মধ্যপ্রাচ্য

১০ দিনে চার নির্বাচনে ধাক্কা খেল ইসরায়েল, বাড়ছে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা

ইসরায়েল

তেল আবিব,০৬ নভেম্বর-মাত্র ১০ দিনের ব্যবধানে চারটি নির্বাচনে পরাজয়ের মুখে পড়েছে ইসরায়েল। এর মধ্যে একটি ছিল দেশটির নিজেদের নির্বাচন। বাকি তিনটি নির্বাচনের ফলও ইসরায়েলের কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষ করে সার্বিয়া, ব্রাজিল ও যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনের ফল মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ইসরায়েলের অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

জেরুজালেম পোস্টের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ২৫ অক্টোবর সার্বিয়ার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের পরাজয়ের এই ধারার শুরু হয়। সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেকজান্ডার ভুচিচ ক্ষমতা ধরে রাখতে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে উঠে আসা শিক্ষার্থীদের সমর্থিত একটি নির্বাচনী জোটের কাছে তার জোট হেরে যায়।

ভুচিচ ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। বিশেষ করে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলার পর পশ্চিমা কয়েকটি দেশ অস্ত্র সরবরাহ সীমিত করলেও সার্বিয়া ইসরায়েলকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহে সহযোগিতা করে। হামলার পরদিনই গোলাবারুদ চেয়ে সার্বিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল ইসরায়েল। এরপর সার্বিয়া আকাশপথে ইসরায়েলে ১৫৫ মিলিমিটার কামানের গোলা পাঠাতে শুরু করে।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভুচিচের সঙ্গে ফোনে কথা বলার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাকে ‘ইসরায়েলের প্রকৃত বন্ধু’ বলে উল্লেখ করেছিলেন। সার্বিয়ার সঙ্গে ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাও ছিল বেশ শক্তিশালী।

২০২৫ সালের আগস্টে ইসরায়েলের কাছ থেকে ড্রোন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম কিনতে ১৬০ কোটি ডলারের চুক্তি করে সার্বিয়া। পরে বেলগ্রেডে ইসরায়েলি নকশায় তৈরি ড্রোন সংযোজনের একটি কারখানাও চালু করা হয়। তবে নির্বাচনে ভুচিচের জোট হেরে যাওয়ায় দুই দেশের প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কারণ, নির্বাচনে জয়ী শিক্ষার্থী-সমর্থিত জোট যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র রপ্তানি বন্ধ করার অঙ্গীকার করেছে।

এরপর ব্রাজিলের নির্বাচনেও ধাক্কা খায় ইসরায়েল। দেশটির বামপন্থী প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা ডানপন্থী প্রার্থী ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করেন। ইসরায়েলের আশা ছিল, বলসোনারো জয়ী হলে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ হবে। কিন্তু লুলা আবারও নির্বাচিত হওয়ায় সেই সম্ভাবনা অনেকটাই শেষ হয়ে গেছে।

এর আগে ব্রাজিলের সাবেক প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সহযোগিতা বাড়িয়েছিলেন। জাতিসংঘেও ইসরায়েলের পক্ষে ব্রাজিলের অবস্থান পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি। অন্যদিকে, আবার ক্ষমতায় ফিরে লুলা ইসরায়েলের নীতির কঠোর সমালোচনা করেন।

গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে হলোকাস্টের সঙ্গে তুলনা করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে দক্ষিণ আফ্রিকার করা গণহত্যার মামলার প্রতিও সমর্থন জানায় ব্রাজিল। দেশটি ইসরায়েলে নিযুক্ত নিজেদের রাষ্ট্রদূতকেও প্রত্যাহার করে নেয়।

বিদেশে একের পর এক ধাক্কার পর নিজেদের নির্বাচনেও স্পষ্ট কোনো বিজয়ী পায়নি ইসরায়েল। নির্বাচনে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি সবচেয়ে বড় দল হিসেবে অবস্থান ধরে রাখলেও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। অন্যদিকে, নেতানিয়াহুবিরোধী দলগুলোও সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পাওয়ার দাবি জানিয়েছে। ফলে দেশটিতে আবারও রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে পাঁচটি নির্বাচন আয়োজনের পর ইসরায়েল যে রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে পড়েছিল, নতুন নির্বাচনের ফল সেই পরিস্থিতি আবারও ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে। জোট সরকার গঠন নিয়ে দীর্ঘ দর-কষাকষি শুরু হলে দেশটির প্রশাসনিক কাজকর্ম ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। নির্বাচিতদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত মিশিগানের আবদুল এল-সায়েদও।

এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ইসরায়েলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া, অস্ত্র বিক্রি এবং দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক বাড়তে পারে। ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরে ইসরায়েলবিরোধী অবস্থানের সমর্থনও আগের তুলনায় আরও শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শুধু ডেমোক্র্যাটদের মধ্যেই নয়, রিপাবলিকানদের মধ্যেও নির্বাচনী বিপর্যয়ের জন্য ইসরায়েলের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সংঘাত এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পৃক্ততার কারণে জীবনযাত্রার খরচ বেড়েছে বলে অভিযোগ করছেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠদের কেউ কেউ।

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি জরিপের তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সমর্থন করা কিছু ভোটার এবার ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। তাদের এই সিদ্ধান্তের পেছনে ইরানের যুদ্ধ বন্ধ করা, জীবনযাত্রার ব্যয়, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্কের পরিবর্তনের মতো বিষয় কাজ করেছে।

ইসরায়েলের জন্য পরিস্থিতি দিন দিন আরও জটিল হয়ে উঠছে। একদিকে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক মিত্রদের নির্বাচনে পরিবর্তন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ধরে রাখা নেতানিয়াহু সরকারের জন্য কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন কংগ্রেস আগামী ৩ জানুয়ারি দায়িত্ব নেবে। এর আগেই ইসরায়েলকে একটি স্থিতিশীল সরকার গঠন করতে হবে। তা না হলে ওয়াশিংটনের নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে দেশটিকে আরও বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হতে পারে।

এস এম/ ০৬ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language