ভারতের ২০২৬-২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়ে ৭.৩ শতাংশ করল অর্থ মন্ত্রণালয়

দিল্লি,৩১ অক্টোবর-ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় চলতি অর্থবছরে দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে। সর্বশেষ মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ভারতের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ৩ শতাংশ হতে পারে। এর আগে এই প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৭ দশমিক ১ শতাংশ। তবে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা বাড়লেও মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছে মন্ত্রণালয়।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাসিক অর্থনৈতিক পর্যালোচনায় এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
ভারতে অর্থবছর শুরু হয় ১ এপ্রিল এবং শেষ হয় পরের বছরের ৩১ মার্চ। সে অনুযায়ী, দেশটির ২০২৬-২৭ অর্থবছর চলবে ২০২৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব অর্থনীতিতে যেখানে প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস প্রায় ৩ শতাংশ, সেখানে ভারত তার অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রেখে শক্ত অবস্থানে রয়েছে।
অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকে গতি
অর্থ মন্ত্রণালয়ের মূল্যায়ন অনুযায়ী, গত প্রান্তিকে ভারতের অর্থনীতির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকে গতি বেড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানির ব্যবহার, বন্দরে পণ্য পরিবহন, পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) আদায় এবং গাড়ি বিক্রি। এসব সূচকের ইতিবাচক প্রবণতা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্প্রসারণের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়াচ্ছে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের দাম
প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়লেও মূল্যস্ফীতির চাপ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি এবং আবহাওয়াসংক্রান্ত ঝুঁকি ভারতের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের মতে, বিশ্বজুড়ে অনিশ্চয়তা এবং জ্বালানির দাম ভারতীয় রুপির বিনিময়মূল্যের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে এসব কারণে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে ভারতের ভোক্তা মূল্যসূচকভিত্তিক মূল্যস্ফীতি (সিপিআই) আগের বছরের একই মাসের তুলনায় বেড়ে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অন্যদিকে, পাইকারি মূল্যসূচকভিত্তিক মূল্যস্ফীতি (ডব্লিউপিআই) বেড়েছে আরও বেশি, ১১ দশমিক ৩৯ শতাংশ।
খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি গ্রামাঞ্চলে ৮ শতাংশ এবং শহরাঞ্চলে ৭ দশমিক ১৮ শতাংশে পৌঁছেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই খাতে মূল্যস্ফীতি ছিল ২৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ। অর্থাৎ, আগের বছরের সেপ্টেম্বরের তুলনায় জ্বালানি ও বিদ্যুতের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ পরিবারগুলোর খরচ বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে রান্নার গ্যাসের দাম বাড়ায় পরিবারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
এল নিনোর ঝুঁকিও দেখছে সরকার
মূল্যস্ফীতির পাশাপাশি এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়েও সতর্ক করেছে ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয়। এই আবহাওয়াজনিত পরিস্থিতি শীতকালীন ফসলের বপন মৌসুমের আগে মাটির আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। খাদ্যপণ্যের সরবরাহে সমস্যা দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
রুপির দরপতন সামলানোর সক্ষমতা রয়েছে ভারতের
গত পাঁচ বছরে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ধারাবাহিকভাবে দর হারিয়েছে ভারতীয় রুপি। সাম্প্রতিক প্রায় ১৫ মাসে রুপির দরপতনের গতি আরও বেড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের ক্রয়ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের দাবি, পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকায় এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভারত ভালো অবস্থানে রয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ প্রায় ৭২১ বিলিয়ন ডলার। এই রিজার্ভ বৈশ্বিক ঝুঁকি মোকাবিলা এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির ধারা ধরে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ভারতের অর্থ মন্ত্রণালয় মনে করছে, চলতি অর্থবছরে দেশটির অর্থনীতি শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারবে। তবে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, রুপির দরপতন এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা মোকাবিলা করাই ভারতের অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকছে।
এস এম/ ৩১ অক্টোবর ২০২৬







