উত্তর আমেরিকা

ইরানের তেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এড়াতে সহায়তার অভিযোগে ভারতীয় দম্পতির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা

তেল রপ্তানি

ওয়াশিংটন, ০৫ নভেম্বর-ইরানের তেল রপ্তানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সহায়তা করার অভিযোগে ভারতীয় এক ব্যবসায়ী দম্পতি এবং তাদের সঙ্গে যুক্ত বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। বুধবার (৪ নভেম্বর) মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’-এর আওতায় এ পদক্ষেপের ঘোষণা দেয়।

ইরানি তেল বহনকারী জাহাজগুলোকে ‘ভুয়া পতাকা’ (ফলস ফ্ল্যাগ) ও জাল সামুদ্রিক সনদপত্র দেওয়ার একটি নেটওয়ার্ক শনাক্ত এবং তাদের কার্যক্রম বন্ধ করার লক্ষ্যেই ওয়াশিংটন এই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় রয়েছেন চণ্ডীগড়ভিত্তিক ব্যবসায়ী সুনীল কুমার শর্মা ও তার স্ত্রী জাসপ্রীত প্রীতি শহীদ। এ ছাড়া তাদের সঙ্গে যুক্ত ভারতের বেশ কয়েকটি কোম্পানিও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় এসেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই দম্পতি এমন একটি নেটওয়ার্ক পরিচালনা করতেন, যেখান থেকে ইরানি জ্বালানি তেল বহনকারী জাহাজগুলোকে ভুয়া নিবন্ধন ও সনদপত্র দেওয়া হতো। এ ছাড়া দম্পতির সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিযোগে আরও দুই ভারতীয় নাগরিক অশ্বনী কুমার ধীমান ও ইশভিন্দর সিংয়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তারা শর্মার নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি কোম্পানির পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মার্কিন অর্থ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শর্মা ও শহীদ চণ্ডীগড় থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। বছরের পর বছর ধরে তারা বিভিন্ন দেশের কর্তৃপক্ষের পরিচয় ব্যবহার করে ভুয়া সামুদ্রিক নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নেটওয়ার্ক এমন কিছু ওয়েবসাইট তৈরি করেছিল, যেখানে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারের অনুমোদন ছাড়াই জাহাজ নিবন্ধন, পতাকা প্রদান, নাবিকদের প্রশিক্ষণ এবং জাহাজের শ্রেণিবিভাগের মতো সেবা দেওয়ার দাবি করা হতো। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অভিযোগ, ২০১৪ সাল থেকে এই দম্পতি ক্যারিবীয় দেশ ডোমিনিকার সামুদ্রিক পতাকা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের পরিচয় ব্যবহার করার চেষ্টা করেছিলেন।

২০২৩ সালে শর্মা সিঙ্গাপুরভিত্তিক ‘এসওয়াতিনি মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল শিপ রেজিস্ট্রি প্রাইভেট লিমিটেড’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। যদিও এসওয়াতিনির কর্তৃপক্ষ প্রকাশ্যে জানিয়েছিল, এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক নেই, তারপরও প্রতিষ্ঠানটি ইরানি তেলবাহী জাহাজগুলোকে নিবন্ধন সেবা দিয়ে যাচ্ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ বিভাগ এমন কিছু ওয়েবসাইটও শনাক্ত করেছে, যেগুলো আরুবা, গায়ানা, মালি, মোজাম্বিক, মালাউই, সিন্ট মার্টেন এবং তিমুর-লেস্তের মতো দেশ ও অঞ্চলের হয়ে সামুদ্রিক নিবন্ধন সেবা দেওয়ার মিথ্যা দাবি করত। অভিযোগ রয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা বেশ কয়েকটি জাহাজ এই ভুয়া নিবন্ধন ব্যবস্থা ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ইরানি তেল পরিবহন অব্যাহত রেখেছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার মুখে একাধিক ভারতীয় কোম্পানি

নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা ভারতীয় কোম্পানিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘ওশেনিক টেকনোলজিস ইন্ডিয়া’। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শর্মা। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, এই কোম্পানিকে ব্যবহার করে ভুয়া জাহাজ নিবন্ধন ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এর মধ্যে আরুবা, নিকারাগুয়া ও সিন্ট মার্টেনের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করা নিবন্ধনও ছিল।

শহীদের সঙ্গে কথিত সম্পর্কের কারণে ‘আর্যাবর্ত শিপ ম্যানেজমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড’ নামের আরেকটি কোম্পানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ধীমান ও সিং এই কোম্পানির হয়ে কাজ করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় আসা অন্য ভারতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রিসেপ্ট ট্রেন্ডস প্রাইভেট লিমিটেড, পলিনেশিয়া মেরিটাইম প্রাইভেট লিমিটেড, অ্যালেক্সারিয়া ফিনসার্ভ প্রাইভেট লিমিটেড, অ্যালেক্সারিয়া মিডিয়া অ্যান্ড এন্টারটেইনমেন্ট প্রাইভেট লিমিটেড, বিহারাবোটিং প্রাইভেট লিমিটেড এবং আর্যাবর্ত মেরিটাইম অ্যান্ড এডুকেশনাল ট্রাস্ট।

মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, শর্মার কর্মকাণ্ড বেশি নজরে আসতে শুরু করলে শহীদ এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত কয়েকটি ব্যবসার ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেন। অন্তত কাগজে-কলমে তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বে ছিলেন।

মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন, যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান নিজেদের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ইরানের শাসনব্যবস্থাকে সহায়তা করে যাচ্ছে, ওয়াশিংটন তাদের লক্ষ্যবস্তু করবে। ট্রেজারি বিভাগ বলেছে, জাল জাহাজ নিবন্ধনের মাধ্যমে জাহাজগুলো নাবিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং পরিবেশের ক্ষতি ঠেকাতে তৈরি আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন এড়িয়ে চলতে পারে।

এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের আইনগত এখতিয়ারভুক্ত এলাকায় থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ এবং আর্থিক স্বার্থ জব্দ করা হবে। মার্কিন নাগরিক ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য তাদের সঙ্গে যেকোনো ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে ট্রেজারি বিভাগের ‘অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল’ থেকে বিশেষ অনুমতি থাকলে এ নিষেধাজ্ঞার ব্যতিক্রম হতে পারে।

নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে অন্তত ৫০ শতাংশ মালিকানা রয়েছে, এমন অন্য কোম্পানির ক্ষেত্রেও এই বিধিনিষেধ কার্যকর হতে পারে। ট্রেজারি বিভাগ জানিয়েছে, মার্কিন নাগরিক বা প্রতিষ্ঠান নয়—এমন কোনো ব্যক্তি বা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও যদি মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন করে এমন লেনদেনে সহায়তা করে অথবা অন্য কাউকে নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যেতে সাহায্য করে, তাহলে তাদেরও কঠোর পরিণতির মুখে পড়তে হতে পারে।

এর আগে চলতি মাসের শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের গোপন তেলবাহী ট্যাঙ্কার বহরের বাকি অংশগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। বিদেশে ইরানি তেল পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত এই বহরে ১৭টি জাহাজ রয়েছে।

এস এম/ ০৫ নভেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language