ভারতের প্রথম দেশীয় প্রযুক্তির বুলেট ট্রেন তৈরি হচ্ছে বেঙ্গালুরুতে

দিল্লি,০৫ নভেম্বর=উচ্চগতির রেল যোগাযোগের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আরও এক ধাপ এগিয়েছে ভারত। দেশটির প্রথম নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি বুলেট ট্রেনের নির্মাণকাজ চলছে বেঙ্গালুরুর ভারত আর্থ মুভার্স লিমিটেডে (বিইএমএল)। মুম্বাই-আহমেদাবাদ হাইস্পিড রেল করিডরে চলাচলের জন্য তৈরি করা হচ্ছে এই ট্রেন।
রেল মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারতের আবহাওয়া ও পরিবেশের কথা মাথায় রেখে ট্রেনটির নকশা তৈরি করা হয়েছে। এতে দেশীয় প্রকৌশল প্রযুক্তির পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি, যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচলের সুবিধার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আটটি কোচের এই ট্রেনটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০২ মিটার। পরীক্ষামূলকভাবে এর সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ২৮০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে বাণিজ্যিকভাবে চলাচলের সময় এর গতি থাকবে ঘণ্টায় ২৪৯ কিলোমিটার। ট্রেনটিতে একসঙ্গে ৫৫৭ জন যাত্রী ভ্রমণ করতে পারবেন। এর মধ্যে প্রতিবন্ধী এবং চলাচলে সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এমন যাত্রীদের জন্য দুটি নির্দিষ্ট জায়গা রাখা হবে।
আটটি কোচের মধ্যে চারটি হবে মোটরচালিত এবং বাকি চারটি ট্রেলার কোচ। সাতটি কোচে থাকবে সাধারণ শ্রেণির আসন। এসব আসন ৩×২ বিন্যাসে সাজানো হবে। অন্য একটি কোচে থাকবে নির্বাহী শ্রেণির আসন, যেখানে আসন সাজানো হবে ২×২ বিন্যাসে।
ট্রেনের দুই প্রান্তে চালকের কেবিন থাকবে। সেখানে থাকবে বুদ্ধিমান অনবোর্ড নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা। এর মাধ্যমে চালক প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন এবং অপারেশন কন্ট্রোল সেন্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবেন। প্রয়োজন হলে দুটি আট কোচের ট্রেন জুড়ে ১৬ কোচের ট্রেন হিসেবেও চালানো যাবে।
যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্যের কথা বিবেচনা করে বিশেষভাবে আসন তৈরি করা হয়েছে। ভারতীয়দের শারীরিক গড়ন বিবেচনায় রেখেই আসনগুলোর নকশা করা হয়েছে। এ ছাড়া থাকবে এলইডি বাতি, মাথার ওপর মালপত্র রাখার তাক, অতিরিক্ত লাগেজ রাখার জায়গা এবং ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন চার্জ দেওয়ার জন্য বিদ্যুতের সংযোগ।
ট্রেনটির বড় জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখা যাবে। পাশাপাশি কোচগুলোর মধ্যে সংযোগপথ এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে যাত্রীরা সহজেই এক কোচ থেকে অন্য কোচে যেতে পারেন।
ট্রেনটিতে থাকবে বায়ো-ডাইজেস্টার টয়লেট, ওয়াই-ফাইভিত্তিক বিনোদনব্যবস্থা এবং এলসিডি পর্দায় যাত্রীদের জন্য তথ্য দেখানোর সুবিধা। ইংরেজি, হিন্দি ও আঞ্চলিক ভাষায় এসব তথ্য পাওয়া যাবে। প্রয়োজনীয় তথ্য জানাতে থাকবে পাবলিক অ্যাড্রেস সিস্টেম ও স্বয়ংক্রিয় ঘোষণার ব্যবস্থা। জরুরি প্রয়োজনে ট্রেনের কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য বিশেষ টক-ব্যাক ইউনিটও রাখা হবে।
প্রতিবন্ধী ও চলাচলে সীমাবদ্ধতা রয়েছে—এমন যাত্রীদের সুবিধার বিষয়টিও ট্রেনটির নকশায় গুরুত্ব পেয়েছে। প্ল্যাটফর্মের উচ্চতার সঙ্গে কোচের মেঝের উচ্চতা সমন্বয় করে সহজে ওঠানামার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ট্রেন ও প্ল্যাটফর্মের মধ্যকার ফাঁকা জায়গা কমাতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রসারিত ও সংকুচিত হতে পারে এমন সিঁড়ি থাকবে।
হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীদের সুবিধার জন্য উপযোগী দরজা, নির্ধারিত আসন ও টয়লেট রাখা হবে। পাশাপাশি ব্রেইল পদ্ধতিতে লেখা নির্দেশনাও থাকবে, যাতে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী যাত্রীরা প্রয়োজনীয় তথ্য বুঝতে পারেন।
প্রতিটি কোচে তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য দুটি করে হিটিং, ভেন্টিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং (এইচভিএসি) ইউনিট থাকবে। শব্দ নিরোধক ব্যবস্থা, শব্দ কমানোর বিশেষ আবরণ, বগির কাভার এবং বায়ুগতিবিদ্যার উপযোগী নকশা ট্রেনের শব্দ ও কম্পন কমাতে সাহায্য করবে।
ট্রেনটিতে ২৫ কিলোভোল্ট, ৫০ হার্টজের একক-ফেজ এসি বিদ্যুৎচালিত ব্যবস্থা ব্যবহার করা হবে। এতে থাকবে পুনরুৎপাদনমূলক ব্রেকিং প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ট্রেনের গতি কমানোর সময় উৎপন্ন শক্তি পুনরুদ্ধার করে আবার বিদ্যুৎব্যবস্থায় সরবরাহ করা হবে। এতে বিদ্যুতের ব্যবহার আরও সাশ্রয়ী হবে।
ট্রেনের গতি ও বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে বিশেষ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এ জন্য কম্পিউটেশনাল ফ্লুইড ডাইনামিকস (সিএফডি) সিমুলেশনের মাধ্যমে ট্রেনের সামনের অংশ এবং মূল কাঠামোর নকশা উন্নত করা হয়েছে। এর ফলে বাতাসের বাধা ও ঘূর্ণি কমবে। পাশাপাশি টানেলের ভেতরে বায়ুচাপের আকস্মিক পরিবর্তন এবং শব্দের বিস্ফোরণধর্মী প্রভাবও কমানো সম্ভব হবে।
বিশেষভাবে তৈরি ছাদের প্যানেল, বায়ুপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণের যন্ত্রাংশ এবং বাইরের কাঠামোর নকশা বাতাস চলাচল আরও উন্নত করবে। ফলে উচ্চগতিতে এবং টানেলের ভেতর চলাচলের সময়ও যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য বজায় থাকবে।
প্রকল্পটিকে উচ্চগতির রেল প্রযুক্তিতে ভারতের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর প্রচেষ্টার একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এস এম/ ০৫ নভেম্বর ২০২৬







