
অপরাধী মানে অপরাধী। আদালত যখন প্রমাণ, সাক্ষ্য ও আইনের আলোকে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করে, তখন তার অর্থ-সম্পদ, দান-অনুদান, সামাজিক প্রতিপত্তি, বয়স, পদক, ব্যবসায়িক সাফল্য, ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জনসংযোগ, সবই গুরুত্ব হারায় অপরাধের প্রমাণিত সত্যের সামনে।
২৩ জুন ২০২৬, মঙ্গলবার অরোরা সিটি মেয়র টম ম্রাকাস ঘোষণা দেন, কানাডার অন্যতম ধনী ব্যক্তি বিলিয়নিয়ার ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রোনাকের নাম Stronach Aurora Recreation Complex থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে। কয়েক দিন আগেই আদালত ৯৩ বছর বয়সী স্ট্রোনাককে যৌন নিপীড়ন ও শ্লীলতাহানিমূলক অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। সেই রায়ের পর অরোরা সিটির এই সিদ্ধান্ত শুধু একটি স্থাপনার নাম পরিবর্তনের ঘটনা নয়; এটি জনসম্মান, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়বোধের একটি তাৎপর্যপূর্ণ উদাহরণ। একই প্রেক্ষাপটে পাশের শহর নিউমার্কেটও Frank Stronach Park-এর নাম বদলে Veterans’ Park করার সিদ্ধান্ত নেয়।
ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রোনাক কোনো সাধারণ নাম নয়। তিনি কানাডার শিল্প ইতিহাসের এক আলোচিত অধ্যায়। অস্ট্রিয়ায় জন্ম নেওয়া এই অভিবাসী উদ্যোক্তা ১৯৫৭ সালে টরন্টোতে একটি ছোট টুল অ্যান্ড ডাই ব্যবসা শুরু করেন, যা পরে Magna International হয়ে ওঠে। অটো পার্টস শিল্পে Magna এক সময় কানাডার গর্বের নাম হয়ে দাঁড়ায়। স্ট্রোনাক শুধু ব্যবসায়ী নন, দাতা হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। শিক্ষা, কমিউনিটি, খেলাধুলা, স্বাস্থ্য, নানা ক্ষেত্রে তাঁর নাম যুক্ত হয়েছে। ১৯৯৯ সালে তিনি Order of Canada পান। তাঁর জীবন নিয়ে বক্তৃতা হয়েছে, প্রবন্ধ লেখা হয়েছে, তাঁকে উদ্যোক্তার রোল মডেল বলা হয়েছে। অরোরার মতো শহরে তাঁর নাম ছিল পরিচিত, প্রভাবশালী, প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু মানুষের জীবনের সব আলো যদি সত্য হয়, তবু অন্ধকার মুছে যায় না। আদালতের রায় সেই অন্ধকারের দিকেই আলো ফেলেছে।
১৯ জুন ২০২৬, শুক্রবার Ontario Superior Court-এর বিচারপতি Anne Molloy ফ্র্যাঙ্ক স্ট্রোনাককে দুই নারীর সঙ্গে সম্পর্কিত দুটি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করেন। এর একটি ছিল যৌন নিপীড়ন, অন্যটি ছিল শ্লীলতাহানিমূলক অপরাধ। অভিযোগের সূত্র ১৯৭০-এর দশক পর্যন্ত পেছনে যায়। ২০২৪ সালে Peel Regional Police তাঁকে মোট ১৮টি অভিযোগে অভিযুক্ত করে; পরে সেগুলো পৃথক বিচারপর্বে ভাগ হয়। আদালত সব অভিযোগে তাঁকে দোষী করেনি। এটিও ন্যায়বিচারের অংশ। যা প্রমাণিত নয়, সেখানে আদালত দোষী বলতে পারে না। কিন্তু যে দুটি অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে, সেগুলোই যথেষ্ট বড় নৈতিক ও সামাজিক প্রশ্ন তুলে ধরেছে।
অরোরা ও নিউমার্কেটের এ সিদ্ধান্তকে কেবল নাম বদলের প্রশাসনিক পদক্ষেপ মনে করলে ভুল হবে। এর ভেতরে আছে একটি সভ্য সমাজের নৈতিক বিবৃতি। কারণ রিক্রিয়েশন কমপ্লেক্স বা পাবলিক পার্ক কোনো ব্যক্তিগত ক্লাব নয়। সেখানে শিশু আসে, পরিবার আসে, তরুণ-তরুণী আসে, বয়স্ক মানুষ আসে। সেখানে খেলাধুলা হয়, সাঁতার শেখা হয়, কমিউনিটি মিটিং হয়, স্থানীয় মানুষ একে অন্যের সঙ্গে মেশে। এমন একটি জনস্থাপনার নাম যদি আদালতে দোষী সাব্যস্ত একজন ব্যক্তির নামে থাকে, তবে তা ভুক্তভোগীদের বেদনা, বিচারব্যবস্থার মর্যাদা এবং সমাজের নৈতিক অবস্থান, এই তিনটিকেই অস্বস্তিতে ফেলে।
দান একটি ভালো কাজ, কিন্তু দান কখনো অপরাধের কালিমা মুছে দিতে পারে না। কেউ কোটি টাকা দান করলে সেই দানের উপকার মানুষ পেতে পারে, কিন্তু তাতে তার নৈতিক দায় মুছে যায় না। মানুষের কষ্টের ওপর দাঁড়িয়ে কেউ দয়ালু সাজার অধিকার পায় না। বিশেষ করে যৌন অপরাধ, প্রতারণা, লুটপাট বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো অপরাধে দোষী হলে তার প্রতি সমাজের মূল্যায়ন নতুন করে করতেই হয়।
আমাদের সমাজে এমন দৃশ্য অচেনা নয়। কোনো ব্যক্তি প্রতারণা করেছে, মানুষের সম্পদ লুট করেছে, ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, নারীকে অপমান করেছে, এমনকি আদালতে দোষী সাব্যস্তও হয়েছে। কিন্তু কিছুদিন পর সে মসজিদে যাতায়াত শুরু করলেই অনেকে বলতে শুরু করে, লোকটি বদলে গেছে। সে দান-খয়রাত করে, সমাজসেবা করে, দাড়ি রাখে, টুপি পরে, হজ করেছে, ধর্মের কথা বলে, তাই তাকে আবার সমাজে জায়গা দেওয়া উচিত। কেউ তার অতীত অপরাধের কথা তুললে বলা হয়, তার তো শাস্তি হয়ে গেছে। আবার কেউ বলেন, এ তো পুরোনো ঘটনা। মানুষ ভুল করে, আল্লাহ ক্ষমাশীল, সমাজও ক্ষমা করা শিখুক।
ক্ষমা অবশ্যই মানবিক গুণ। কিন্তু তাই বলে তিনি সমাজের নেতৃত্বের আসনে বসবেন, এমন কোনো বিধান কোথাও নেই। আইনও একই কথা ভিন্ন ভাষায় বলে। আদালত কোনো ব্যক্তির জনপ্রিয়তা দেখে রায় দেয় না। বিচারকের সামনে দানপত্র, পদক, ব্যবসার পরিমাণ বা বয়স প্রধান বিবেচ্য নয়। সেখানে বিবেচ্য হলো অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে কি না, সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য কি না, অপরাধ ঘটেছে কি না। একজন দোষী ব্যক্তি আইনগত অধিকার পাবেন, আপিলের অধিকার পাবেন, মানবিক মর্যাদাও পাবেন। কিন্তু জনসম্মানের প্রতীক হয়ে থাকার প্রশ্নটি আলাদা। এই জায়গাটিই আমরা অনেক সময় ভুলে যাই।
আমাদের আরেকটি প্রবণতা হলো, কোনো ব্যক্তির চরিত্র নয়, তার লোকদেখানো কর্মকাণ্ড, ধর্মীয় আবরণ এবং দানের অঙ্ক দেখেই তাকে বিচার করা। কেউ মসজিদে টাকা দিলেন, মাদরাসায় দান করলেন, কমিউনিটির বড় স্পনসর হলেন, তখন অনেকে তাঁর অতীত অপরাধকে আড়াল করতে চান। কিন্তু নৈতিকতা এমন কোনো দাগ নয়, যা সাদা পোশাক, ধর্মীয় বুলি বা দানের চেক দিয়ে ঢেকে রাখা যায়। বরং অপরাধ ঢাকার জন্য ধর্ম ও সমাজসেবাকে ব্যবহার করা হলে ধর্মের মর্যাদা ছোট হয়, কমিউনিটিও কলঙ্কিত হয়।
আমাদের সমাজে এই শিক্ষা আরও জরুরি। আমরা অনেক সময় অপরাধীর চেয়ে অভিযোগকারীকে বেশি প্রশ্ন করি। ক্ষমতাবানের অপরাধকে ‘মানুষ মাত্রই ভুল করে’ বলে হালকা করি, আর দুর্বল মানুষের কষ্টকে ‘প্রমাণ কোথায়’ বলে সরিয়ে দিই। আদালত যদি প্রমাণের ভিত্তিতে কাউকে দোষী বলে, তবুও আমরা বলি, লোকটা অনেক ভালো কাজ করেছে। যেন ভালো কাজের যোগফল দিয়ে অপরাধের বিয়োগ করা যায়।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু আদালতের রায়ে নয়, রায়ের পর সমাজ কী করে, তাতেও প্রকাশ পায়। অরোরা আর নিউমার্কেটের সিদ্ধান্ত তাই কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হয়েই থাকে না; এটি আমাদের সমাজকেও প্রশ্ন করে। সব দেশ, সব সমাজের জন্য এর ভেতরে আছে এক নৈতিক শিক্ষা। মনে রাখতে হবে, অর্থের চেয়ে ন্যায় বড়, দানের চেয়ে চরিত্র বড়, আর নামফলকের চেয়ে মানুষের মর্যাদা অনেক বড়।
তথ্যসূত্র:
Global News, ১৯ জুন ২০২৬
NewmarketToday, ২৪ জুন ২০২৬









