ইমরান খানের জীবন নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ, সেনাপ্রধানকে দায়ী করলেন ছেলে সুলাইমান

ইসলামাবাদ,৩১ অক্টোবর-পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের জীবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে সতর্ক করেছেন তাঁর ছেলে সুলাইমান খান। তাঁর অভিযোগ, বাবাকে কারাগারে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং তাঁকে হত্যার চেষ্টা চলছে। এ ঘটনার জন্য পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরকে দায়ী করেছেন সুলাইমান।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
সুলাইমানের দাবি, গত আগস্টের পর থেকে পরিবারের সদস্য ও ইমরান খানের আইনজীবীরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এর আগে ইমরান নিজেই অভিযোগ করেছিলেন, কারাগারে তাঁকে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং তাঁর জীবন বিপদের মুখে রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় সুলাইমান লেখেন, ‘আগস্টে আমার বাবা স্পষ্টভাবে বলেছিলেন, তাঁকে নির্যাতন করা হচ্ছে এবং মিসরের সরকার যেমন মোহাম্মদ মুরসিকে হত্যা করেছিল, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীও তাঁকে একই পরিণতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এরপর থেকে কেউ আমার বাবাকে দেখেনি বা তাঁর কথা শোনেনি।’
মিসরের সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মুরসি ২০১৯ সালে আদালতে শুনানি চলার সময় মারা যান। ইমরান খান আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, তাঁর পরিণতিও মুরসির মতো হতে পারে।
সুলাইমান আরও বলেন, ‘এটা স্পষ্ট যে তারা আমার বাবাকে হত্যা করতে চাইছে। কারণ, তিনি এখনো দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক নেতা এবং তাঁকে ভয় পায় তারা। সবচেয়ে খারাপ কিছু ঘটলে এর জন্য কে দায়ী, তা নিয়ে যেন কারও কোনো ভুল না থাকে।’
চিকিৎসা ও পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে উদ্বেগ
ইমরান খানের চিকিৎসা এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তাঁর পরিবার। সুলাইমানের অভিযোগ, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি নির্দেশ মানছেন না।
অভিযোগ অনুযায়ী, গত আগস্টে সুপ্রিম কোর্ট ইমরান খানের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য তাঁকে বেসরকারি শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। একই সঙ্গে পরিবারের সদস্যদের নিয়মিত সাক্ষাৎ এবং আইনজীবীদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলা হয়েছিল। তবে পাকিস্তান সরকার কারাগারে ইমরান খানের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং তাঁকে একাকী বন্দী করে রাখার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আগস্টে বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) দেওয়া লিখিত জবাবে পাকিস্তানের তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ইমরান খান সরকারের কোনো নির্বাহী আদেশে আটক নন। বরং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় দেওয়া সাজা ভোগ করছেন একজন ‘দণ্ডিত বন্দী’ হিসেবে।
৭৪ বছর বয়সী ইমরান খান বর্তমানে রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী রয়েছেন। দুর্নীতি ও ঘুষসংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হওয়ার পর থেকে তিনি কারাগারে আছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে শতাধিক মামলা রয়েছে। তবে তিনি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন এবং মামলাগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন।
ইমরানের বোনদেরও আটক করা হয়েছিল
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে আন্দোলন করতে গিয়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও চাপের মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাবার মুক্তির দাবিতে প্রচার চালানোর জন্য সুলাইমান ও তাঁর ভাই কাসিম খানকে পাকিস্তান সফর না করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
গত সেপ্টেম্বরে ইমরান খানের তিন বোন আলিমা খান, উজমা খান ও নরিন নিয়াজিকে আটক করা হয়। প্রতিবেদনে তাঁদের কোনো অপরাধে দণ্ডিত হওয়ার তথ্য নেই। পাঞ্জাব প্রদেশের জনশৃঙ্খলা রক্ষা অধ্যাদেশের আওতায় পরিকল্পিত বিক্ষোভের আগে তাঁদের আটক করা হয়েছিল। সোমবার প্রাদেশিক সরকারের কর্মকর্তারা তাঁদের আটকের মেয়াদ আরও ৩০ দিন বাড়ানোর কথা জানান।
এদিকে, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পাকিস্তানের বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ চলছে। চলতি মাসের শুরুতে আয়োজিত একটি সমাবেশে হাজারো সমর্থক অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা ইসলামাবাদের দিকে দীর্ঘ পদযাত্রা করেন। তাঁদের দাবির মধ্যে ছিল ইমরানের মুক্তি, কারাগারে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের সুযোগ বাড়ানো এবং পছন্দের চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা
গত ১১ অক্টোবর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন এবং ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার স্থগিত করেন।
আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী এই প্রদেশে ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতাকে জরুরি অবস্থা ঘোষণার কারণ হিসেবে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
তবে পিটিআই এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে একে ‘জরুরি অবস্থার আড়ালে অভ্যুত্থানের মতো ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছে। দলটির অভিযোগ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে চলমান আন্দোলন দুর্বল করতেই কর্তৃপক্ষ এমন পদক্ষেপ নিয়েছে।
ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং কারাগারে চিকিৎসার সুযোগ নিয়ে চলমান বিরোধ পাকিস্তানের রাজনৈতিক সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে তাঁর জীবননাশের আশঙ্কা এবং সেনাপ্রধানের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সুলাইমান খানের বক্তব্য। পাকিস্তান সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
এস এম/ ৩১ অক্টোবর ২০২৬







