ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন শি জিনপিং

বেইজিং, ২৩ সেপ্টেম্বর- চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই সপ্তাহে ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসতে যাচ্ছেন। প্রায় এক দশক আগে যুক্তরাষ্ট্রের মের সঙ্গে সেই বৈঠকের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে ছিল চীন। পরের বছর ট্রাম্প প্রশাসন যে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সংঘাত শুরু করবে, তার মুখে তখনাটিতে দুজনের সর্বশেষ মুখোমুখি সাক্ষাতের তুলনায় এবার শি জিনপিং অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থান থেকে আলোচনায় বসছেন।
২০১৭ সালে ফ্লোরিডার মার-আ-লাগোতে ট্রাম্পের সঙ্গে সেই বৈঠকের সময় বিভিন্ন ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় পিছিয়ে ছিল চীন। পরের বছর ট্রাম্প প্রশাসন যে প্রযুক্তি ও বাণিজ্যিক সংঘাত শুরু করবে, তার মুখে তখন চীন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় ছিল।
কিন্তু এবার পরিস্থিতি অনেকটাই আলাদা। শি জিনপিং এমন একটি দেশের নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যা গত কয়েক বছরে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, উৎপাদন ও বৈশ্বিক প্রভাব—প্রায় সব ক্ষেত্রেই বড় ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন এখন প্রযুক্তি খাতেরও বড় শক্তি। দেশটির নিজস্ব প্রযুক্তিবিদেরা এমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই মডেল তৈরি করছেন, যা সিলিকন ভ্যালির প্রযুক্তির সঙ্গে ক্রমেই পাল্লা দিচ্ছে। বেইজিংভিত্তিক মহাকাশাদন খাত গত বছর বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্যানেল ও চিপের চাহিদ কোম্পানিগুলো পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট উৎক্ষেপণ ও অবতরণে সাফল্য দেখাচ্ছে এবং তাদের লক্ষ্য এখন মার্কিন প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের মতো বৈশ্বিক পর্যায়ের সক্ষমতা অর্জন।
জ্বালানি, এআই, রোবট ও মেমোরি চিপসহ বিভিন্ন খাতের চীনা কোম্পানিগুলো গত এক বছরে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের সাফল্য দেখিয়েছে।
চীনের বিশাল উৎপাদন খাত গত বছর বৈশ্বিক বাণিজ্যে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ি, সৌর প্যানেল ও চিপের চাহিদা বৃদ্ধিও এতে ভূমিকা রেখেছে।
বিশেষ করে বিরল খনিজ বা রেয়ার আর্থসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় চীনের আধিপত্য বেইজিংকে যুক্তরাষ্ট্র ও ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ বাণিজ্যনীতির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা দিয়েছে।
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যখন মিত্রদের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে টানাপোড়েনে জড়াচ্ছে এবং ইরান নিয়ে শুরু করা যুদ্ধেরও এখনও সমাধান করতে পারেনি, তখন বৈশ্বিক অর্থনীতিকে অস্থিতিশীল করা ওই সংঘাতের মধ্যেও চীন নিজেকে দায়িত্বশীল ও নির্ভরযোগ্য বৈশ্বিক শক্তি হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।
একতরফা দাবি চাপিয়ে দিতে পারবে না যুক্তরাষ্ট্র
বেইজিংয়ের নীতিনির্ধারণী মহলে এখন একটি বিষয়ে অনেকটাই ঐকমত্য তৈরি হয়েছে—আগের মতো যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের ওপর একতরফাভাবে নিজেদের দাবি চাপিয়ে দিতে পারবে না।
সাংহাইয়ের ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ডিন উ শিনবো বলেন, “নয় বছর আগের তুলনায় চীন এখন অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী। আর আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কার্যকর একটি পথ চীন এখন খুঁজে পেয়েছে।”
তিনি বলেন, “ওয়াশিংটনকে এখন বেইজিংয়ের সঙ্গে আরও সমতা ও সম্মানের ভিত্তিতে আচরণ করতে হবে। এই সম্পর্ককে ক্রমেই আরও পারস্পরিক হতে হবে।”
তবে এর অর্থ এই নয় যে, শি জিনপিংয়ের এবারের সফরে ঝুঁকি কম।
চীনের ধীরগতির অর্থনীতিতে নতুন গতি আনতে দেশটির উচ্চপ্রযুক্তির রূপান্তরের ওপর নির্ভর করছেন শি জিনপিং। গত মে মাসে বেইজিংয়ে দুই দেশের বৈঠকে ‘গঠনমূলক কৌশলগত স্থিতিশীলতা’ বজায় রাখার বিষয়ে যে সমঝোতা হয়েছিল, সেটি ধরে রাখা গুরুত্বপূর্ণ। এতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে নতুন উত্তেজনা বা সংঘাত যাতে চীনের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত না করে, তা নিশ্চিত করা যাবে।
তবে একই সঙ্গে চীনের প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক প্রভাব বাড়ায় জিনপিং ওয়াশিংটনকে একটি নতুন বাস্তবতাও দেখাতে পারবেন—বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক চায় ঠিকই, কিন্তু চীনের উত্থান আর যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র পিপলস ডেইলিতে বুধবার প্রকাশিত এক দৃঢ় ভাষার নিবন্ধে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত শিয়ে ফেং বলেন, তাইওয়ান ও মানবাধিকার বেইজিংয়ের জন্য ‘লাল রেখা’, যা অতিক্রম করা যাবে না।
তিনি বলেন, চীনের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও উন্নয়নের স্বার্থ লঙ্ঘন করা যাবে না। তাইওয়ান, গণতন্ত্র ও মানবাধিকার, চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও উন্নয়নের পথ এবং দেশটির উন্নয়নের অধিকার—এই চারটি বিষয়ে কোনো চ্যালেঞ্জ মেনে নেওয়া হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রনির্ভরতা কমিয়ে স্বনির্ভর চীন
জিনপিংয়ের আত্মবিশ্বাসের অন্যতম প্রধান উৎস হলো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারের ওপর বাণিজ্যিক নির্ভরতা কমানো এবং প্রযুক্তিতে স্বনির্ভরতা অর্জনের ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতি।
প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়ার পর বেইজিং রোবট, এআই, জীবপ্রযুক্তি, মহাকাশ, নতুন জ্বালানি ও চিপের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিপুল অর্থ ও রাজনৈতিক শক্তি বিনিয়োগ করেছে। একই সঙ্গে এসব প্রযুক্তিকে শিল্প উৎপাদনে দ্রুত যুক্ত করা হয়েছে।
তবে এই উন্নতির সুফল চীনের সব শ্রেণির মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
গত মাসে দেশটিতে তরুণদের বেকারত্ব সাম্প্রতিক সময়ের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। কয়েক কোটি শ্রমিক খাবার সরবরাহ বা রাইড-শেয়ারিংয়ের মতো গিগ অর্থনীতির ওপর প্রধান আয়ের উৎস হিসেবে নির্ভর করছেন। ভোক্তা ব্যয় এখনও দুর্বল, স্থানীয় সরকারগুলো ঋণের চাপে রয়েছে এবং বিশাল আবাসন খাতের সংকটও অব্যাহত।
চীনের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বললে তারা সহজেই স্বীকার করবেন, অর্থনীতি আগের মতো ভালো নেই। তবে একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও চীন প্রযুক্তিশক্তি হিসেবে উঠে আসতে পেরেছে—এ নিয়ে তাদের মধ্যে এক ধরনের জাতীয় গর্বও রয়েছে।
প্রতীক হয়ে উঠেছে হুয়াওয়ে
এর অন্যতম উদাহরণ চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়ে। প্রথম ট্রাম্প প্রশাসন প্রতিষ্ঠানটিকে কালো তালিকাভুক্ত করেছিল।
সম্প্রতি চীনা প্রযুক্তিবিষয়ক ব্লগাররা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাপলের বহুল আলোচিত প্রথম ফোল্ডেবল ফোন নিয়ে ভিডিও প্রকাশ করছেন। এসব ভিডিওতে তারা তুলে ধরছেন, হুয়াওয়ে এর নিজস্ব ফোল্ডেবল ফোন বাজারে এনেছিল সাত বছর আগেই।
জিনপিংয়ের যুক্তরাষ্ট্র সফরের কয়েক দিন আগে হুয়াওয়ে আরও ঘোষণা দিয়েছে, তাদের পরবর্তী প্রজন্মের অ্যাসেন্ড এআই চিপ নির্ধারিত সময়ের আগেই আগামী বছর বাজারে আসবে। চীনের এআই উন্নয়নের ক্ষেত্রে চিপ উৎপাদন দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম বড় বাধা।
হুয়াওয়ের রোটেটিং চেয়ারম্যান এরিক শু চলতি মাসের শুরুতে বলেন, “চীনের কাছে চিপ বিক্রি করবে কি না, সেই সিদ্ধান্ত অন্যদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করবে—এমন ভবিষ্যৎ আমরা মেনে নিতে পারি না।”
এআই নিয়েও যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিযোগিতা
যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ এআইয়ের দ্রুত বিকাশ নিয়ে উদ্বিগ্ন ও হতাশ। বিপরীতে চীনের মানুষ এআই কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে কাজে লাগতে পারে, সে বিষয়েই বেশি মনোযোগী।
চাকরি হারানোর আশঙ্কা চীনেও রয়েছে। তবে একই সঙ্গে প্রযুক্তির নতুন সুযোগ কাজে লাগানোর প্রবল আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি সমাজের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ রাখায় এআই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে না—এমন একটি ধারণাও সেখানে রয়েছে।
শি জিনপিং এমন এক সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন, যখন চীনা এআই মডেলসহ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে।
ট্রাম্প অবশ্য বলেছেন, নিরাপত্তার কথা বলে যুক্তরাষ্ট্র এআই উন্নয়নের গতি কমাতে পারে না। কারণ চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে দ্রুত এগোতে হবে।
এ পরিস্থিতিতে শি জিনপিংয়ের প্রতিনিধিদলের অন্যতম লক্ষ্য হবে যুক্তরাষ্ট্রকে আরও প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত রাখা। এসব নিষেধাজ্ঞা চীনা কোম্পানিগুলোর মার্কিন প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশ আরও সীমিত করতে পারে।
বেইজিং চায় দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও পূর্বানুমানযোগ্য হোক। তাইওয়ান ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণের মতো সংবেদনশীল বিষয় যাতে সামগ্রিক সম্পর্ককে অস্থিতিশীল না করে, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরও শক্ত রাজনৈতিক অঙ্গীকার চায় চীন।
দুই পক্ষই সমান শক্তিশালী
এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
দুই দেশই জানে, বেইজিং যদি নতুন কোনো মার্কিন নিষেধাজ্ঞাকে অতিরিক্ত আগ্রাসী মনে করে, তাহলে গত বছরের মতো আবারও বাণিজ্যিক সংঘাত ভয়াবহ আকার নিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশের অর্থনীতি প্রায় পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল।
গত বছরের বাণিজ্যযুদ্ধের অবসান ঘটানো সমঝোতাটি হয়েছিল এমন এক পর্যায়ে, যখন চীন কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রেয়ার আর্থ রপ্তানিতে ব্যাপক নিয়ন্ত্রণ আরোপের হুমকি দিয়েছিল। এর জবাবে যুক্তরাষ্ট্র বিপুলসংখ্যক চীনা কোম্পানিকে কালো তালিকাভুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছিল।
চলতি সপ্তাহে দুই দেশ ওই যুদ্ধবিরতি আরও বাড়াতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে উভয় পক্ষই একে অপরকে অতিরিক্ত চাপ দিতে সতর্ক থাকবে।
দ্য এশিয়া গ্রুপের ব্যবস্থাপনা অংশীদার এবং হংকংয়ে সাবেক মার্কিন কনসাল জেনারেল কার্ট টং বলেন, পরিস্থিতি এমন যে ‘কেউ জিতবে না, কারণ দুই পক্ষই প্রায় সমান শক্তিশালী’।
তার মতে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে কোনো পক্ষেরই স্পষ্ট শ্রেষ্ঠত্ব নেই। দুই দেশের হাতেই এমন কিছু চাপ প্রয়োগের ক্ষমতা রয়েছে, যা প্রয়োগ করতে গেলে নিজেদেরও ক্ষতি হবে। ফলে উভয় পক্ষই এখন এমন পদক্ষেপ থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, যার মূল্য তাদের নিজেদেরই দিতে হবে।
কার্ট টং বলেন, ট্রাম্প এখন জিনপিংকে এমন একজন প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখছেন, যার সঙ্গে মোকাবিলা করতে হবে; এমন কেউ হিসেবে নয়, যাকে চাপ দিয়ে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা যাবে।
বৈশ্বিক প্রভাবেও এগিয়ে যাচ্ছে চীন
শুধু অর্থনীতি ও প্রযুক্তি নয়, বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রেও চীনের অবস্থান বদলেছে।
জুলাইয়ে প্রকাশিত পিউ রিসার্চের নতুন এক জরিপে দেখা গেছে, ৩৬টি দেশের বেশির ভাগেই যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব বেশি। এমনকি বিশ্বজুড়ে আস্থা অর্জনের ক্ষেত্রেও জিনপিং সামান্য ব্যবধানে ট্রাম্পকে ছাড়িয়ে গেছেন।
এ পরিবর্তনের পেছনে শুধু বিশ্বমঞ্চে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে পরিবর্তিত ধারণাই নয়, চীনের ‘সফট পাওয়ার’ বৃদ্ধিও কাজ করছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান চীনা এআই মডেল ব্যবহার করছে। রাস্তায় দেখা যাচ্ছে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি। লাবুবু নামের চীনা খেলনা, চীনা টেলিভিশন নাটক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘চায়নাম্যাক্সিং’ প্রবণতা চীন সম্পর্কে আগ্রহ ও পর্যটন বাড়াচ্ছে।
গত কয়েক সপ্তাহে জিনপিং একের পর এক বিদেশ সফর করে চীনের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নিজস্ব ধারণা তুলে ধরছেন।
চলতি মাসের শুরুতে নয়াদিল্লিতে ব্রিকস সম্মেলনে তিনি সদস্য দেশগুলোকে স্মার্ট কারখানা স্থাপন এবং এআই মডেল তৈরিতে সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন।
এর আগে মিসরে রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য একটি ‘নতুন নিরাপত্তা কাঠামো’র প্রস্তাব দেন—যে কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল হবে না।
এ বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারাও বেইজিংমুখী হয়েছেন।
ইরান ইস্যুতেও চীনের প্রভাব
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে শুরু করা চলমান যুদ্ধের জন্য সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এমন দেশগুলোর ওপরও চাপ বাড়িয়েছে, যারা ইরানের সঙ্গে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। ওয়াশিংটন তাদের ব্যবসা বন্ধ করতে বাধ্য করার হুমকি দিয়েছে এবং বড় ধরনের নিষেধাজ্ঞার কথাও বলেছে।
ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীন এই তালিকার শীর্ষেই রয়েছে।
তবে ইরান ইস্যুতেও চীনের বাড়তে থাকা আন্তর্জাতিক প্রভাব ও কূটনৈতিক সক্ষমতা জিনপিং-ট্রাম্প বৈঠকে বেইজিংকে বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
গত সপ্তাহে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ে তার ইরানি সমকক্ষ আব্বাস আরাগচির সঙ্গে বৈঠক করেন।
চীনা নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা উ শিনবোর মতে, বৈঠকের একটি উদ্দেশ্য ছিল কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা, যাতে ওয়াশিংটনে শি জিনপিং ও ট্রাম্পের বৈঠকে ইরান ইস্যুতে আরও বাস্তবভিত্তিক আলোচনা করা যায়।
এর ফলে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা চীনা কোম্পানির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে বেইজিং কীভাবে পাল্টা অবস্থান নিতে পারে, তারও একটি ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
উ শিনবো বলেন, চীন যুক্তরাষ্ট্রকে দুটি বিষয় জানাবে।
প্রথমত, ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করার কারণে চীনা ব্যাংক বা কোম্পানির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের চেষ্টা না করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, ইরানের সংঘাতের অবসান ঘটাতে সামরিক সমাধান বা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার পথ থেকে সরে এসে আলোচনায় বসতে হবে এবং একটি গ্রহণযোগ্য শান্তিচুক্তিতে পৌঁছাতে হবে।
সব মিলিয়ে, প্রায় এক দশক পর ওয়াশিংটনে জিনপিংয়ের এবারের সফর শুধু আরেকটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক নয়। বরং এটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কের পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
এস এম/ ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬







