সম্পাদকের পাতা

ট্রাম্পকে কার্নির কঠোর জবাব “Dollar for Dollar”

নজরুল মিন্টো

শনিবার সকাল ১১টা। অটোয়ার পার্লামেন্ট হিলের West Block Foyer। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শেষ মুহূর্তের বাণিজ্য আলোচনা ভেঙে যাওয়ার কয়েক ঘণ্টা পর কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি সেখানে সংবাদমাধ্যমের সামনে এসে দাঁড়ালেন। কেন কানাডা একটি ‘খারাপ চুক্তি’ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং এখন কোন পথে এগোবে, সেটিই ছিল তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয়। বক্তব্য শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নেরও উত্তর দেন তিনি। ওয়াশিংটনের বাণিজ্যনীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করে কার্নি ঘোষণা দেন, নতুন মার্কিন শুল্কের জবাব কানাডা দেবে “dollar for dollar”। আগামী ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক কার্যকর হবে।

কার্নির বক্তব্যে পরিষ্কার হয়ে যায়, বিরোধটি আর শুধু শুল্কের হার নিয়ে ছিল না। শেষ মুহূর্তে আলোচনার টেবিলে এসে দাঁড়িয়েছিল আরও বড় একটি প্রশ্ন। কানাডা কার সঙ্গে বাণিজ্য করবে, নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি কীভাবে রক্ষা করবে এবং দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কোন পথে এগোবে, সেই সিদ্ধান্ত কি অটোয়া নেবে, নাকি ওয়াশিংটনের চাপিয়ে দেওয়া শর্ত মেনে চলবে? কার্নির উত্তর ছিল দ্ব্যর্থহীন। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সেই বাজারে প্রবেশের মূল্য যদি হয় নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার অন্যের হাতে তুলে দেওয়া, তাহলে কানাডা সেই মূল্য দিতে রাজি নয়।

শুক্রবার রাত পর্যন্ত দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার চেষ্টা চলেছিল। কিন্তু সময়সীমা শেষ হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু নতুন শর্ত সামনে আনে, যেগুলোকে কার্নি অন্যায্য, অগ্রহণযোগ্য এবং কানাডার স্বার্থের পরিপন্থী বলে বর্ণনা করেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্র “চেয়েছে অনেক বেশি, কিন্তু দিয়েছে অনেক কম।” এরপর কানাডার আলোচক দলকে ওয়াশিংটন থেকে ফিরিয়ে এনে আলোচনা স্থগিত করেন তিনি। কার্নি জানিয়ে দেন, যুক্তরাষ্ট্র যা প্রস্তাব করেছে কানাডা তা গ্রহণ করবে না এবং ওয়াশিংটন যে ছাড় দাবি করেছে, অটোয়া তা-ও দেবে না। বাণিজ্যযুদ্ধ চলছে কি না জানতে চাইলে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “আমাদের ওপর আক্রমণ করা হয়েছে।”

কানাডার আপত্তির কেন্দ্রে ছিল শেষ মুহূর্তের কয়েকটি মার্কিন দাবি। কার্নির বক্তব্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন এমন শর্ত চেয়েছিল, যা ভবিষ্যতে অন্য দেশের সঙ্গে কানাডার স্বাধীনভাবে বাণিজ্যচুক্তি করার ক্ষমতা সীমিত করতে পারত। গাড়ি খাতের প্রস্তাবিত শর্তও কানাডীয় উৎপাদনকে সময়ের সঙ্গে অর্থনৈতিকভাবে অকার্যকর করে তুলতে পারত। এর পাশাপাশি আরও একটি স্পর্শকাতর বিষয় ছিল কানাডার ফরাসি ভাষা ও নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার।

যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই কানাডার কিছু সাংস্কৃতিক নীতিকে বাণিজ্য উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরে আসছে। ফেডারেল Online Streaming Act-এর অধীনে নির্দিষ্ট বিদেশি streaming service-কে তাদের কানাডীয় আয়ের ৫ শতাংশ Canadian broadcasting system-এ দিতে হয় এবং Canadian content-কে প্রচার ও অগ্রাধিকার দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। অন্যদিকে কুইবেকের Bill 109 streaming service ও connected-device manufacturer-দের ফরাসি ভাষার কনটেন্টকে আরও দৃশ্যমান ও অগ্রাধিকার দিতে বাধ্য করে এবং এ ক্ষেত্রে আলাদা বিনিয়োগ ও discoverability-এর শর্ত তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের সরকারি বাণিজ্য প্রতিবেদনেও এসব ব্যবস্থার USMCA-সংক্রান্ত প্রভাব নিয়ে আপত্তি ও নজরদারির কথা বলা হয়েছে। কার্নি অবশ্য জানিয়ে দেন, ফরাসি ভাষা ও কানাডীয় সংস্কৃতি রক্ষার অধিকার কোনো বাণিজ্যচুক্তির বিনিময়ে দুর্বল করা হবে না।

সব মিলিয়ে বিরোধটি আর স্টিল, অ্যালুমিনিয়াম, গাড়ি বা দুগ্ধজাত পণ্যের শুল্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। বিষয়টি গিয়ে ঠেকেছিল কানাডার নিজের বাণিজ্যনীতি, গুরুত্বপূর্ণ শিল্প, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারে। সেই জায়গায় সমঝোতা না হওয়ায় শুক্রবার রাত পেরিয়ে শনিবার ১২টা ১ মিনিটে প্রায় ২০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কানাডীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নতুন ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হয়। ওয়াইন, আসবাবপত্র, দুগ্ধজাত পণ্য, সিমেন্ট, পোশাক, মাছ ধরার সরঞ্জাম ও হকি সামগ্রীসহ বিভিন্ন পণ্য এর আওতায় পড়েছে। নতুন শুল্কের ক্ষেত্রে CUSMA বা USMCA-এর অধীনে পাওয়া অগ্রাধিকারমূলক সুবিধাও রাখা হয়নি। জবাবে ৮ সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর সমপরিমাণ পাল্টা শুল্ক বসাবে কানাডা। স্টিল, দুগ্ধজাত পণ্য, গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, কৃষি সরঞ্জাম, পাল্প ও কাগজ এবং ইলেকট্রনিকসসহ বিভিন্ন মার্কিন খাত থাকবে এর আওতায়। সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তালিকা আগামী কয়েক দিনের মধ্যে প্রকাশ করা হবে।

তবে এই বাণিজ্যযুদ্ধের হিসাব শুধু কানাডার বাজারে কত পণ্য ঢুকবে বা বের হবে, সেখানে শেষ হচ্ছে না। কানাডার ওপর চাপ বাড়াতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র নিজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাজারগুলোর একটিকেও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। কার্নি বলেন, কানাডা মার্কিন গাড়ির সবচেয়ে বড় বিদেশি ক্রেতা। যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি গাড়ি কানাডা যত কেনে, যুক্তরাজ্য, জাপান ও চীন মিলিয়েও তত কেনে না। মার্কিন স্টিলের ক্ষেত্রেও কানাডা সবচেয়ে বড় ক্রেতা। তাঁর দেওয়া হিসাবে, গত বছর মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো কানাডায় প্রায় ৬০০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের পণ্য ও সেবা বিক্রি করেছে, প্রতিদিনের হিসাবে ১.৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হিসাবেও ২০২৫ সালে কানাডা ছিল দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম পণ্য রপ্তানি বাজার।

আরও বড় প্রশ্ন জ্বালানি। কার্নির দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের আমদানি করা প্রাকৃতিক গ্যাসের ৯৯ শতাংশ, বিদ্যুতের ৮৫ শতাংশ এবং অপরিশোধিত তেলের ৬০ শতাংশ সরবরাহ করে কানাডা। যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি জ্বালানি তথ্যেও কানাডার ওপর এই গভীর নির্ভরতার চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা জ্বালানি বাণিজ্যের বড় অংশই ছিল কানাডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া জ্বালানি। কানাডীয় তেল ও গ্যাস বিশেষ করে মার্কিন রিফাইনারি, শিল্প ও বিদ্যুৎব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। কার্নির বক্তব্য, পণ্যের পাশাপাশি সেবা বাণিজ্য হিসাব করলে দুই দেশের সামগ্রিক বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রই ধারাবাহিক উদ্বৃত্ত ভোগ করে। ফলে কানাডাকে শুধু মার্কিন বাজারনির্ভর একটি অর্থনীতি হিসেবে দেখলে দুই দেশের পারস্পরিক নির্ভরতার পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না।

কৃষিতেও যুক্তরাষ্ট্রের সামনে বিশাল বাজার কানাডা। মার্কিন সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় ২৯.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের কৃষিপণ্য বিক্রি করেছে। উচ্চমূল্যের মার্কিন কৃষিপণ্যের সবচেয়ে বড় বিদেশি বাজার ছিল কানাডা, যার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এক লাখ ৩৫ হাজারের বেশি কর্মসংস্থান জড়িত। আবার মার্কিন কৃষির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সার উপাদান পটাশের নিট আমদানির প্রায় ৯০ শতাংশই আসে কানাডা থেকে। এর প্রায় ৯৫ শতাংশ ব্যবহৃত হয় সার তৈরিতে। অর্থাৎ কানাডা শুধু মার্কিন কৃষকের বড় ক্রেতাই নয়, কৃষি উৎপাদনের অত্যাবশ্যক কাঁচামালেরও প্রধান সরবরাহকারী।

কার্নির কঠিন অবস্থানের প্রতি সবচেয়ে জোরালো সমর্থন এসেছে অন্টারিওর প্রিমিয়ার ডাগ ফোর্ডের কাছ থেকে। ফোর্ড বলেছেন, Team Canada-কে এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কার্নিকে পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে তাঁর ভাষায়, জবাব হতে হবে “tariff for tariff, dollar for dollar” এবং কানাডার সার্বভৌমত্ব ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তা রক্ষায় সব বিকল্প টেবিলে রাখতে হবে। পরে সাংবাদিকদের ফোর্ড বলেন, কার্নি ওই চুক্তিতে সই না করায় তিনি খুশি, কারণ সেটি কানাডার জন্য ভালো চুক্তি ছিল না। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার প্রিমিয়ার ডেভিড ইবিও কঠোর অবস্থানের পক্ষে দাঁড়িয়ে বলেছেন, কানাডীয়দের ভদ্রতাকে দুর্বলতা হিসেবে দেখা উচিত নয় এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় কানাডা যত দিন প্রয়োজন লড়বে।

কুইবেকের প্রিমিয়ার ক্রিস্টিন ফ্রেশেটও ওয়াশিংটনের অবস্থানের বিরুদ্ধে কঠিন ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাঁর বক্তব্য, মার্কিন প্রশাসন আবার সংঘাতের পথ বেছে নিয়েছে এবং কুইবেক হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার টেবিলে ফরাসি ভাষা ও কানাডীয় সংস্কৃতির সুরক্ষা সীমিত করার চেষ্টা হয়েছিল বলে কার্নি যে তথ্য প্রকাশ করেছেন, তাতে কুইবেকের অবস্থান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নোভা স্কশিয়া, নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডর, নিউ ব্রান্সউইক ও প্রিন্স এডওয়ার্ড আইল্যান্ড থেকেও Team Canada অবস্থানের প্রতি সমর্থন এসেছে।
কার্নির অবস্থানের প্রতি সমর্থন শুধু প্রাদেশিক সরকারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। ফেডারেল পার্লামেন্টে প্রধান বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টির নেতা পিয়েরে পলিয়েভও যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপের বিরুদ্ধে জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, কানাডার কর্মসংস্থান ও ব্যবসার ওপর এই অন্যায্য আক্রমণের বিরুদ্ধে দেশকে রক্ষা করতে কানাডীয়দের ঐক্যবদ্ধভাবে দাঁড়াতে হবে। ফলে ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন বাণিজ্যচাপের মুখে সরকার ও বিরোধী দলের রাজনৈতিক মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে একটি বৃহত্তর Team Canada অবস্থানও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
এর মধ্যে কানাডাকে ঘিরে ট্রাম্পের ভাষা ও চাপ ক্রমেই বাণিজ্যের সীমানা ছাড়িয়ে গেছে। কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার কথা তিনি বারবার বলেছেন। গত জুলাইয়ে কানাডার দাবানলের ধোঁয়া যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর জন্যও দেশটিকে দায়ী করেন তিনি এবং ওই ধোঁয়ার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের কথিত খরচ কানাডীয় পণ্যের ওপর আরোপিত শুল্কের সঙ্গে যোগ করার হুমকি দেন। শনিবার কার্নি বলেন, কানাডার বিরুদ্ধে শুল্ক আরোপের পক্ষে ওয়াশিংটনের যুক্তিও বারবার বদলেছে। ফেন্টানিল থেকে শুরু করে মার্কিন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর কর, মার্কিন বিমানের certification, কানাডার তৈরি ও অর্থায়ন করা সেতুর টোল ভাগাভাগি, দুগ্ধনীতি, প্রদেশগুলোর মার্কিন অ্যালকোহল বিক্রি বন্ধ করা, Ronald Reagan-কে উদ্ধৃত করে প্রচারিত বিজ্ঞাপন, এমনকি কানাডার দাবানলের ধোঁয়াও একের পর এক সেই যুক্তির তালিকায় এসেছে।
ওয়াশিংটনের চাপ শুধু সাধারণ বাণিজ্যেও সীমাবদ্ধ ছিল না। আলোচনার সঙ্গে পরিচিত সূত্রের বরাতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও কৌশলগত সম্পদের বিষয়ও আলোচনায় এসেছে। যুক্তরাষ্ট্র চাইছিল কানাডা F-35 যুদ্ধবিমান কেনার পরিকল্পনা এগিয়ে নিক, ট্রাম্পের প্রস্তাবিত Golden Dome ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় অংশ নিক এবং কানাডার গুরুত্বপূর্ণ খনিজসম্পদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবেশাধিকার বাড়াক। গুরুত্বপূর্ণ খনিজের প্রশ্নটি ওয়াশিংটনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে কানাডার বিপুল সম্পদের দিকে তাকিয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্র। অর্থাৎ শুল্কের দরকষাকষির সঙ্গে কানাডার প্রতিরক্ষা ক্রয় ও কৌশলগত প্রাকৃতিক সম্পদের প্রশ্নও জড়িয়ে পড়েছিল।

এই ধারাবাহিক চাপের বিরুদ্ধে কানাডার জনমনে জমে থাকা অসন্তোষের আরেকটি চিত্র দেখা যাচ্ছে পার্লামেন্টের একটি পিটিশনে। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিট হুকস্ট্রাকে persona non grata ঘোষণা করে কানাডা থেকে সরিয়ে দেওয়ার দাবিতে ২১ জুলাই শুরু হওয়া পিটিশনে এখন প্রায় ২ লাখ ৪৯ হাজার বৈধ স্বাক্ষর জমা পড়েছে। পিটিশনে অভিযোগ করা হয়েছে, হুকস্ট্রা কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার হুমকিকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করেছেন এবং কানাডার অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় বারবার হস্তক্ষেপ করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে প্রায় আড়াই লাখ স্বাক্ষর দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে কানাডার জনমনে কতটা পরিবর্তন ঘটেছে, তারও একটি উল্লেখযোগ্য ইঙ্গিত।

কিন্তু অটোয়ার পরিকল্পনা শুধু প্রতিরোধে আটকে নেই। কার্নির ভাষায়, দেশের ভেতরে শক্তি তৈরি করা এবং বিদেশে বাণিজ্য ছড়িয়ে দেওয়া কানাডার কোনো “Plan B” নয়, শুরু থেকেই এটিই “Plan A”। গত এক বছরে পাঁচ মহাদেশে ২০টির বেশি নতুন বাণিজ্য ও নিরাপত্তা চুক্তি করেছে কানাডা। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সর্বশেষ চুক্তির আলোচনা শেষ হয়েছে মাত্র ৪৭ দিনে। বর্তমানে প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ভোক্তার বাজারে কানাডীয় ব্যবসার শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে। আগামী ছয় মাসে ASEAN থেকে ভারত পর্যন্ত নতুন চুক্তির মাধ্যমে সেই বাজার আরও বিস্তৃত করার লক্ষ্য নিয়েছে অটোয়া। এ শরতেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে আরও গভীর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা অংশীদারত্বের আলোচনা শুরু করার কথাও জানিয়েছেন কার্নি।

দেশের ভেতরেও বড় আকারের নতুন অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরির কাজ চলছে। কার্নি জানিয়েছেন, নতুন Major Projects Office-এ ইতোমধ্যে ২৭টি nation-building উদ্যোগ পাঠানো হয়েছে। বন্দর, খনি ও জ্বালানি করিডরসহ এসব উদ্যোগ প্রায় ৫০০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের নতুন বেসরকারি বিনিয়োগের প্রতিনিধিত্ব করে। একই সঙ্গে কানাডার বিদ্যুৎ গ্রিডের সক্ষমতা ২০৫০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ করার লক্ষ্য রয়েছে। কুইবেক ও নিউফাউন্ডল্যান্ড অ্যান্ড ল্যাব্রাডরের সঙ্গে ঘোষিত নতুন পরিচ্ছন্ন জ্বালানি উদ্যোগকে কার্নি উত্তর আমেরিকার ইতিহাসের বৃহত্তম clean-energy project হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, এটি এমন পরিমাণ পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, যা কানাডার সব যানবাহনের প্রয়োজন মেটানোর সমান।

এই অর্থনৈতিক পুনর্বিন্যাসের বড় একটি মঞ্চ হতে যাচ্ছে আগামী ১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর টরন্টোয় প্রথম Canada Investment Summit। সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী নেতাদের একত্র করছে কার্নি সরকার। শনিবার কার্নি জানান, অংশ নিতে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো সম্মিলিতভাবে ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি সম্পদ পরিচালনা করে। সরকারের লক্ষ্য আগামী পাঁচ বছরে সরকারি, বেসরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের মাধ্যমে কানাডায় এক ট্রিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বেশি বিনিয়োগ সৃষ্টি করা। জ্বালানি, critical minerals, artificial intelligence, নতুন প্রযুক্তি ও বড় অবকাঠামো প্রকল্প থাকবে এই বিনিয়োগ উদ্যোগের কেন্দ্রে। অর্থাৎ ওয়াশিংটনের চাপের জবাব শুধু পাল্টা শুল্কে নয়, বিশ্বের পুঁজি ও নতুন বাজারকে কানাডার দিকে টেনে আনার মধ্যেও খুঁজছে অটোয়া।

ভবিষ্যতের আরও একটি সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে আটলান্টিক মহাসাগরের নিচ দিয়ে। North Atlantic Transmission One Link বা NATO-L নামে প্রস্তাবিত একটি বিশাল বিদ্যুৎ সংযোগ পূর্ব কানাডার পরিচ্ছন্ন জ্বালানিকে ইউরোপের বাজারের সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে। প্রকল্প কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি ৬ গিগাওয়াট ক্ষমতার একটি transatlantic clean-energy interconnector হবে। তাদের বর্তমান হিসাবে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৫০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলার এবং লক্ষ্য ২০৩০-এর দশকের শেষ ভাগে এটি সম্পন্ন করা। প্রকল্পটি এখনো প্রস্তাব ও উন্নয়ন পর্যায়ে রয়েছে। তবে বাস্তবায়িত হলে কানাডার জলবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির জন্য উত্তর আমেরিকার বাইরেও সরাসরি বিশাল একটি বাজার তৈরির পথ খুলতে পারে।

এই আত্মনির্ভরতার প্রশ্ন এখন শুধু বাণিজ্য কিংবা জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ নেই, পৌঁছে গেছে কানাডীয়দের তথ্যের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নেও। অন্টারিও সরকার সম্প্রতি Data Centre Playbook-এর একটি নতুন কাঠামো প্রকাশ করেছে, যার অন্যতম লক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ কানাডীয় তথ্য দেশের ভেতরেই রাখা এবং ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব শক্তিশালী করা। এ প্রসঙ্গে ডাগ ফোর্ড সরাসরি ট্রাম্পকে সামনে এনে বলেছেন, কানাডা যদি নিজের ডেটা অবকাঠামো গড়ে না তোলে, তাহলে কানাডীয়দের তথ্য যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হাতে পড়ার ঝুঁকি থাকবে। পরে তিনি আরও বলেন, সুযোগ পেলে ট্রাম্প “তিন সেকেন্ডের মধ্যেই” কানাডাকে বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারেন। ফোর্ডের বক্তব্যের সারকথা একটাই, কানাডীয়দের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য কানাডার ভেতরেই রাখতে হবে, তার নিয়ন্ত্রণও কানাডার হাতেই থাকতে হবে এবং সেই অবকাঠামো গড়ে তোলার সক্ষমতা দেশটির আছে।

কার্নি দাবি করেছেন, এই বিকল্প অর্থনৈতিক কৌশলের ফল ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। তাঁর হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরের বাজারে কানাডার রপ্তানি দ্রুত বাড়ছে এবং আগামী দশকে তা দ্বিগুণ হওয়ার পথে রয়েছে। কানাডায় foreign direct investment দুই দশকের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের চার গুণ এবং এ বছর ও আগামী বছর G7 দেশগুলোর মধ্যে দ্বিতীয় দ্রুততম অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে রয়েছে কানাডা। কার্নির বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের চাপ শুরু হওয়ার সময়ের তুলনায় কানাডা এখন আরও ঐক্যবদ্ধ, আরও উচ্চাভিলাষী এবং কম মার্কিন-নির্ভর।

এখানেই ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য বড় ঝুঁকি। কানাডাকে চাপ দিয়ে বাজারসুবিধা আদায়ের পুরোনো কৌশল আর আগের মতো কার্যকর হচ্ছে না। দীর্ঘমেয়াদে কানাডীয় ব্যবসা, জ্বালানি ও কাঁচামাল যদি নতুন বাজারের দিকে আরও বেশি সরে যায় এবং কানাডীয় ভোক্তারা মার্কিন পণ্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে থাকেন, তাহলে ওয়াশিংটনের হারানোর তালিকাও ছোট হবে না। প্রায় ৬০০ বিলিয়ন কানাডিয়ান ডলারের বার্ষিক পণ্য ও সেবার বাজার, ২৬টি অঙ্গরাজ্যের এক নম্বর ক্রেতা, মার্কিন গাড়ি ও স্টিলের সবচেয়ে বড় বিদেশি বাজার, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যের সবচেয়ে বড় ক্রেতা, পটাশের প্রধান সরবরাহকারী এবং মার্কিন জ্বালানি ব্যবস্থার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত কানাডীয় তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ, সবই একই সমীকরণের অংশ। এর সঙ্গে রয়েছে উত্তর আমেরিকার কয়েক দশকে গড়ে ওঠা ঘনিষ্ঠ শিল্প সরবরাহব্যবস্থা। বাণিজ্যযুদ্ধে বড় অর্থনীতি হওয়া অবশ্যই শক্তি, কিন্তু সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী বাজার এবং কৌশলগত সরবরাহকারীকে দূরে ঠেলে দিলে যে দীর্ঘমেয়াদি মূল্য দিতে হতে পারে, তা পুষিয়ে নেওয়া সহজ হবে না।

শনিবার পার্লামেন্ট হিলে দাঁড়িয়ে কার্নি তাই শুধু একটি ব্যর্থ বাণিজ্য আলোচনার হিসাব দেননি। তিনি কার্যত কানাডা-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বদলে যাওয়া বাস্তবতার ঘোষণাও দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, “America has changed”। যে দীর্ঘ অর্থনৈতিক একীভূতকরণ একসময় দুই দেশের শক্তি ছিল, সেটিকেই এখন ওয়াশিংটন চাপ প্রয়োগের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে বলে তাঁর অভিযোগ। কিন্তু কার্নির বার্তাও সমান কঠিন। কানাডা তার বাজার ছড়িয়ে দেবে, নিজস্ব জ্বালানি ও অবকাঠামো গড়ে তুলবে, বিশ্বের পুঁজি আকর্ষণ করবে, নিজের তথ্য নিজের দেশে রাখবে এবং নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করবে। তাঁর বক্তব্যের সারকথা, কানাডা যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে যা হারাতে পারে, তার চেয়েও বেশি নিজের জন্য তৈরি করার পথে এগোচ্ছে। আর ওয়াশিংটনের শর্ত যদি কানাডার ভাষা, সংস্কৃতি, বাণিজ্যনীতি কিংবা সার্বভৌম সিদ্ধান্তের অধিকারে গিয়ে ঠেকে, তাহলে অটোয়ার উত্তর একটিই: না।

তথ্যসূত্র:
The Canadian Press
House of Commons of Canada
Reuters


Back to top button
🌐 Read in Your Language