নির্বাচনের ফল মেনে নিয়ে ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে চান ট্রাম্প, হারার কারণ বললেন নিজের নাম না থাকা

ওয়াশিংটন, ০৪ নভেম্বর-মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার রাতে বলেছেন, তিনি মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেবেন এবং ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত আছেন। তিনি আরও দাবি করেছেন, ব্যালটে তার নাম না থাকায় রিপাবলিকান পার্টি নির্বাচনে হেরেছে। ডেমোক্রেটিক পার্টি যখন মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পথে, তখন এসব কথা বলেন তিনি।
হোয়াইট হাউসে বসে নির্বাচনের ফলাফল দেখার সময় নিউইয়র্ক টাইমসকে টেলিফোনে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, ‘আমি এই ফলাফল পুরোপুরি মেনে নিতে প্রস্তুত।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করব এবং তাদের সঙ্গে কাজ করার জন্য ইতিবাচকভাবেই অপেক্ষা করছি। সম্ভবত আমরা কোনো না কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে পারব।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় ধাক্কা খাওয়ার পর ট্রাম্পের কাছ থেকে এমন মন্তব্য এলো। ডেমোক্র্যাটদের এই অগ্রযাত্রা ওয়াশিংটনের ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিতে পারে। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্টের মেয়াদের বাকি সময়ে আইন প্রণয়নের লক্ষ্যগুলোও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
রিপাবলিকানদের পরাজয়ের কারণ হিসেবে ট্রাম্প ব্যালটে নিজের নাম না থাকাকে দায়ী করেছেন। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়ানোর সিদ্ধান্তকে তিনি ‘অত্যন্ত বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত’ বলে উল্লেখ করেছেন।
সাউথ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান সিনেটর ডার্লিন গ্রাহাম এবং টেক্সাসের রিপাবলিকান অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনের মতো প্রার্থীদের সমর্থন দেওয়া নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই বলেও জানান ট্রাম্প। তারা দুজনই সিনেট নির্বাচনে পরাজিত হয়েছেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদককে ট্রাম্প বলেন, ‘আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতেই আমি ফলাফলগুলো দেখছি। দেখলাম ডার্লিন হেরে গেছেন। ভাবা যায়! আচ্ছা, লিন্ডসে যদি নির্বাচনে দাঁড়াতেন, তাহলে কেমন করতেন বলে আপনার মনে হয়?’ গত জুলাই মাসে মারা যাওয়া সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের কথা উল্লেখ করে তিনি এ প্রশ্ন করেন।
ট্রাম্প আরও বলেন, তার বিশ্বাস, লিন্ডসে গ্রাহাম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলে সম্ভবত জয়ী হতেন।
নিউইয়র্ক টাইমসের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত এই ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে বেশ নিষ্প্রভ শোনাচ্ছিল। দেশজুড়ে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়ের খবরগুলো তখন তিনি কেবলই আত্মস্থ করছিলেন।
তবে রিপাবলিকানদের পরাজয় সত্ত্বেও নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দুই বছরের কোনো কিছু নিয়েই বিন্দুমাত্র অনুশোচনা নেই বলে জোর দিয়ে জানান ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘যেকোনো প্রেসিডেন্টের ইতিহাসে এই সময়টিকে আমি সবচেয়ে সফল দুই বছর বলে মনে করি।’
গত এক বছর ধরে নির্বাচনব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে মানুষের মনে সন্দেহ তৈরির ধারাবাহিক প্রচেষ্টার পর অবশেষে নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন ট্রাম্প। এমনকি মঙ্গলবারও মার্কিন হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিভাগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক বার্তা দিয়ে অ-নাগরিক ভোটারদের গ্রেপ্তারের হুঁশিয়ারি দেয়। যদিও বাস্তবে এমন ভোটার খুঁজে পেতে প্রশাসনকে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে।
মঙ্গলবার রাতে হোয়াইট হাউসের ইস্ট রুমে কয়েকজন শীর্ষ সহযোগীকে নিয়ে বসে নির্বাচনের ফলাফল দেখার পর এসব মন্তব্য করেন প্রেসিডেন্ট। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অ্যাটর্নি জেনারেল টড ব্ল্যাঞ্চ এবং বাণিজ্যমন্ত্রী হাওয়ার্ড লুটনিক। উপস্থিত কয়েকজন সেখানকার পরিবেশকে ‘অন্ধকারাচ্ছন্ন’ ও ‘শোকাবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন।
সন্ধ্যাজুড়ে নিজের রাজনৈতিক উপদেষ্টাদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেন ট্রাম্প। ব্যক্তিগত ওই কথোপকথনের বিষয়ে জানেন এমন ব্যক্তিরা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, নির্বাচনের আগে জনমত জরিপ সম্পর্কে তাকে ভুল তথ্য দেওয়ার জন্য উপদেষ্টাদের দায়ী করেন তিনি।
তবে ট্রাম্প ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। কারণ, তার উপদেষ্টারা এর আগেই রিপাবলিকানদের জন্য প্রতিকূল নির্বাচনি পরিস্থিতির কথা প্রকাশ্যে বলেছিলেন।
অবশ্য হোয়াইট হাউসের একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রেসিডেন্ট তার উপদেষ্টাদের ওপর ক্ষুব্ধ ছিলেন—এমন ধারণা সঠিক নয়।
নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আবারও বলেন, ব্যালটে তার নাম না থাকার কারণেই রিপাবলিকানদের এমন পরাজয় হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি নির্বাচনে প্রার্থী ছিলাম না। আর আমি প্রার্থী না থাকার কারণেই আমরা পর্যাপ্ত মানুষকে ভোটকেন্দ্রে আনতে পারিনি।’
এ ছাড়া মঙ্গলবার রাতে নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টেও ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ব্যালটে আমার নাম ছিল না। যদি থাকত, তাহলে আমরা ভূমিধস জয় পেতাম! বিষয়টিতে মনোযোগ দেওয়ার জন্য আপনাদের ধন্যবাদ।’
এদিকে নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও বলেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে তার কোনো অনুশোচনা নেই। সুযোগ পেলে তিনি ‘আবারও তা-ই’ করবেন। তবে জ্বালানি তেলের দাম নিয়ে ভোটাররা অসন্তুষ্ট ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে তাদের আপত্তি নেই, কিন্তু তারা সম্ভবত তেলের দাম নিয়ে খুশি ছিল না। আসলে এমনটা হতেই পারে। কিন্তু ওই সিদ্ধান্তের জন্য আমার বিন্দুমাত্র আফসোস নেই। বরং দেশ ও বিশ্বের ভবিষ্যতের জন্য এটি ছিল অত্যন্ত বিচক্ষণ একটি সিদ্ধান্ত।’
ট্রাম্প দাবি করেন, একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে কথা বলতে ডেমোক্র্যাটরা ইতিমধ্যে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। তবে কারা যোগাযোগ করেছেন, সে বিষয়ে তিনি কারও নাম প্রকাশ করতে চাননি। সরকারের ঋণসীমা নির্ধারণের বিষয়েও ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে একযোগে কাজ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমার হাতে পূর্ণ ভেটো ক্ষমতা রয়েছে, তাই তাদের আমাদের কাছেই আসতে হবে। আর তাদের কাছে যদি ভালো কোনো প্রস্তাব থাকে, তাহলে একসঙ্গে কাজ করার ব্যাপারে আমি অবশ্যই উদার।’
এস এম/ ০৪ নভেম্বর ২০২৬







