২৪ ঘণ্টায় কেড়ে নিল ১১টি নিষ্পাপ প্রাণ: হামের ভয়াবহ ছোবলে দিশেহারা দেশ

ঢাকা, ২৩ সেপ্টেম্বর – কোমল শিশুদের অকালমৃত্যুর মিছিলে আবারও ভারী হয়ে উঠছে দেশের আকাশ। কোনো মহামারী যেন থামতেই চাইছে না; এবার অতি সংক্রামক ভাইরাস ‘হাম’-এর নির্মম কোপে বিপন্ন হাজারো শিশুর জীবন। সারাদেশ থেকে পাওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের বিপজ্জনক উপসর্গ নিয়ে আরও ১১ জন শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি চলতি সেপ্টেম্বর মাসে একদিনে হামের উপসর্গে সর্বোচ্চ মৃত্যুর ঘটনা।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে এই ভয়াবহ চিত্র সামনে আসে। হাসপাতালগুলোর শিশু ওয়ার্ডে রোগীদের স্থান সংকুলান হচ্ছে না, আর বাইরে অপত্য স্নেহ হারানো মা-বাবার আহাজারি এক বিষাদময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।
এক নজরে ২৪ ঘণ্টার চোখ কপালে তোলা পরিসংখ্যান
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কন্ট্রোলরুমের দেয়া তথ্যমতে, গত একদিনে নতুন করে আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ১ হাজার ২৭০ জন।
- নতুন আক্রান্ত (উপসর্গসহ): ১,১৫৭ জন।
- ল্যাব টেস্টে নিশ্চিত আক্রান্ত: ১১৩ জন।
- নতুন মৃত্যু (উপসর্গসহ): ১১ জন শিশু (তবে গত ২৪ ঘণ্টায় নিশ্চিত হামে কারো মৃত্যুর খবর মেলেনি)।
মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর: পরিসংখ্যানের আড়ালে এক ভয়াবহ মানবিক ট্র্যাজেডি
চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই ৬ মাসে মোট শনাক্ত হামের রোগী ও উপসর্গযুক্ত আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৮৩ হাজার ৪৪৯ জনে। এর মধ্যে ২১ হাজারের কাছাকাছি (২০,৮৫১ জন) শিশুর শরীরে ল্যাব পরীক্ষায় হামের উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এখন পর্যন্ত সারাদেশে এই ভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ লাখ ৬২ হাজার ৪৮ জন শিশু। সৌভাগ্যবশত ১ লাখ ৫৫ হাজার ৬১২ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও, মৃত্যুর মিছিল থামানো যাচ্ছে না। ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত হাম ও হামের উপসর্গ মিলিয়ে মোট ১,০৭৬ জন শিশুর প্রাণ গেছে। এর মধ্যে ৯৭৫ জন মারা গেছে হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ১০১ জনের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হামে আক্রান্ত হয়ে।
কেন তৈরি হলো এই মহামারী সমতুল্য সংকট?
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বিগত কয়েক বছরে নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে (EPI) তৈরি হওয়া ঘাটতিই আজ বড় বিপর্যয় ডেকে এনেছে। মহামারী পরবর্তী সময়ে সঠিক সময়ে অনেক শিশুকেই হামের (MR) প্রতিষেধক টিকা দেয়া সম্ভব হয়নি। এর ওপর অসচেতনতা ও লক্ষণ দেখামাত্র হাসপাতালে না আনার ফলেও জটিলতা বাড়ছে। বিশেষ করে অপুষ্টিতে ভোগা শিশুরা হামে আক্রান্ত হলে নিউমোনিয়া বা মস্তিষ্কের জটিলতায় ভুগে দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ছে।
সচেতনতাই এখন একমাত্র অস্ত্র
চিকিৎসকরা বলছেন, জ্বর, গায়ে লালচে দানা বা র্যাশ, চোখ লাল হওয়া, সর্দি ও কাশির লক্ষণ দেখা দিলেই অবহেলা না করে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে।
নিয়মিত টিকাদান: ৯ মাস ও ১৫ মাস বয়সে শিশুকে অবশ্যই হাম-রুবেলার (MR) টিকা দিন।
বিচ্ছিন্ন রাখা: ঘরে আক্রান্ত শিশু থাকলে তাকে অন্য শিশুদের থেকে অন্তত ৪-৫ দিন আলাদা রাখুন।
পুষ্টিকর খাবার: তরল খাবার ও ভিটামিন-এ সমৃদ্ধ খাবার নিশ্চিত করুন।
সোশ্যাল মিডিয়া থেকে শুরু করে পাড়া-মহল্লা—সব জায়গায় হাম প্রতিরোধী বার্তা পৌঁছানো এখনই জরুরি। আপনার একটু সচেতনতা ও সতর্ক দৃষ্টি বাঁচাতে পারে একটি ফুটফুটে শিশুর জীবন।
এনএন/ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬







