সম্পাদকের পাতা

ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ

নজরুল মিন্টো

বিশ্বকাপের ফাইনালে কোটি কোটি মানুষের চোখ থাকে ট্রফির দিকে। বিজয়ী দলের অধিনায়ক যখন সোনালি ট্রফিটি দুই হাতে তুলে ধরেন, তখন তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে করতালি দেন আরেকজন মানুষ। তিনি গোল করেন না, কোচিং করান না, রেফারির বাঁশিও বাজান না। তবু বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো আসে তাঁর টেবিল থেকে। চার বছর পরপর যে বিশ্বকাপ পৃথিবীকে থমকে দেয়, সেই আয়োজনের সর্বোচ্চ দায়িত্ব তাঁর কাঁধেই। তিনি ফিফার প্রেসিডেন্ট, জিয়ান্নি ইনফান্তিনো।

খেলোয়াড়ের ক্ষমতা মাঠের নব্বই মিনিটে দেখা যায়। কোচের ক্ষমতা বোঝা যায় দল নির্বাচন ও কৌশলে। কিন্তু ফিফার প্রেসিডেন্টের প্রভাব ছড়িয়ে থাকে মাঠের সীমানার বহু বাইরে। বিশ্বকাপ কোথায় হবে, কতটি দল খেলবে, প্রতিযোগিতার কাঠামো কী হবে, প্রযুক্তি কতটা ব্যবহৃত হবে, ফুটবলের বিপুল অর্থ কোথায় ব্যয় হবে এবং পিছিয়ে থাকা দেশগুলো কতটা সহায়তা পাবে, এসব সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ায় তাঁর নেতৃত্বাধীন ফিফার ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর জন্ম ১৯৭০ সালের ২৩ মার্চ সুইজারল্যান্ডের ভালে অঞ্চলের ছোট শহর ব্রিগে। তাঁর মা-বাবা ইতালি থেকে সুইজারল্যান্ডে গিয়ে বসতি গড়েছিলেন। আল্পস পর্বতমালার কোলে, ইতালির সীমান্তের কাছাকাছি একটি বহুভাষিক পরিবেশে বেড়ে ওঠেন তিনি। পরবর্তী জীবনে ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের এই অভিজ্ঞতাই আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনে তাঁর বড় শক্তি হয়ে ওঠে। ইতালীয়, ফরাসি, জার্মান, ইংরেজি ও স্প্যানিশসহ একাধিক ভাষায় কথা বলার দক্ষতা তাঁকে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ফুটবল কর্মকর্তাদের কাছে সহজে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে।

ফুটবলের প্রতি আগ্রহ থাকলেও তাঁর পেশাজীবন শুরু হয়েছিল মাঠে নয়, আইন নিয়ে। ইউনিভার্সিটি অব ফ্রিবুর্গে আইন বিষয়ে পড়াশোনার পর তিনি ক্রীড়া আইন ও প্রশাসনের সঙ্গে যুক্ত হন। ২০০০ সালে ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফায় যোগ দেওয়ার পর একে একে তাঁর সামনে খুলতে থাকে আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনের দরজা। আইন, বাণিজ্যিক কার্যক্রম, ক্লাব লাইসেন্সিং ও প্রতিযোগিতা পরিচালনার বিভিন্ন দায়িত্ব পেরিয়ে ২০০৯ সালে তিনি উয়েফার সাধারণ সম্পাদক হন।

সেই সময় ইউরোপীয় প্রতিযোগিতার ড্র অনুষ্ঠানে তাঁকে নিয়মিত দেখা যেত। স্বচ্ছ উচ্চারণ, পরিমিত উপস্থাপনা এবং অনায়াসে ভাষা বদলে কথা বলার ক্ষমতার কারণে টেলিভিশন দর্শকদের কাছেও তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। তবে তখনও হয়তো খুব কম মানুষ ভেবেছিলেন, এই মানুষটিই একদিন বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক আসনে বসবেন।

সেই সুযোগ আসে ফিফার ইতিহাসের এক অন্ধকার সময়ে। ২০১৫ সালে দুর্নীতি, ঘুষ, গ্রেপ্তার এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে সংস্থাটির ভিত কেঁপে ওঠে। দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট সেপ ব্ল্যাটারের যুগের অবসান ঘটে। ফুটবলপ্রেমীদের চোখে ফিফা তখন খেলার অভিভাবক নয়, বরং সন্দেহ ও অবিশ্বাসে ঘেরা একটি প্রতিষ্ঠান।

এই সংকটের মধ্যেই ২০১৬ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি ফিফার বিশেষ কংগ্রেসে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হন জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ফিফায় স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা, দুর্নীতির সংস্কৃতি বদলানো এবং সংস্থাটির হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি দায়িত্ব নেন। পরে ২০১৯ ও ২০২৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পুনর্নির্বাচিত হন।

ফিফার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কোনো দেশের সাধারণ নির্বাচনের মতো নয়। এখানে সাধারণ ফুটবল দর্শকের ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। ভোট দেন ফিফার সদস্য জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর প্রতিনিধিরা।

ফিফার ২১১টি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের প্রত্যেকের একটি করে ভোট রয়েছে। দেশটি বিশ্বকাপজয়ী নাকি কখনও বিশ্বকাপেই খেলতে পারেনি, ভোটের হিসাবে তার কোনো পার্থক্য নেই। ব্রাজিলের একটি ভোট, বাংলাদেশেরও একটি। আর্জেন্টিনার একটি, ভুটানেরও একটি। এই ‘এক দেশ, এক ভোট’ নীতিই ফিফা নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য।

প্রথম দফায় একজন প্রার্থীর দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন; তা না হলে পরবর্তী দফায় সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতাই যথেষ্ট। প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর এবং সর্বোচ্চ তিন মেয়াদ দায়িত্ব পালনের সুযোগ রয়েছে। ২০১৬ সালে সেপ ব্ল্যাটারের অসমাপ্ত মেয়াদের মাঝপথে দায়িত্ব নেওয়ায় ইনফান্তিনোর সেই সময়টি পূর্ণ মেয়াদ হিসেবে গণনা হয়নি। ফলে তিনি ২০২৭ সালের নির্বাচনে আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন। গত এপ্রিলে ভ্যাঙ্কুভারে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে তিনি পুনর্নির্বাচনে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন। ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ মরক্কোয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। জয়ী হলে তিনি ২০৩১ সাল পর্যন্ত দায়িত্বে থাকতে পারবেন।

নির্বাচনব্যবস্থাটি সরল ও গণতান্ত্রিক মনে হলেও বাস্তবে এর ভেতরে রয়েছে জটিল ফুটবল-কূটনীতি। ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ আমেরিকার বড় দেশগুলোর সমর্থন পেলেই জয় নিশ্চিত হয় না। প্রার্থীকে আফ্রিকা, এশিয়া, ওশেনিয়া, উত্তর ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবীয় অঞ্চলের ছোট ছোট অ্যাসোসিয়েশনের আস্থাও অর্জন করতে হয়।

অনেক ছোট দেশের ফুটবল অবকাঠামো নির্মাণ, প্রশিক্ষণকেন্দ্র পরিচালনা, নারী ফুটবল, বয়সভিত্তিক দল এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে ফিফার অনুদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে ফিফার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সম্পর্ক শুধু মর্যাদা বা কূটনীতির বিষয় নয়; এর সঙ্গে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক প্রয়োজনও জড়িয়ে থাকে।

ইনফান্তিনো এই সমীকরণটি ভালোভাবেই বুঝেছেন। তাঁর সময়ে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড’ কর্মসূচির আওতায় সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোর জন্য উন্নয়ন তহবিল ও প্রকল্পের পরিধি বাড়ানো হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ফুটবলকে সত্যিকার অর্থে বিশ্বজনীন করতে হলে শুধু ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার প্রতিষ্ঠিত শক্তিগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। যেসব দেশে ভালো মাঠ নেই, প্রশিক্ষকের অভাব রয়েছে কিংবা খেলোয়াড় তৈরির পর্যাপ্ত অর্থ নেই, তাদেরও সামনে এগিয়ে আসার পথ তৈরি করতে হবে।

তাঁর এই দর্শনের সবচেয়ে বড় প্রকাশ দেখা গেছে ২০২৬ বিশ্বকাপে। প্রথমবারের মতো অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৩২ থেকে বেড়ে ৪৮ হয় এবং ম্যাচের সংখ্যা দাঁড়ায় ১০৪। কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোজুড়ে অনুষ্ঠিত এই আসর বিশ্বকাপের ইতিহাসে নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। বাছাইপর্বের কঠিন পথ পেরিয়ে আরও বেশি দেশ প্রথমবার কিংবা দীর্ঘ বিরতির পর বিশ্বমঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার সুযোগ পেয়েছে।

ফিফার ভাষায়, এই সম্প্রসারণ ফুটবলকে আরও বেশি দেশ ও মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের আর্থিক চক্রে ফিফা প্রায় ১১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাজস্ব পাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিল। এই অর্থের উৎসের মধ্যে রয়েছে সম্প্রচারস্বত্ব, স্পনসরশিপ, টিকিট, আতিথেয়তা ও লাইসেন্সিং। ইনফান্তিনোর দাবি, আয়ের বড় অংশ আবার সদস্য দেশগুলোর ফুটবল উন্নয়নে ফিরিয়ে দেওয়া হবে।

তাঁর সময়ে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর, অফসাইড প্রযুক্তি এবং বলের ভেতরে সেন্সর ব্যবহারের মতো প্রযুক্তি বিশ্ব ফুটবলের পরিচিত অংশ হয়ে উঠেছে। সম্প্রসারিত ক্লাব বিশ্বকাপ, নারী ফুটবলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দলবদলব্যবস্থায় সংস্কার এবং নতুন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা তৈরিও তাঁর প্রশাসনের উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।

ইনফান্তিনোর সময়টি শুধু প্রশাসনিক সাফল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। কাতার বিশ্বকাপের আগে অভিবাসী শ্রমিকদের অধিকার ও মানবাধিকার নিয়ে তীব্র বিতর্ক দেখা দেয়। তাঁর মূল যুক্তি ছিল, ইউরোপীয় দেশগুলো শত শত বছর ধরে বিশ্বজুড়ে যা করেছে, সেই ইতিহাসের কারণে কাতারকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার আগে তাদেরই ক্ষমা চাওয়া উচিত। তিনি কাতারে শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি হয়েছে বলেও দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য বিশ্বকাপের আয়োজক দেশ, পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গি এবং ফুটবলের সঙ্গে মানবাধিকারের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে আলোচনার জন্ম দেয়।

মাঠে ইতিহাস লেখেন খেলোয়াড়েরা। কিন্তু সেই ইতিহাস কোন দেশে, কোন কাঠামোয় এবং কত বড় মঞ্চে লেখা হবে, তা নির্ধারণে ইনফান্তিনোর প্রভাব অপরিসীম। বিজয়ী অধিনায়কের হাতে তিনি যখন বিশ্বকাপের ট্রফি তুলে দেন, সেই দৃশ্যে মাঠের সাফল্যের পাশাপাশি নেপথ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতাও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

ইনফান্তিনো এমন একজন প্রশাসক, যিনি বিশ্বকাপের দরজা আরও বেশি দেশের জন্য খুলেছেন, ফিফাকে আর্থিকভাবে শক্তিশালী করেছেন এবং খেলাটিকে নতুন নতুন অঞ্চলে ছড়িয়ে দিয়েছেন। আন্তর্জাতিক ফুটবল প্রশাসনের মানচিত্রে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন ঠিক কেন্দ্রবিন্দুতে। তাই তাঁকে কেবল ফিফার প্রেসিডেন্ট বললে পরিচয়টি সম্পূর্ণ হয় না। তিনি নিঃসন্দেহে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ।

তথ্যসূত্র:
FIFA, President and FIFA Council profiles
Reuters


Back to top button