জাতীয়

জাতিসংঘে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে বাংলাদেশের বিস্ফোরক বার্তা: ৫ দফা কড়া প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর, আর বোঝা বইবে না বাংলাদেশ

ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর – “বাংলাদেশ আর অনির্দিষ্টকালের জন্য ১২ লাখেরও বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষের দায়িত্ব বহন করতে পারে না। মানবিকতার খাতিরে আশ্রয় দেওয়া এই বিপুল পরাশ্রিত জনগোষ্ঠী আজ আমাদের অর্থনীতি, সমাজ ও পরিবেশের ওপর চরম চাপ সৃষ্টি করেছে।”

আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্দেশে কোনো অস্পষ্টতা না রেখে সোজা ভাষায় এমন কঠোর ও স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান। নিউ ইয়র্কে রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ক এক উচ্চপর্যায়ের হাই-লেভেল সাইড ইভেন্টে প্রধান অতিথির বক্তব্য উপস্থাপনকালে তিনি এই মন্তব্য করেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়ার যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই সেশনে মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই, স্থায়ী ও সম্মানজনক সমাধানের লক্ষ্যে বিশ্বনেতাদের সামনে ৫ দফার একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন তিনি।

ঐতিহাসিক দূরদর্শিতার স্মরণ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়নে আশঙ্কাজনক পতন

বক্তব্যের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী স্মারক উল্লেখ করে বলেন, এর আগেও যখন বাংলাদেশে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, তখন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং পরবর্তীতে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী ও শক্তিশালী কূটনৈতিক নেতৃত্বেই সফলভাবে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়েছিল।

তবে ২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম সহিংসতার পর এই সংকট এক অভূতপূর্ব ও ভয়াবহ রূপ লাভ করে। দীর্ঘ ৯ বছর ধরে বাংলাদেশ এই বিপুল মানবিক বোঝা বহন করে চলেছে। অথচ দিন দিন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা তহবিলের পরিমাণ কমছে। তিনি ক্ষোভ ও উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান—২০২৫ সালের ৯৩৪ মিলিয়ন ডলারের মানবিক আবেদনের বিপরীতে ২০২৬ সালে ফান্ড কমে ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, “মানবিক সহায়তার এই সংকোচন বিশ্বনেতাদের রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার অজুহাত হতে পারে না।”

সংকট উত্তরণে প্রধানমন্ত্রীর ঐতিহাসিক ৫ দফা প্রস্তাব:

১. স্পষ্ট প্রত্যাবাসন রোডম্যাপ: দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ উপায়ে রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমিতে ফেরাতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণে একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করা।

২. সহিংসতা বন্ধ ও নাগরিক অধিকার: মিয়ানমারে বেসামরিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সব ধরনের অত্যাচার বন্ধ করে নিজ জমিতে তাদের নাগরিকত্বসহ মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা বিধান।

৩. টেকসই মানবিক ফান্ড: বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় বাংলাদেশি আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর সার্বিক সহায়তায় স্থিতিশীল ও পর্যাপ্ত মানবিক তহবিল নিশ্চিত করা।

৪. বিচার ও জবাবদিহি: আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) মিয়ানমারের অপরাধীদের বিরুদ্ধে চলা বিচারে পূর্ণ সহায়তা দিয়ে উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা।

৫. আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও সীমান্ত ঘিরে গড়ে ওঠা মাদক কারবার, মানবপাচার, অবৈধ অস্ত্র ব্যবসা ও ডিজিটাল সাইবার অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা।

বক্তব্যের আবেগঘন সমাপ্তিতে প্রধানমন্ত্রী বিশ্ববাসীকে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আসুন, আমরা সবাই মিলে নিশ্চিত করি—রোহিঙ্গাদের ভাগ্য যেন নিপীড়ন ও বাস্তুচ্যুতির আরেকটি করুণ গল্প হয়ে না থাকে। বরং এটি হয়ে উঠুক ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। আর সেই গল্পের সূচনা হতে হবে এখনই।”

জাতিসংঘে প্রধানমন্ত্রীর অন্যান্য ব্যস্তসূচি

জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের এই সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক বৈষম্য ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। আজই তার ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন অ্যান্ড দ্য জাস্ট ট্রানজিশন’ শীর্ষক বিশ্বসভায় যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে। পাশাপাশি ব্রাজিল, দক্ষিণ আফ্রিকা, নরওয়ে ও স্পেনের যৌথ আয়োজনে বৈশ্বিক বৈষম্য প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ সেশনেও তিনি বক্তব্য রাখবেন।

উল্লেখ্য, আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের মূল বিতর্কে বাংলাদেশের হয়ে বক্তব্য রাখবেন তিনি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বিশ্বমঞ্চের এই শীর্ষ অধিবেশনে এটিই হবে তার প্রথম ঐতিহাসিক ভাষণ।

এনএন/ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language