ভিন্ন প্রশাসনিক ব্যবস্থা, স্থানীয় আইন এবং কর্মপরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে হয়েছে। এসব অভিজ্ঞতা তাঁর পেশাগত জীবনের পরিধি বাড়িয়েছে।

তৃষিতার পারিবারিক শিকড় বাংলাদেশে হলেও তাঁর শিক্ষা ও পেশাজীবনের ভিত্তি গড়ে উঠেছে মার্কিন সমাজে। উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ভর্তি হন নিউইয়র্কের খ্যাতনামা বার্নার্ড কলেজে (Barnard College)। কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত এই নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তিনি অর্থনীতি ও গণিত বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে কূটনীতির পেশায় এসে তাঁর এই শিক্ষাগত যোগ্যতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা।

বাংলাদেশের সঙ্গে তৃষিতার পেশাগত সম্পর্ক তাঁর কূটনৈতিক কর্মজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। মার্কিন পররাষ্ট্রসেবায় যোগ দেওয়ার পর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসে কনস্যুলার দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। কনস্যুলার বিভাগের কাজের মধ্যে রয়েছে ভিসা, মার্কিন নাগরিকদের সহায়তা এবং বিভিন্ন নাগরিকসেবা। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন সরকারি সফরে নয়াদিল্লি গেলে তৃষিতা সাময়িকভাবে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স (Chargé d’Affaires) হিসেবে নেতৃত্ব দেন।

কূটনৈতিক পরিভাষায় এই পদটির অর্থ ভারপ্রাপ্ত মিশনপ্রধান। রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিতিতে দূতাবাসের কার্যক্রম পরিচালনা, গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব এবং স্বাগতিক দেশের সরকারের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখার দায়িত্ব পালন করতে হয়। বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমগুলো তাঁকে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের নেতৃত্ব দেওয়া প্রথম বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কূটনীতিক হিসেবে পরিচয় দিয়েছে।

ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসের সাময়িক নেতৃত্ব দেওয়ার সময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতামূলক কার্যক্রমে অংশ নেন তৃষিতা। পাশাপাশি বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়েও কাজ করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের কূটনৈতিক ব্যবস্থায় অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের অংশগ্রহণ নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন জাতিগত ও সাংস্কৃতিক পটভূমি থেকে উঠে আসা মানুষ দেশটির পররাষ্ট্রসেবায় কাজ করছেন। তাঁদের মধ্যে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কূটনীতিকেরাও রয়েছেন। তৃষিতা মাওলা সেই ধারার একজন প্রতিনিধি।

তৃষিতার পরিচয়ের গুরুত্ব কেবল বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় অর্জিত অভিজ্ঞতাই তাঁর পেশাগত পরিচয়ের মূল ভিত্তি। নিউইয়র্কের শিক্ষাঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক কূটনীতির অঙ্গনে তাঁর এই পথচলা নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণার একটি গল্প।

তথ্যসূত্র: U.S. Department of State; Daily Sun; The Asian Age

Back to top button
🌐 Read in Your Language