লন্ডনে কিশোরী ধর্ষণের তদন্তে দুই বাংলাদেশিকে ধরতে ১০ হাজার পাউন্ড পুরস্কারের ঘোষণা
নজরুল মিন্টো

পূর্ব লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস। প্রবাসী বাংলাদেশিদের কয়েক প্রজন্মের জীবন, জীবিকা আর শিকড়ের টান মিশে আছে এই জনপদে। ব্রিক লেনের রেস্তোরাঁ থেকে হোয়াইটচ্যাপেল স্টেশনের বাংলা নামফলক, নানা জায়গায় চোখে পড়ে সেই উপস্থিতি। বহু দেশের মানুষের বসবাসের মধ্যেও বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতি এখানে আলাদা পরিচয় তৈরি করেছে। দূরদেশে সংসার গড়ে তোলা অসংখ্য বাঙালির কাছে লন্ডনের এই অংশ তাই আপন এক ঠিকানা।
এই টাওয়ার হ্যামলেটসের বেথনাল গ্রিনে রয়েছে উইভার্স ফিল্ডস। শিশুদের খেলার জায়গা, ফুটবল মাঠ আর হাঁটার পথ নিয়ে পরিবারগুলোর কাছে জনপ্রিয় একটি পার্ক। শহুরে জীবনের মধ্যে খোলা আকাশের নিচে সময় কাটানোর জায়গা। সেই পার্কই এক রাতে তেরো বছরের এক কিশোরীর জীবনে ভয়াবহ স্মৃতি হয়ে থেকে যায়।
২০২৪ সালের ১ আগস্ট। বৃহস্পতিবার রাত। জনবহুল হোয়াইটচ্যাপেল রোডে দুই ব্যক্তির সঙ্গে দেখা হয় মেয়েটির। পরে পুলিশকে দেওয়া বিবরণে সে জানায়, ওই দুই ব্যক্তি তাকে উইভার্স ফিল্ডস পার্কে নিয়ে যান। সেখানে সে ধর্ষণের শিকার হয়।
পরে এক পথচারী মেয়েটিকে দেখতে পেয়ে সাহায্য করেন। রাত সাড়ে ১১টার দিকে ধর্ষণের অভিযোগ পৌঁছায় পুলিশের কাছে। শুরু হয় তদন্ত। ওই দুই ব্যক্তির খোঁজে সিসিটিভির ফুটেজ পর্যালোচনা করেন গোয়েন্দারা। ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়। সম্ভাব্য সাক্ষীদের সঙ্গেও কথা বলেন তদন্তকারীরা।
কিন্তু মেয়েটির জন্য ঘটনাটি সেই রাতেই শেষ হয়ে যায়নি। পরিবারের বর্ণনায়, এরপর নিজের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় তার প্রতিদিনের জীবনে ঢুকে পড়ে। একা থাকতে আর স্বস্তি পায় না। সম্ভব হলে পরিবারের কেউ সঙ্গে থাকেন। বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো আর আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেড়ে ওঠার বয়সে তাকে নির্ভর করতে হচ্ছে অন্যের উপস্থিতির ওপর। মেয়েকে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করতে করতে পুরো পরিবারও বহন করছে সেই রাতের আঘাত।
এদিকে মাসের পর মাস এগোতে থাকে তদন্ত। পেরিয়ে যায় দুই বছরের বেশি সময়। অবশেষে ২০২৬ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর দুই ব্যক্তির সিসিটিভির ছবি প্রকাশ করে জনসাধারণের সহায়তা চায় পুলিশ। কেউ কি তাঁদের চেনেন? কারও কাছে কি এমন কোনো তথ্য আছে, যা তদন্তকে এগিয়ে নিতে পারে? সেই আবেদনে সাড়া আসে। মানুষের দেওয়া তথ্য গোয়েন্দাদের নতুন ধাপে পৌঁছে দেয়। কিন্তু পুলিশের ধারণা, আবেদন জানানোর দিনই গা ঢাকা দেন তাঁরা।
গত ২৯ অক্টোবর দুই ব্যক্তির নাম ও ছবি প্রকাশ করে মেট্রোপলিটন পুলিশ। একজন শওকত আহমেদ, বয়স ৩১ বছর। অন্যজন জাহিদুল হাসান জায়গীরদার, বয়স ৩৪ বছর। দুজনই বাংলাদেশের বলে জানায় পুলিশ। এত দিন যাঁদের ছবির সূত্র ধরে অনুসন্ধান চলছিল, এবার তাঁদের নামও সামনে এল।
তদন্তকারীদের ধারণা, শওকত এখনো যুক্তরাজ্যেই আছেন। অন্যদিকে জাহিদুল বাংলাদেশে চলে গিয়ে থাকতে পারেন। তবে তাঁর বাংলাদেশে যাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেনি পুলিশ। দুজনের নাম ও ছবি প্রকাশের পরও তাই প্রশ্ন রয়ে গেছে, কোথায় আছেন তাঁরা? তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করতে ব্যাপক চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশ।
তদন্তের নেতৃত্বে থাকা ডিটেকটিভ চিফ ইন্সপেক্টর অ্যানা ডেইটন জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে ছবি প্রকাশের পর জনসাধারণের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য তাঁদের অনুসন্ধান এগিয়ে নিয়েছে। এখন শওকত ও জাহিদুলকে খুঁজে তাঁদের সঙ্গে কথা বলা প্রয়োজন।
ক্রাইমস্টপার্সের লন্ডন অঞ্চলের ব্যবস্থাপক অ্যালেক্সা লুকাস জানিয়েছেন, পুলিশ যাঁদের খুঁজছে, তাঁদের পরিচয় পাওয়া তদন্তের একটি অগ্রগতি। এখন জরুরি তাঁদের অবস্থান শনাক্ত করা। এ বিষয়ে সামান্য তথ্য থাকলেও তা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও আদালতে দোষী সাব্যস্ত করতে সহায়ক তথ্যের জন্য সর্বোচ্চ ১০ হাজার পাউন্ড পুরস্কারের ঘোষণাও বহাল রেখেছে সংস্থাটি।
এদিকে ঘটনাটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলে বাংলাদেশি কমিউনিটিতে অস্বস্তি তৈরি হয়। কমিউনিটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ঘটনার নিন্দা জানিয়ে বলেন, ব্রিটেনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাংলাদেশিরা শ্রম, মেধা ও সামাজিক অবদানের মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। দু-একজনের অপরাধের দায় পুরো কমিউনিটির ওপর চাপিয়ে সেই অর্জনকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায় না। একই সঙ্গে শিক্ষার্থী ভিসায় কিংবা অন্যভাবে যাঁরা নতুন যুক্তরাজ্যে এসেছেন বা আসছেন, তাঁদের মনে রাখতে হবে, দেশের আইন মেনে চলা এবং অন্যের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো অপরিহার্য দায়িত্ব। কারও অপরাধে যেন অন্য বাংলাদেশিদের প্রতি মানুষের ভয় বা অবিশ্বাস তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তাঁরা।
নেতৃবৃন্দ কমিউনিটির সবার প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, অপরাধে জড়িত কাউকে আড়াল করবেন না। কারও কাছে এ ঘটনার বিষয়ে কোনো তথ্য থাকলে তা পুলিশকে জানিয়ে সহায়তা করুন, যাতে মেয়েটি ন্যায়বিচার পায় এবং বাংলাদেশিদের প্রতি মানুষের আস্থা অটুট থাকে।
তথ্যসূত্র: London Metropolitan Police, The Standard







