আইন-আদালত

এমপির দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মের রহস্যজনক আত্মহত্যা: বাপের মামলায় কারাবন্দি গাড়িচালক মামা

ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর – রাজধানীর শেরেবাংলা নগরস্থ সংসদ সদস্যদের আবাসিক ভবন (ন্যাম ভবন)-এ সাতক্ষীরা-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম খাতুনের (১৯) ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধারের পর একের পর এক উন্মোচিত হচ্ছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। এবার মরিয়মকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে নজরুলের গাড়িচালক তথা মরিয়মের নিজ আপন মামা ওবায়দুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আরিফুল ইসলামের আদালত তদন্তকারী কর্মকর্তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওবায়দুর রহমানকে কারাগারে পাঠানোর এই আদেশ দেন। ডিবি পুলিশের তেজগাঁও জোনাল টিমের পরিদর্শক ও মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ সালাউদ্দিন আসামি ওবায়দুরকে হাজির করে বিচারিক হেফাজতে রাখার আবেদন জানিয়েছিলেন।

মামার প্ররোচনাতেই বিয়ে, নেপথ্যে মারাত্মক জটিলতা

প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) রফিকুল ইসলাম জানান, এদিন আসামির পক্ষে জামিনের কোনো আবেদন ছিল না। তদন্তে উঠে এসেছে, সংসদ সদস্য নজরুলের সঙ্গে মরিয়মের বিয়ের আগে থেকেই এই ওবায়দুর রহমান যুক্ত ছিলেন। ওবায়দুরের প্রত্যক্ষ প্ররোচনাতেই জুনে নজরুলের সঙ্গে ১৯ বছরের তরুণী মরিয়মের বিয়ে সম্পন্ন হয়। মামলা ও অপরাধের সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে আসামিকে ভবিষ্যতে আরও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের কথা জানিয়েছে পুলিশ।

এর আগে গত রোববার ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে মরিয়ম খাতুনের ওড়না পেঁচানো ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ওই দিনই নিহতের বাবা মো. মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা’র অভিযোগ এনে একটি মামলা দায়ের করেন। এতে মূল তিন আসামি হলেন—সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম এবং গাড়িচালক ওবায়দুর রহমান।

সুইসাইড নোট ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনের ভয়ঙ্কর অভিযোগ

মামলার এজাহারে ভিকটিমের বাবা অভিযোগ করেন, ইসলামী শরিয়াহ অনুযায়ী বিয়ের পর থেকেই ন্যাম ভবনের একই ফ্ল্যাটে নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ও নতুন স্ত্রী মরিয়ম একসঙ্গে বসবাস করছিলেন। তবে বিয়ের পর থেকেই প্রথম স্ত্রী ও সাবেক এমপি নজরুল মিলে নিয়মিতভাবে ১৯ বছরের মরিয়মের ওপর মানসিক ও শারীরিক অত্যাচার চালাতেন। নির্যাতনের এ ঘটনা মরিয়ম ফোনে স্বজনদের বারবার জানাতেন।

গত ২০ সেপ্টেম্বর বিকেলে সংসদ সদস্য নিজেই মরিয়মের বাবাকে ফোন করে দ্রুত ন্যাম ভবনে যেতে বলেন। সেখানে গিয়ে দরজা ভেঙে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে থাকা তরুণীর নিথর দেহ দেখতে পান পরিবারের সদস্যরা। মরদেহের পাশে বিছানায় একটি ‘সুইসাইড নোট’ও উদ্ধার করে পুলিশ, যাতে নিজের মৃত্যুর জন্য আসামিদের অব্যাহত নির্যাতনকে দায়ী করা হয়েছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়।

ভিডিও ভাইরাল ও দল থেকে বহিষ্কারের পুরোনো ঘটনা

এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার জল অনেক দূর গড়ায় গত জুলাই মাসেই। সাবেক এমপি গাজী নজরুলের সঙ্গে মরিয়ম খাতুনের একটি ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ আপত্তিকর ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তোলপাড় সৃষ্টি হয়। নৈতিক স্খলনের অভিযোগে গত ২২ জুলাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী গাজী নজরুল ইসলামকে দল থেকে চূড়ান্তভাবে বহিষ্কার করে এবং বিষয়টি নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়।

ভিডিও ফাঁসের ওই ঘটনার পরপরই উল্টো এমপি নজরুলের বিরুদ্ধে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যার চেষ্টার অভিযোগ এনে পল্লবী থানায় প্রথম মামলাটি করেছিলেন এই গাড়িচালক ওবায়দুরই। ওই মামলায় হাইকোর্ট থেকে আট সপ্তাহের জামিনে ছিলেন নজরুল। তবে ভাগ্নি মরিয়মের রহস্যজনক মৃত্যুর পর, এখন একই মামলায় খোদ বাদী ওবায়দুরই আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে কারাবন্দি হলেন।

এনএন/ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

Back to top button
🌐 Read in Your Language