
কানাডায় মাথা গোঁজার জায়গা নেই যাঁদের, কম বেতনের চাকরি করেও সংসারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন যাঁরা, তাঁদের জন্য বড় অঙ্কের সহায়তা নিয়ে এসেছে মার্ক কার্নি সরকারের নতুন বাজেট। একই সঙ্গে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে থাকছে বিপুল করছাড়। তবে সরকারি আয় ও ব্যয়ের ব্যবধান কবে ঘুচবে, বাজেটে তার সময়সীমা দেওয়া হয়নি। আগামী পাঁচ বছরই ঘাটতি নিয়ে চলার হিসাব দিয়েছে সরকার।
বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর অটোয়ার হাউস অব কমন্সে ২০২৬ সালের ফেডারেল বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ ও জাতীয় রাজস্বমন্ত্রী ফ্রাঁসোয়া-ফিলিপ শ্যাম্পেন। আগামী পাঁচ বছরে নতুন ব্যয় ও করছাড় মিলিয়ে প্রায় ১৪২ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এটি সরকারের মোট বাজেটের আকার নয়, নতুন পদক্ষেপগুলোর হিসাব।
‘মাস্টার্স অব আওয়ার ডেসটিনি’ নামের বাজেটে কার্নি সরকার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর অঙ্গীকারকে সামনে এনেছে। সরকারের যুক্তি, ব্যবসায় বিনিয়োগ বাড়লে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়বে। কিন্তু সেই সুফল আসতে সময় লাগবে বলে এখনই স্বল্প আয়ের মানুষের হাতে বাড়তি অর্থ পৌঁছানোও প্রয়োজন।
বাজেটের অন্যতম বড় ঘোষণা, আগামী ১০ বছরে গৃহহীনতার অবসানের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ লক্ষ্যে ২০২৭-২৮ অর্থবছর থেকে চার বছরে ১১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং পরবর্তী বছরগুলোতে আরও ১৭ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব রয়েছে। শুধু আশ্রয় নয়, স্থায়ীভাবে আবাসনে থাকতে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সামাজিক সেবাও পরিকল্পনায় যুক্ত হচ্ছে।
প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও সামাজিক সেবার ব্যবস্থাসহ আবাসন এবং সাময়িক বাসস্থান তৈরিতে প্রথম চার বছরে ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার রাখা হয়েছে। আবাসনের সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, আসক্তির চিকিৎসা ও সামাজিক সহায়তা যুক্ত করার নতুন তহবিলে থাকছে ১ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার। ভবন নির্মাণের মূলধনি ব্যয় বহন করবে কেন্দ্রীয় সরকার; পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট সেবার অর্থ জোগানোর দায়িত্ব নিতে হবে প্রদেশ ও টেরিটরিগুলোকে।
স্বল্প ও মাঝারি আয়ের মানুষের বাজারখরচে সহায়তার জন্য ‘কানাডা গ্রোসারিজ অ্যান্ড এসেনশিয়ালস বেনিফিট’-এর আওতায় আরেক দফা এককালীন অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। ২০২৭ সালের শুরুতে দেওয়া এই বাড়তি অর্থ হবে ২০২৬-২৭ সুবিধাবর্ষের বার্ষিক প্রাপ্যের ৫০ শতাংশ। সন্তানহীন একক ব্যক্তি সর্বোচ্চ ৩৩৯ ডলার এবং দুই সন্তানসহ দম্পতি সর্বোচ্চ ৬৭৯ ডলার পেতে পারেন। আয় ও পারিবারিক অবস্থার ভিত্তিতে প্রকৃত প্রাপ্য নির্ধারিত হবে।
কম মজুরির কর্মীদের জন্য বিদ্যমান কানাডা ওয়ার্কার্স বেনিফিট বাড়িয়ে ‘বিল্ড কানাডা ওয়ার্কার্স বেনিফিট’ করার প্রস্তাবও রয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৭ করবর্ষ থেকে অন্যান্য যোগ্যতার শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বছরে ৫০০ ডলারের বেশি কর্ম-আয়ের ওপর এই সুবিধার হিসাব শুরু হবে। বর্তমানে এই সীমা তিন হাজার ডলার। সন্তানহীন একক ব্যক্তির সর্বোচ্চ বার্ষিক সুবিধা হবে ১ হাজার ৮৫৯ ডলার এবং পরিবারের ৩ হাজার ১৪৩ ডলার।
তবে এই সুবিধা পাওয়ার সময় বদলাবে। ২০২৭ সালের জুলাই থেকে অগ্রিম অর্থের পরিমাণ অর্ধেক এবং ২০২৮ করবর্ষ থেকে তা পুরোপুরি বন্ধ করার প্রস্তাব রয়েছে। তখন কর রিটার্ন জমা দেওয়ার পরই পুরো প্রাপ্য মিলবে। ফলে বার্ষিক সুবিধা বাড়লেও বছর চলাকালে অগ্রিম অর্থের ওপর নির্ভরশীল কর্মীদের খরচের হিসাবে পরিবর্তন আনতে হবে।
অসুস্থ বা প্রতিবন্ধী স্বজনের পরিচর্যাকারীদের জন্য ‘কানাডা কেয়ারগিভার ক্রেডিট’ পুরোপুরি ফেরতযোগ্য করার প্রস্তাব আছে। এতে আয়কর দেওয়ার মতো আয় নেই, এমন যোগ্য ব্যক্তিও অর্থ পাবেন। ২০২৭ সালে সর্বোচ্চ বার্ষিক সহায়তা হবে ১ হাজার ২৬০ ডলার।
ব্যবসার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় করসুবিধাগুলোর একটি ‘প্রোডাক্টিভিটি মেগা ডিডাকশন’। এর মাধ্যমে যোগ্য যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও অন্যান্য মূলধনি সম্পদের পুরো খরচ একবারেই করযোগ্য আয় থেকে বাদ দেওয়ার সুযোগ বাড়বে। এই করসুবিধার কারণে পাঁচ বছরে সরকারের আনুমানিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার রাজস্ব কম আসবে। রেস্তোরাঁর রান্নার সরঞ্জাম থেকে নির্মাণযন্ত্র ও উৎপাদনপ্রযুক্তি পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের সম্পদ এতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, এই ব্যবস্থায় নতুন ব্যবসায়িক বিনিয়োগের ওপর কার্যকর প্রান্তিক করহার ১৩ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৪ শতাংশে নামবে। এটি সাধারণ করপোরেট আয়করের হার নয়; নতুন বিনিয়োগের ব্যয় ও করসুবিধা বিবেচনায় হিসাব করা করভার। সরকারের প্রত্যাশা, এতে কানাডায় ব্যবসা সম্প্রসারণ ও উৎপাদন বাড়ানোর আগ্রহ তৈরি হবে।
কানাডার আদিবাসী জনগোষ্ঠীর আবাসন ও মৌলিক সেবার ঘাটতি দূর করতেও বড় প্রতিশ্রুতি রয়েছে। ফার্স্ট নেশনসের আবাসন ও অবকাঠামোয় ১০ বছরে ৩২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে সংরক্ষিত এলাকায় সড়ক, সেতু, বিদ্যালয়, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও পানি ব্যবস্থাসহ অবকাঠামোর নতুন কর্মসূচিতে থাকছে ১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার।
ফার্স্ট নেশনসের বাড়িঘর নির্মাণ, মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১০ বছরে ১১ বিলিয়ন ডলার এবং দ্রুত নির্মাণ শুরু করা সম্ভব এমন আবাসন প্রকল্পে পাঁচ বছরে আরও ১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার প্রস্তাব করা হয়েছে। শিক্ষা, শিশু ও পরিবার, স্বাস্থ্য এবং নিরাপত্তার জন্যও আলাদা অর্থ থাকছে।
করদাতাদের জন্য আরেকটি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হলো রিটার্ন জমা ও বকেয়া কর পরিশোধের অভিন্ন সময়সীমা। প্রস্তাব অনুযায়ী, স্বনিয়োজিত ব্যক্তিসহ সব ব্যক্তিগত করদাতার সময়সীমা হবে ১৫ মে। এটি ২০২৭ ও পরবর্তী করবর্ষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে; অর্থাৎ নতুন নিয়মে প্রথম রিটার্ন জমা পড়বে ২০২৮ সালে।
সরকারের হিসাবে চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ঘাটতি হবে ৬২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার। পরের অর্থবছরে তা সামান্য বেড়ে ৬২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার হতে পারে। এরপর কমলেও ২০৩০-৩১ অর্থবছরে ঘাটতি থাকবে ৫২ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। অর্থনীতির আকারের তুলনায় ঘাটতি চলতি বছরের ১ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ওই সময়ে ১ দশমিক ৩ শতাংশে নামার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
সরকার বলছে, ২০২৭-২৮ অর্থবছরেই নিয়মিত পরিচালন ব্যয় রাজস্ব আয় দিয়ে মেটানো সম্ভব হবে। তবে পরিচালন ব্যয়ের ভারসাম্য এবং পুরো বাজেটের ভারসাম্য আলাদা হিসাব। অবকাঠামো ও অন্যান্য মূলধনি বিনিয়োগ যুক্ত করলে মোট হিসাবে ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন থেকেই যাবে।
বিরোধী কনজারভেটিভ নেতা পিয়ের পলিয়েভ অভিযোগ করেছেন, সরকারি ঋণ ও সেই ঋণের সুদ পরিশোধের ব্যয় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বাড়াবে। এনডিপি নেতা অ্যাভি লুইসের আপত্তি, ব্যবসার করছাড়কে অগ্রাধিকার দিয়ে মানুষের প্রয়োজন যথেষ্ট মেটানো হচ্ছে না। ডেজারডিনের উপপ্রধান অর্থনীতিবিদ র্যান্ডাল বার্টলেটও রাজস্ব আয়ের পূর্বাভাসকে উচ্চাভিলাষী বলেছেন। তাঁর মতে, এসব আশাবাদী অনুমান পূরণ না হলে ঘাটতি আরও বড় হবে।
কার্নির বাজেটের পরীক্ষা এখন বাস্তবায়নে। করছাড় পেয়ে ব্যবসা কতটা নতুন বিনিয়োগ করে, ঘোষিত অর্থে কতজন স্থায়ী বাসস্থান পান এবং বাড়তি সুবিধা সংসারের খরচে কতটা স্বস্তি আনে, তার ওপরই ফল নির্ভর করবে। কানাডার অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে মানুষের নিরাপদ আবাসন ও উন্নত জীবনে পরিণত করার দায়িত্ব এখন সরকারের।
তথ্যসূত্র: Department of Finance Canada, Budget 2026; The Canadian Press







