এশিয়া

ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি করে সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থ জোগাচ্ছে উত্তর কোরিয়া

উত্তর কোরিয়া

পিয়ংইয়ং,৩১ অক্টোবর-বিশ্ব অর্থনীতি থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন উত্তর কোরিয়া বিদেশি মুদ্রা আয়ের জন্য অত্যাধুনিক সাইবার হামলার কৌশল ব্যবহার করছে।

দেশটির হ্যাকাররা ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের দুর্বল নিরাপত্তাব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে কোটি কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এসব অর্থের বড় অংশ দেশটির সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যয় করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বিশ্বের অন্যতম বড় ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেন প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স থেকে ৬৩০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরির ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার অভিজাত হ্যাকার গোষ্ঠী ‘ট্রেডারট্রেইটারের’ সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছেন সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবসের বিশেষজ্ঞরা।

গোষ্ঠীটি ‘লাজারাস গ্রুপ’ নামেও পরিচিত। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এ ঘটনায় তাদের সম্পৃক্ততার বিষয়টি চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হয়নি।

২০১৭ সাল থেকে ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরিকে অর্থ আয়ের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছে উত্তর কোরিয়া। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের ২০২৪ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে উত্তর কোরিয়ার ৫৮টি সন্দেহভাজন সাইবার হামলার ঘটনা পর্যালোচনা করা হয়েছে। এসব হামলায় চুরি হওয়া অর্থের পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি ডলার। ধারণা করা হয়, উত্তর কোরিয়ার বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের প্রায় অর্ধেক আসে এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে। একটি দেশের হিসাব অনুযায়ী, চুরি করা অর্থের ৪০ শতাংশ পর্যন্ত গণবিধ্বংসী অস্ত্র কর্মসূচিতে ব্যয় করা হয়।

শুধু ২০২৩ সালেই দেশটি ১৭টি পর্যন্ত সাইবার হামলা চালিয়ে প্রায় ৭৫ কোটি ডলার চুরি করে থাকতে পারে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্রতিষ্ঠান বাইবিট থেকে ১৫০ কোটি ডলার চুরির ঘটনায়ও এই গোষ্ঠীকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।

যুক্তরাজ্যের সাবেক জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কেন্দ্রের প্রধান সিয়ারান মার্টিনের মতে, প্রচলিত ব্যাংকিং খাতে শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে উঠলেও দ্রুত সম্প্রসারিত এবং তুলনামূলক কম নিয়ন্ত্রিত ক্রিপ্টো খাত এখনো সাইবার অপরাধীদের সহজ লক্ষ্য।

বাংলাদেশও উত্তর কোরিয়ার সাইবার হামলার শিকার হয়েছিল। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা হিসাব থেকে প্রায় ৯৫ কোটি ১০ লাখ ডলার সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে হ্যাকাররা। শেষ পর্যন্ত তারা ৮ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি করতে সক্ষম হয়।

উত্তর কোরিয়ার সাইবার তৎপরতার শিকড় দেশটির গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। দেশটির সাধারণ মানুষের ইন্টারনেট ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ থাকলেও স্কুল-কলেজে গণিত ও বিজ্ঞানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। মেধাবী শিক্ষার্থীদের বাছাই করে লাজারাসের মতো হ্যাকার গোষ্ঠীতে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এর আগে ২০১৪ সালে হলিউডের সনি পিকচার্সে সাইবার হামলার জন্যও লাজারাস গ্রুপকে দায়ী করা হয়। উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে হত্যার কাহিনি নিয়ে নির্মিত ‘দ্য ইন্টারভিউ’ চলচ্চিত্রের প্রতিবাদে ওই হামলা চালানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় সনির হাজার হাজার গোপন ই-মেইল ও নথি ফাঁস হয়ে যায়।

এভাবেই সাইবার অপরাধকে রাষ্ট্রীয় অর্থ আয়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে আসছে উত্তর কোরিয়া। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতার মধ্যেও দেশটি সামরিক ও পারমাণবিক কর্মসূচিতে অর্থ জোগানোর পথ তৈরি করেছে।

এস এম/ ৩১ অক্টোবর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language