সম্পাদকের পাতা

সন্তানেরা আমেরিকা-লন্ডনে, সিলেটের বাড়িতে নির্মমভাবে খুন বাবা-মা

নজরুল মিন্টো

পৃথিবীর দুই প্রান্তে ছড়িয়ে আছেন আদরের চার সন্তান। একমাত্র ছেলে আরিফ ইফতেখার আমেরিকায় থাকেন; তাঁর এক বোনও আমেরিকায়, আর দুই বোন ব্রিটেনে। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে একসময় যে বাবা-মা বুকের ভেতর কষ্ট চেপে তাঁদের দূর দেশে পাঠিয়েছিলেন, সময়ের সঙ্গে সেই দূরত্বই হয়ে উঠেছিল তাঁদের জীবনের স্বাভাবিক বাস্তবতা। সিলেট নগরীর রায়নগরে নিজ বাড়িতে থেকে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ বাবা-মা মো. আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম। সন্তানেরা দূরে থাকলেও সম্পর্কের উষ্ণতা ছিল অটুট। হয়তো প্রতিদিন অপেক্ষা করতেন একটি ফোনের, একটি কণ্ঠের। ১২ আগস্টের সকাল সেই অপেক্ষাকে চিরদিনের জন্য থামিয়ে দিল। নিজের ঘরেই নির্মমভাবে খুন হলেন আব্দুস সাত্তার ও সুরাইয়া বেগম। একই হত্যাকাণ্ডে প্রাণ হারান তাঁদের গৃহকর্মী তাহমিনা বেগমও।

মর্মান্তিক এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি কেবল একটি পরিবারের শোকের গল্প নয়, প্রবাসী জীবনের এক গভীর বাস্তবতাকেও সামনে এনেছে। সন্তানদের পড়াশোনা, কর্মজীবন কিংবা উন্নত ভবিষ্যতের জন্য একসময় বাবা-মাই তাঁদের বিদেশের পথে এগিয়ে দেন। সন্তানরা সেখানে সংসার গড়েন, কর্মজীবনে প্রতিষ্ঠিত হন। কিন্তু বয়স বাড়তে বাড়তে দেশে থেকে যাওয়া বাবা-মায়ের জীবনও বদলে যায়। বাড়ি থাকে, অর্থ থাকে, দেখাশোনার মানুষও হয়তো থাকে; তবু সন্তানের শারীরিক উপস্থিতির অভাব থেকেই যায়। আর হাজার হাজার মাইল দূরে থাকা সন্তানদের মনে কখনও না কখনও একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়, বাবা-মা নিরাপদ আছেন তো?

আব্দুস সাত্তার নিজের শেষ বয়সের আশ্রয়টিও সাজিয়েছিলেন মনের মতো করে। বাড়িটির নাম ‘নিকুঞ্জ ভিলা’। বাহারি ফুল আর নানা জাতের গাছগাছালিতে ঘেরা বাড়িটি ছিল তাঁর বহু বছরের ঠিকানা। সিলেট নগরীর রায়নগর রাজবাড়ীর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর এই বাড়ির দ্বিতীয়তলায় স্ত্রী সুরাইয়া বেগম ও গৃহকর্মী তাহমিনাকে নিয়ে থাকতেন তিনি। উপরের ও নিচের তলায় ছিলেন ভাড়াটিয়ারা। পাশাপাশি তাঁর আরেকটি তিনতলা বাড়িও রয়েছে। দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে এই ‘নিকুঞ্জ’ই ছিল বৃদ্ধ দম্পতির শান্তির ঠিকানা। যে বাড়ির প্রতিটি কোণে জড়িয়ে ছিল তাঁদের জীবনের স্মৃতি, এক নির্মম সকালে সেই বাড়িই হয়ে উঠল রক্তাক্ত এক ট্র্যাজেডির সাক্ষী।

বুধবার সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে প্রতিবেশীরা বাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার শুনেছিলেন। বয়স্ক মানুষ থাকেন, হয়তো কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন, এমনটা ভেবে প্রথমে কেউ এগিয়ে যাননি। কিছুক্ষণ পর সব শান্ত হয়ে যায়। সকাল ১০টার দিকে বাড়িতে রঙের কাজ করতে আসা এক মিস্ত্রি অনেক ডাকাডাকি করেও কারও সাড়া পাননি। এরপর পাশের ভবনের দ্বিতীয়তলার এক বাসিন্দার চোখে পড়ে ভয়াবহ দৃশ্য। আব্দুস সাত্তারের বাসার দরজার নিচ দিয়ে বারান্দার দিকে গড়িয়ে আসছে রক্ত।

মুহূর্তের মধ্যে আশপাশের মানুষ জড়ো হন। ৯৯৯ ডায়াল করে খবর দেওয়া হয় পুলিশকে। পুলিশ এসে প্রধান দরজা ভেঙে ভেতরে ঢোকে। একটি কক্ষে পড়ে ছিলেন আব্দুস সাত্তার। অন্য একটি কক্ষে সুরাইয়া বেগম ও তাহমিনার রক্তাক্ত দেহ। নিহতদের গলা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের আঘাত ছিল বলে পুলিশ জানায়। দেয়াল ও বাথরুমের বিভিন্ন জায়গাতেও ছিল রক্তের দাগ। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত ঘটনাস্থলে চলে আলামত সংগ্রহ। PBI ও CID-এর ক্রাইমসিন ইউনিটও সেখানে কাজ করে। পরে তিনটি মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠানো হয়।

প্রথম কয়েক ঘণ্টায় হত্যাকাণ্ড ঘিরে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। আব্দুস সাত্তারের কক্ষের তিনটি ওয়ারড্রোব তছনছ অবস্থায় পাওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাগজপত্র খোয়া যাওয়ার কথাও বলা হয়। মেঝেতে পাওয়া যায় একটি দলিলের কপি। ফলে প্রশ্ন ওঠে, এটি কি ডাকাতি, ব্যক্তিগত শত্রুতা, নাকি সম্পত্তি নিয়ে কোনো বিরোধের পরিণতি?

সেই প্রশ্নের পেছনে কারণও ছিল। রিকাবীবাজারের একটি সম্পত্তি নিয়ে আব্দুস সাত্তারের বিরোধ ও মামলা চলছিল। তাঁর আইনজীবী আজিজুর রহমান মানিকের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ লাইন লুসাই গির্জা সমিতির জায়গা ও সেখানে ইম্পাস টাওয়ার নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিরোধের সূত্রপাত। গির্জা সমিতির কাছ থেকে লিজ নিয়ে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করেছিলেন আব্দুস সাত্তার। ২০২৩ সালে তিনি সম্পত্তিটি নিয়ে স্বত্ব মামলা করেন, যার নম্বর ২১১/২৩। পরে আদালতের একটি আদেশের বিরুদ্ধে সিরাজুল ইসলাম বাদী হয়ে সিভিল রিভিশন মামলা করেন। সেই মামলায় আব্দুস সাত্তার ছিলেন বিবাদী। মামলাটির নম্বর ৭০/২৩ এবং আগামী ১৯ আগস্ট শুনানির তারিখ নির্ধারিত ছিল। আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় দুই সপ্তাহ আগেও একটি শুনানিতে আদালতে উপস্থিত হয়েছিলেন আব্দুস সাত্তার।

তাঁর পরিচিত বিএনপি নেতা আব্দুর রাজ্জাকও সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধকে তদন্তের আওতায় রাখার দাবি জানান। সিলেট মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামও জানান, সম্পত্তির বিরোধসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন কারণ সামনে রেখে তদন্ত চলছে। কিন্তু এর মধ্যেই পুলিশের হাতে আসে এমন কিছু তথ্য, যা তদন্তকে নিয়ে যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দিকে।

আশপাশের CCTV ফুটেজ ও প্রযুক্তিগত তথ্য বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তদন্তকারীদের নজরে আসে লাল টি-শার্ট ও মাথায় ক্যাপ পরা এক ব্যক্তি। স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁর পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি বাবুল মিয়া, বয়স প্রায় ৪০ বছর। রায়নগর রাজবাড়ী এলাকার আক্তার মিয়ার কলোনিতে থাকতেন। বাবার নাম মৃত নূর মিয়া। পেশায় রংমিস্ত্রি, পাশাপাশি মাঝেমধ্যে কসাইয়ের কাজও করতেন। ওই বাড়িতে আগেও কাজ করেছিলেন তিনি।

হত্যাকাণ্ডের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই রায়নগর এলাকা থেকে বাবুলকে আটক করে পুলিশ। এরপর জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশের সামনে আসে হত্যাকাণ্ডের একটি প্রাথমিক ঘটনাক্রম।

সিলেট মহানগর পুলিশ কমিশনার সারোয়ার মুর্শেদ শামীমের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবুলের সঙ্গে গৃহকর্মী তাহমিনার আগে থেকেই পরিচয় ছিল। প্রায় ১৫ থেকে ২০ দিন আগে তাঁদের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বুধবার সকাল ৯টার কিছু পরে বাবুল ওই বাড়িতে যান। দরজায় নক করলে তাহমিনা তাঁকে ভেতরে ঢুকতে দেন। পরে একটি কক্ষে তাঁদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাবুল তাহমিনাকে অনৈতিক সম্পর্কের প্রস্তাব দিলে তিনি রাজি হননি। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটি ধস্তাধস্তিতে গড়ায়। তারপর মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘটে যায় তিনটি হত্যাকাণ্ড।

পুলিশের দাবি, বাবুল প্রথমে তাহমিনাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করেন। তাঁর চিৎকার শুনে সুরাইয়া বেগম ছুটে এলে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। এরপর এগিয়ে আসেন আব্দুস সাত্তার। তাঁর সঙ্গে বাবুলের ধস্তাধস্তি হয় এবং একপর্যায়ে তাঁকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। পুলিশের হিসাবে সকাল ৯টা ২৫ থেকে ৯টা ৩৫ মিনিটের মধ্যেই তিনজনের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে।

তিনটি প্রাণ নিভিয়ে দেওয়ার পর বাবুল পেছনের বারান্দা দিয়ে বেরিয়ে যান বলে পুলিশ জানিয়েছে। একটি বর্ণনা অনুযায়ী, ভেতর থেকে দরজার ছিটকিনি লাগিয়ে দ্বিতীয়তলার বারান্দা দিয়ে নিচে নেমে পালান তিনি। হত্যায় ব্যবহৃত ছুরিটি পাশের একটি জঙ্গলাকীর্ণ মাঠে ফেলে দেওয়ার কথা তিনি পুলিশকে জানিয়েছেন।

ঘটনার পর রায়নগরেই নিজের বাসায় ফিরে যান বাবুল। প্রযুক্তিগত তথ্য ও স্থানীয়দের সহায়তায় তাঁকে শনাক্ত করে পুলিশের বিশেষ দল। পরে সেখান থেকে তাঁকে আটক করা হয়। পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বাবুল হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হত্যায় ব্যবহৃত ছুরি উদ্ধারে অভিযান চালানো হয়। একই সঙ্গে হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত ছিল কি না এবং সম্পত্তিসংক্রান্ত বিরোধের সঙ্গে ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, সেটিও তদন্ত করছে পুলিশ।

নিহত আব্দুস সাত্তার সিলেটের পরিচিত ব্যবসায়ী ছিলেন। তাঁর গ্রামের বাড়ি বিয়ানীবাজারের আখাজনা গ্রামে। বাবার নাম আবরু মিয়া। একসময় কয়লা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন আব্দুস সাত্তার। ছিলেন সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক পরিচালক এবং সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের উপদেষ্টা। স্থানীয়ভাবে তিনি মিতালী আবাসিক এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন।

এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড প্রবাসী পরিবারগুলোর সামনে আরেকটি কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারের সন্তান এখন পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। বাবা-মায়ের আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্যের ব্যবস্থা করা যায়, ভালো চিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়, সহায়তার জন্য গৃহকর্মী রাখা যায়। প্রযুক্তির কল্যাণে প্রতিদিন ভিডিও কলে তাঁদের মুখও দেখা যায়। কিন্তু দূর দেশে বসে তাঁদের চারপাশের প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি দরজা কিংবা প্রতিটি সম্ভাব্য বিপদের ওপর নজর রাখা সম্ভব নয়।

প্রবাসী সন্তানদের দেশে থাকা প্রবীণ বাবা-মায়ের নিরাপত্তা তাই নতুন করে ভাবার বিষয়। বাড়িতে কারা নিয়মিত আসছেন, গৃহকর্মী বা মিস্ত্রি হিসেবে কারা প্রবেশাধিকার পাচ্ছেন, CCTV সচল আছে কি না, প্রতিবেশীদের সঙ্গে জরুরি যোগাযোগের ব্যবস্থা আছে কি না, প্রয়োজনে দ্রুত কার কাছে পৌঁছানো যাবে, এসব বিষয়ে পরিবারের একটি কার্যকর ব্যবস্থা থাকা জরুরি।

প্রবাসজীবনে অর্জনের গল্প অনেক। তার আড়ালে এমন কিছু অসহায় মুহূর্তও থাকে, যার কোনো সহজ সমাধান নেই। সবচেয়ে কঠিন মুহূর্তটি সম্ভবত তখনই আসে, যখন মাঝরাতে হঠাৎ একটি ফোন বেজে ওঠে। ফোনের ওপাশ থেকে কেউ জানায়, বাবা আর নেই, কিংবা মা আর নেই।

সর্বশেষ জানা গেছে, বাবা-মাকে শেষবারের মতো দেখতে বিদেশে থাকা চার সন্তানই দেশের পথে রওনা হয়েছেন। তাঁরা ফিরছেন এমন এক শহরে, যেখানে তাঁদের জন্য অপেক্ষা করছে শোক, জানাজা, দাফন এবং বাবা-মাকে ঘিরে বহু স্মৃতি। যে বাবা-মাকে জীবিত অবস্থায় দূরদেশ থেকে হোয়াটসঅ্যাপ বা ফেসটাইমে দেখতেন, তাঁদের এবার শেষবারের মতো সামনে দাঁড়িয়ে বিদায় জানাতে হবে।

এনএন/ ১৩ আগস্ট ২০২৬


Back to top button
🌐 Read in Your Language