বিদ্যুৎ খাতে ২৪৬০ কোটি টাকার বিশাল বিনিয়োগ: বদলে যাচ্ছে ঢাকার উপকণ্ঠ, মিলবে বিরামহীন বিদ্যুৎ

ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর – রাজধানী ঢাকা ও তার আশেপাশের শিল্পাঞ্চল ও উপশহরগুলোতে লোডশেডিং এবং ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ভোগান্তি কি তবে এবার শেষ হতে চলেছে? দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, ডিজিটাল ও দুর্যোগ-সহনশীল করতে বড় অঙ্কের অর্থায়নের ঘোষণা দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। সংস্থাটি বাংলাদেশের জন্য ২০ কোটি ডলার (প্রতি ডলার ১২৩ টাকা হিসাবে প্রায় ২,৪৬০ কোটি টাকা) ঋণ অনুমোদন করেছে।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) এডিবির ঢাকা অফিস থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে নিশ্চিত করা হয়েছে এই মেগা প্রকল্পের তথ্য। ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর আওতায় রাজধানী ঢাকার আশেপাশের দ্রুত বর্ধনশীল শিল্পাঞ্চল ও উদীয়মান শহরগুলোর বিদ্যুৎ অবকাঠামোকে ঢেলে সাজানো হবে।
ঢাকার আশপাশের ১৩টি পিবিএস পাবে নতুন রূপ
বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) অধীনে পরিচালিত ঢাকার উপশহরীয় এলাকার ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) এই প্রকল্পের সুফল পাবে। ২০২২ সালে দেশ শতভাগ বিদ্যুতায়নের মাইলফলক স্পর্শ করলেও, দ্রুত নগরায়ণ ও নতুন নতুন শিল্পকারখানা গড়ে ওঠায় বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার ওপর তীব্র চাপ তৈরি হয়। পুরানো সাবস্টেশন, অতিরিক্ত লোড ও কারিগরি অপচয়ের মতো সমস্যা সমাধানে এই প্রকল্প গেমচেঞ্জার হতে যাচ্ছে।
বাংলাদেশে নিযুক্ত এডিবির কান্ট্রি ডিরেক্টর চিংফেং ঝাং বলেন, “বাংলাদেশ যখন একটি সমৃদ্ধ ও বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি গড়ে তোলার দিকে এগোচ্ছে, তখন বিনিয়োগ আকর্ষণ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে আধুনিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থা অপরিহার্য। এই প্রকল্প ঢাকার প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রিক এলাকাগুলোকে ভবিষ্যতের উপযোগী করে তুলবে।”
প্রকল্পের প্রধান প্রযুক্তি ও কাজের ফিরিস্তি:
প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ গ্রাহকরা পাবেন নির্ভরযোগ্য সেবা। এক নজরে কী কী থাকছে এই অবকাঠামোগত সংস্কারে:
নতুন সাবস্টেশন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: ৫২টি নতুন সাবস্টেশনে ১,১৫০ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার ক্ষমতার ট্রান্সফরমার স্থাপন করা হবে এবং বিদ্যমান ১২টি সাবস্টেশনের সক্ষমতা আরও ১১৫ মেগাভোল্ট-অ্যাম্পিয়ার বাড়ানো হবে।
বিশাল কেবল নেটওয়ার্ক: ২,৬০০ কিলোমিটারেরও বেশি ওভারহেড ও আন্ডারগ্রাউন্ড (ভূগর্ভস্থ) লাইন নির্মাণ ও আধুনিকায়ন করা হবে।
দ্রুত ট্রাবলশুটিং: লাইনে কোথাও ত্রুটি দেখা দিলে তা দ্রুত শনাক্ত করতে ৯০০টি আধুনিক ‘ফল্ট লোকেটর সেট’ বসানো হবে, যার ফলে দ্রুততম সময়ে বিদ্যুৎ পুনঃসরবরাহ সম্ভব হবে।
নদী পারাপার অবকাঠামো: নদী পারাপারের উপযোগী সঞ্চালন কাঠামো ও সুইচিং স্টেশনও নির্মিত হবে।
পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন’ অর্থায়ন ও কার্বন হ্রাস
শুধু বিদ্যুৎ সরবরাহ নয়, জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখবে এই উদ্যোগ। এডিবির বিশেষ ‘রেজিলিয়েন্স ফাইন্যান্সিং’ বা দুর্যোগ-সহনশীলতা অর্থায়নের অংশ হিসেবে ১৪.৬৫ কোটি ডলার ব্যয় হবে জলবায়ু-বান্ধব প্রযুক্তিতে। পরিবেশবান্ধব ‘গ্যাস-ইনসুলেটেড সুইচগিয়ার’ ব্যবহারের ফলে বার্ষিক প্রায় ২ লাখ ৩৭৫ টন গ্রিনহাউস গ্যাস (কার্বন ডাই অক্সাইড সমতুল্য) নিঃসরণ হ্রাস পাবে।
অর্থায়নের সমীকরণ ও নারীদের অংশগ্রহণ
এই মেগা প্রকল্পে এডিবির ২০ কোটি ডলারের পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার ১০৭.৯৫ মিলিয়ন ডলার এবং বিআরইবি ১৪১.৩৯ মিলিয়ন ডলার অর্থায়ন করবে। এছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার একটি তহবিল থেকে মিলবে ১ মিলিয়ন ডলারের কারিগরি অনুদান।
প্রকল্পের আরেকটি ইতিবাচক দিক হলো, এটি ডিজিটাল সিস্টেম ইন্টিগ্রেশন ও সাইবার নিরাপত্তার পাশাপাশি বিদ্যুৎ খাতে নারীদের কাজের সুযোগ বৃদ্ধি এবং লিঙ্গ-সংবেদনশীল কর্মপরিবেশ গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখবে।
এনএন/ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬







