প্রেসিডেন্ট নির্বাচন: ফল নিয়ে ঝামেলায় যা হতে পারে

ওয়াশিংটন, ৪ নভেম্বর- দোদুল্যমান বেশ কয়েকটি রাজ্যের ভোট গণনা শেষ হওয়ার আগেই রিপাবলিকান ডনাল্ড ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে নিজেকে বিজয়ী ঘোষণা করেছেন।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, পেনসিলভেইনিয়া, উইসকনসিন, জর্জিয়া, মিশিগান বা নর্থ ক্যারোলাইনার মতো রাজ্যগুলোর ভোটের ফলের উপরই কে হতে যাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রেসিডেন্ট তা নির্ভর করছে।
এ রাজ্যগুলোতে ভোট গণনা খুব ধীরে চলছে; বলা হচ্ছে, ডাকযোগে পাঠানো ভোট গুনতেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত দেরি।
ট্রাম্প অবশ্য এই ভাষ্য মানতে পারছেন না; তার আশঙ্কা, ভোটে কারচুপির চেষ্টা হচ্ছে। সে কারণে তড়িঘড়ি নিজের জয় ঘোষণা করে বসেছেন তিনি।
তার ঘোষণাকে প্রত্যাখ্যান করে ডেমোক্র্যাটরা বলছে, সব ভোটই গুণতে হবে এবং তাদের বিশ্বাস তারাও ‘জয়ের পথেই’ আছে।
নির্বাচনের ফলকে বিতর্কিত করার উদ্দেশ্যে ট্রাম্প আগেভাগে জয় ঘোষণা করতে পারেন বলে কয়েক সপ্তাহ ধরেই ডেমোক্র্যাটরা বলে আসছিল। শেষ পর্যন্ত তাদের আশঙ্কাই সত্য প্রমাণিত হল।
এখন যদি সত্যি সত্যিই দুই দল নিজেদের বিজয়ী দাবি করে তাহলে কি হবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ফল নিয়ে এ ধরনের ঝামেলা বাধলে যুক্তরাষ্ট্রে নানান ধরনের আইনি ও রাজনৈতিক নাটকীয়তার দেখা মিলতে পারে। সমাধানে পৌঁছাতে তখন সুপ্রিম কোর্ট, বিভিন্ন রাজ্যের প্রতিনিধি এবং কংগ্রেসের মিলিত সমাধানের দ্বারস্থ হতে হবে।
মামলা যাবে সুপ্রিম কোর্টে
আগাম ভোটের তথ্য অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা রিপাবলিকানদের তুলনায় ডাকযোগে বেশি ভোট দিয়েছেন। পেইনসিলভেইনিয়া এবং উইসকনসিনের মতো রাজ্যগুলোতে নির্বাচনের দিনের আগে ‘মেইল-ইন’ ভোট গণনা শুরু করা যায় না।
এখন এসব রাজ্যে যদি হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয় এবং ব্যবধান হয় খুবই সামান্য তখন ভোট এবং ব্যালট গণনা নিয়ে মামলা হতে পারে।
আলাদা আলাদা রাজ্যে হওয়া সেসব মামলা স্বাভাবিকভাবেই তখন যাবে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে। যেমনটা হয়েছিল ২০০০ সালে। সেবার শেষ পর্যন্ত জর্জ ডব্লিউ বুশ ডেমোক্র্যাট আল গোরকে ফ্লোরিডায় মাত্র ৫৩৭ ভোটে হারিয়েছিলেন।
এবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সংক্রান্ত কোনো মামলা সুপ্রিম কোর্টে গেলে রায় শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের দিকে হেলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা ডেমোক্র্যাটদের।
নির্বাচনের মাত্র কয়েকদিন আগে ট্রাম্প বিচারক হিসেবে অ্যামি কনি বেরেটকে নিয়োগ দিয়েছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আদালতে রক্ষণশীলদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা এখন ৬-৩।
ইলেকটোরাল কলেজ
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হন না। তিনি নির্বাচিত হন রাজ্যগুলোর জন্য নির্ধারিত ইলেকটরদের ভোটের মাধ্যমে।
মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট হতে হলে কোনো প্রার্থীকে অবশ্যই ৫৩৮টি ইলেকটোরাল কলেজ ভোটের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে হবে। ২০১৬ সালের নির্বাচনে যেমন ট্রাম্প পপুলার ভোট হিলারি ক্লিনটনের চেয়ে কম পেয়েও ৩০৪টি ইলেকটোরাল ভোট ব্যাগে পুরে হোয়াইট হাউসে যেতে পেরেছিলেন। সেবার পপুলার ভোট বেশি পেলেও হিলারি জিতেছিলেন মাত্র ২২৭টি ইলেকটোরাল ভোট।
বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কোনো প্রার্থী কোনো রাজ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে সেই রাজ্যের সব ইলেকটোরাল ভোটই তার হয়। চলতি বছর ১৪ ডিসেম্বর ইলেকটরদের একত্রিত হয়ে পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করার কথা রয়েছে। এরপর ৬ জানুয়ারি কংগ্রেসের উভয় কক্ষ মিলিত হয়ে ইলেকটরদের ভোট পর্যালোচনা করবে এবং পরবর্তী প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা করবে।
সাধারণত, গভর্নররাই ভোটের ফল সত্যায়িত করেন এবং পরে কংগ্রেসে পাঠান।
কিন্তু কোনো রাজ্যের ভোটের ফল নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলে এবং সেখানকার গভর্নর ও আইনসভা পৃথক দুটি ফল কংগ্রেসকে পাঠালে সৃষ্টি হতে পারে গোলযোগ। এক্ষেত্রে কংগ্রেস কি গভর্নরের দেওয়া ফল গ্রহণ করবে, নাকি ওই রাজ্যের ইলেকটরদেরকে হিসাবের বাইরে রাখবে তা নিয়েও অচলাবস্থা সৃষ্টি হতে পারে বলে ধারণা অনেক আইন বিশেষজ্ঞের।
যে রাজ্যগুলোর ভোটের ফলের উপর ট্রাম্প-বাইডেনের ভাগ্য ঝুলছে, তার মধ্যে পেনসিলভেইনিয়া, মিশিগান, উইসকনসিন এবং নর্থ ক্যারোলাইনাতে এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এ ৪ রাজ্যেরই গভর্নর ডেমোক্র্যাট, আইনসভা রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে।
২০০০ সালের নির্বাচনে সুপ্রিম কোর্ট বুশ ও আল গোরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর আগে রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত ফ্লোরিডার আইনসভা আলাদা ইলেকটর তালিকা জমা দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিল।
১৮৭৬ সালেও তিনটি রাজ্য এরকম ‘ডুয়েলিং ইলেকটর’ মনোনয়ন দিয়েছিল; যে কারণে পরের বছর কংগ্রেসবে ইলেকটোরাল কাউন্ট অ্যাক্ট নামে একটি আলাদা আইনও পাস করতে হয়।
এ আইন অনুযায়ী, কংগ্রেসের দুটি কক্ষ তখন রাজ্যগুলোর পাঠানো ‘ডুয়েলিং ইলেকটরের’ তালিকা পর্যবেক্ষণ করে কাদের স্বীকৃতি দেওয়া যায় সে সিদ্ধান্ত নেবে। কিন্তু কংগ্রেসের দুই কক্ষ দুই দলের নিয়ন্ত্রণে থাকায় এবার এক্ষেত্রেও ঝামেলা বেধে যেতে পারে। দেখা যাবে দুই কক্ষ আলাদা আলাদা ইলেকটরের তালিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এমনটা হলে, সমাধান কীভাবে হবে তা এখনও বোঝা যাচ্ছে না
ইলেকটোরাল কাউন্ট অ্যাক্টে প্রতিটি রাজ্যের ‘নির্বাহীদের’ মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। অনেকে এই ‘নির্বাহী’ বলতে রাজ্যগুলোর গভর্নরকে বুঝলেও আইন বিশেষজ্ঞদের অনেকেই তা মানতে নারাজ। এ ধরনের পরিস্থিতি আগে কখনো সৃষ্টি না হওয়ায় আইনটির বিভিন্ন খুঁটিনাটি স্পষ্ট হয়নি বলেও মত অনেকের।
কেউ কেউ বলছেন, কংগ্রেসের দুই কক্ষ যদি ইলেকটরদের তালিকা নিয়ে একমত না হয়, সেক্ষেত্রে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স সিনেটের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওই রাজ্যগুলোর ইলেকটোরাল ভোট বাতিল করে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
এক্ষেত্রে কোনো প্রার্থীর প্রেসিডেন্ট হতে ২৭০ ইলেকটোরাল ভোট লাগবে, নাকি আরও কম হলেও হবে ইলেকটোরাল কলেজ অ্যাক্টে সে সম্বন্ধে স্পষ্ট করে কিছু বলা হয়নি।
কংগ্রেসে এরকম কোনো অচলাবস্থা সৃষ্টি হলে বিভিন্ন দল সুপ্রিম কোর্টেরও দ্বারস্থ হতে পারে; যদিও কীভাবে ইলেকটোরাল ভোট গণনা করা উচিত সে বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট কোনো সিদ্ধান্ত দেবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে।
কন্টিনজেন্ট ইলেকশন
কোনো প্রার্থী যদি শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ইলেকটোরাল ভোট নিশ্চিত করতে না পারে সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের ১২তম সংবিধান অনুযায়ী ‘কন্টিনজেন্ট ইলেকশন’ও হতে পারে। এক্ষেত্রে প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করবে, সিনেট ঠিক করবে ভাইস প্রেসিডেন্ট।
এই ‘কন্টিনজেন্ট’ নির্বাচনে প্রতিটি রাজ্যের প্রতিনিধি সদস্যদের একটি করে ভোট থাকবে। এখন পর্যন্ত ৫০টি রাজ্যের ২৬টিরই ‘স্টেট ডেলিগেশন’ রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণে; ২২টির নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে, একটি দ্বিধাবিভক্ত আর অন্য একটিতে ৭ ডেমোক্র্যাট, ৬ রিপাবলিক ও একজন লিবার্টারিয়ান আছে।
তবে যত ঝামেলাই সৃষ্টি হোক না কেন, সবকিছুই আগামী বছরের ২০ জানুয়ারির আগে ফয়সালা করে নিতে হবে। মার্কিন সংবিধানের বাধ্যবাধকতা অনুযায়ী, সেদিন আগের প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ হবে, শুরু হবে নতুন প্রেসিডেন্টের।
প্রেসিডেন্সিয়াল সাকসেশন অ্যাক্ট অনুযায়ী, কংগ্রেস যদি ওই দিনের মধ্যে নতুন প্রেসিডেন্ট কিংবা ভাইস প্রেসিডেন্টের নাম ঘোষণা করতে না পারে তাহলে প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার প্রেসিডেন্টের ভারপ্রাপ্ত দায়িত্ব পাবেন।
মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদের এখনকার স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি, তিনি ডেমোক্র্যাট, ক্যালিফোর্নিয়া থেকে নির্বাচিত।
সূত্র: বিডিনিউজ
আর/০৮:১৪/৪ নভেম্বর









