কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটিতে টানা তৃতীয় দিন ইরানের হামলার অভিযোগ

বাগদাদ, ১৬ সেপ্টেম্বর- ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে ইরানবিরোধী কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর ঘাঁটিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো হামলা হয়েছে বলে দাবি করেছে কুর্দি বিরোধী দলগুলো।
মঙ্গলবার ও বুধবারের হামলার ধারাবাহিকতায় ইরানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হামলার অভিযোগ নতুন করে সামনে এসেছে। কুর্দি গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বশেষ হামলায় কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি (পিএকে) জানিয়েছে, ইরানের ছোড়া একটি ড্রোন এরবিল-দুহক সড়কের পাশে তাদের চামশার ঘাঁটিতে হামলার চেষ্টা করলে সেটি প্রতিহত করা হয়। ঘাঁটিটি এরবিলের উত্তরে দারাশাকরান উপজেলার কাছে অবস্থিত। সেখানে দলটির সশস্ত্র শাখা কুর্দিস্তান ন্যাশনাল আর্মির সদস্যরা অবস্থান করেন।
পিএকের নেতৃত্বস্থানীয় সদস্য রেবাজ শরিফি কুর্দি সম্প্রচারমাধ্যম রুদাওকে বলেন, ড্রোনটি ‘ইরানি শাসকগোষ্ঠী’ উৎক্ষেপণ করেছিল বলে তারা মনে করছেন। হামলার চেষ্টা প্রতিহত করা হলেও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এর আগে মঙ্গলবারও একই এলাকায় পিএকের ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ ওঠে। রুদাওয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, চামশার ঘাঁটিতে পাঁচটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়েছিল বলে পিএক দাবি করেছিল। দলটির বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দিয়ে সব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয় এবং ওই হামলায়ও কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
বালিসানেও ড্রোন হামলার অভিযোগ
ইরানের কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপিআই) জানিয়েছে, এরবিলের উত্তর-পূর্বে বালিসান এলাকায় তাদের একটি ঘাঁটিতেও বুধবার একটি একমুখী হামলাকারী ড্রোন আঘাত হেনেছে।
কেডিপিআইকে ইরানের সবচেয়ে বড় কুর্দি ভিন্নমতাবলম্বী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সংগঠনটির বিভিন্ন ঘাঁটি ও পরিবারকেন্দ্রিক ক্যাম্প অতীতেও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার লক্ষ্য হয়েছে। জুনেও এরবিলের কাছে কেডিপিআইয়ের একটি ক্যাম্পে ড্রোন হামলার অভিযোগ উঠেছিল।
সোমবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত কমালা ক্যাম্প
সর্বশেষ হামলাগুলোর আগে সোমবার দক্ষিণ সুলাইমানিয়া প্রদেশের জিরগুয়েজ এলাকায় ইরানি কুর্দি সংগঠন কমালার সদস্যদের পরিবারের জন্য ব্যবহৃত একটি ক্যাম্পে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়।
কমালার এক কর্মকর্তা রুদাওকে জানান, স্থানীয় সময় ভোররাতের দিকে ক্যাম্পটিতে তিনটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। এতে স্থাপনার কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি।
এর আগে জুলাইয়ের মাঝামাঝি একই জিরগুয়েজ এলাকায় কমালার সদর দফতরে ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নয়জন নিহত হওয়ার কথা জানিয়েছিল সংগঠনটি। তাদের দাবি, ওই হামলায় ছয়টি ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছিল।
দীর্ঘদিন ধরেই লক্ষ্যবস্তু কুর্দি গোষ্ঠীগুলো
ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে অবস্থানরত ইরানি কুর্দি বিরোধী সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরে তেহরানের সঙ্গে বিরোধে রয়েছে। ইরান এসব গোষ্ঠীকে নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে এবং তাদের নিরস্ত্র বা ইরাক থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য বাগদাদ ও কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের ওপর চাপ দিয়ে আসছে।
২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ইরাক ও ইরানের মধ্যে একটি নিরাপত্তা চুক্তির পর এসব কুর্দি গোষ্ঠীর সদস্যদের সীমান্ত এলাকা থেকে সরিয়ে কুর্দিস্তান অঞ্চলের নির্দিষ্ট কয়েকটি ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হয়েছিল। তবে এরপরও তাদের ঘাঁটি ও ক্যাম্পে ইরানের হামলার অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
রুদাওয়ের হিসাব অনুযায়ী, চলতি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে শত শত ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। এসব হামলার মধ্যে ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানও নিয়মিত লক্ষ্যবস্তু হয়েছে। আগস্টের শুরু পর্যন্ত রুদাওয়ের হিসাবে অঞ্চলটিতে ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার সংখ্যা ৯৫০ ছাড়িয়েছিল। এতে ৩২ জন নিহত এবং ১৫৪ জন আহত হওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
সংঘাতের বাইরে থাকতে চায় কুর্দিস্তান
ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার (কেআরজি) বারবার বলে আসছে, আঞ্চলিক সংঘাতে তারা কোনো পক্ষ নয়। অঞ্চলটির প্রধানমন্ত্রী মাসরুর বারজানি সাম্প্রতিক বিভিন্ন হামলার পর কুর্দিস্তান অঞ্চলের ভূখণ্ডে হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে ইরান ও ইরানি কুর্দি বিরোধী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যকার দীর্ঘদিনের বিরোধ নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করছে। ফলে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের বৃহত্তর প্রেক্ষাপটের পাশাপাশি ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলে তেহরান ও ইরানবিরোধী কুর্দি সংগঠনগুলোর সংঘাতও অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ কয়েক দিনের হামলা সেই উত্তেজনাকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
এস এম/ ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬







