সম্পাদকের পাতা

ব্রিটেনের নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম

নজরুল মিন্টো

আজ শুক্রবার (১৭ জুলাই ২০২৬) লন্ডনে আয়োজিত লেবার পার্টির বিশেষ সম্মেলনে ৫৬ বছর বয়সী অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে আনুষ্ঠানিকভাবে দলের নতুন নেতা ঘোষণা করা হয়েছে। কিয়ার স্টারমারের উত্তরসূরি নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত তিনিই ছিলেন একমাত্র প্রার্থী। হাউস অব কমন্সে লেবার পার্টির ৪০৩ জন আইনপ্রণেতার মধ্যে ৩৭৯ জন এবং দলের সঙ্গে যুক্ত ২৩টি সংগঠন তাঁকে সমর্থন দেওয়ায় নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগেই ফল নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল।

দুই বছর আগে নির্বাচনে বিপুল বিজয় নিয়ে ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টি এবার নিজেদের নেতা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের প্রধানমন্ত্রীও বদলে দিচ্ছে। আগামী সোমবার কিয়ার স্টারমার রাজা তৃতীয় চার্লসের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র পেশ করলে তাঁর দুই বছরের শাসনকালের অবসান ঘটবে। এরপর রাজা অ্যান্ডি বার্নহ্যামকে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানাবেন। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের রাজনীতি থেকে উঠে আসা এই নেতা সেদিনই প্রবেশ করবেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ও কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে।

নেতা হিসেবে প্রথম বক্তৃতায় বার্নহ্যাম উপস্থিত আইনপ্রণেতা, দলীয় কর্মী ও ট্রেড ইউনিয়ন নেতাদের বলেন, তিনি ব্রিটিশ জনগণের হারিয়ে যাওয়া আশা ফিরিয়ে দিতে চান। মুহূর্তটিকে নিজের ও পরিবারের জন্য গর্বের এবং আবেগের বলে উল্লেখ করেন তিনি। জনপ্রিয়তা হারাতে থাকা লেবার পার্টিকে আশ্বস্ত করে বার্নহ্যাম বলেন, “আমার একটি পরিকল্পনা আছে।”

তবে সেই পরিকল্পনার বিস্তারিত এখনো প্রকাশ করেননি বার্নহ্যাম। শুক্রবারের বক্তৃতায় তিনি ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, সামাজিক পরিচর্যা, কাউন্সিল আবাসন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় সেবার ওপর জননিয়ন্ত্রণ বাড়ানোর কথা বলেছেন। কিন্তু এসব উদ্যোগের ব্যয়, সময়সীমা ও বাস্তবায়নপদ্ধতি সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য দেননি। সোমবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি তাঁর মন্ত্রিসভার সদস্যদের নাম ঘোষণা করবেন।

বার্নহ্যাম ব্রিটিশ রাজনীতিতে নতুন মুখ নন। টনি ব্লেয়ার ও গর্ডন ব্রাউনের সরকারে তিনি স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিসহ একাধিক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০১০ ও ২০১৫ সালে লেবার পার্টির নেতৃত্ব নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও কোনোবারই জয় পাননি।

ওয়েস্টমিনস্টারের রাজনীতি ছেড়ে ২০১৭ সালে গ্রেটার ম্যানচেস্টারের মেয়র হন বার্নহ্যাম। গণপরিবহন সংস্কার, গৃহহীনতা মোকাবিলা এবং স্থানীয় সরকারের ক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। করোনা মহামারির সময় উত্তর ইংল্যান্ডের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে জোরালো দাবি তুলে ধরায় সমর্থকেরা তাঁকে ‘কিং অব দ্য নর্থ’ নামে ডাকতে শুরু করেন।

গত ১৮ জুন মেকারফিল্ড আসনের উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে ফেরেন বার্নহ্যাম। মাত্র এক মাসের মধ্যে তিনি ক্ষমতাসীন দলের নেতৃত্বে পৌঁছে গেলেন। তবে ম্যানচেস্টারে পরিচিত ও জনপ্রিয় হলেও দেশের অন্য অনেক অঞ্চলের ভোটার এখনো তাঁকে খুব কাছ থেকে জানেন না। স্থানীয় নেতৃত্বের সাফল্যকে জাতীয় সরকার পরিচালনায় রূপ দিতে পারাই হবে তাঁর প্রথম বড় পরীক্ষা।

বার্নহ্যামের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে রয়েছে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ। তাঁর মতে, ওয়েস্টমিনস্টার ও হোয়াইটহলে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় অঞ্চলগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। আবাসন, পরিবহন, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্থানীয় অর্থনীতির মতো বিষয়ে আঞ্চলিক নেতৃত্বকে আরও ক্ষমতা দিতে চান তিনি। এ লক্ষ্যে ম্যানচেস্টারে ‘নাম্বার টেন নর্থ’ নামে প্রধানমন্ত্রীর একটি আঞ্চলিক কার্যালয় গড়ার পরিকল্পনা করেছেন, যেখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্থনৈতিক পুনরুজ্জীবন ও স্থানীয় ক্ষমতায়নের কাজ পরিচালিত হবে।

অর্থনৈতিক নীতিতে পানি, জ্বালানি, পরিবহন ও আবাসনের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাতে আরও বেশি জননিয়ন্ত্রণ চান বার্নহ্যাম। তাঁর মতে, শুধু বাজারের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এসব সেবার ব্যয় নিয়ন্ত্রণ করা গেলে জীবনযাত্রার চাপ ও সরকারি ব্যয় সামলানো সহজ হবে। তিনি ব্রিটেনের বর্তমান অর্থনৈতিক সমস্যার একটি বড় কারণ হিসেবে ১৯৮০-এর দশকের ব্যাপক বেসরকারিকরণ, শিল্পসংকোচন ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে দায়ী করেন। এর বিপরীতে ইস্পাত, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, খাদ্য ও আধুনিক শিল্পে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষা ও শিক্ষানবিশ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে চান তিনি।

বয়স, অসুস্থতা কিংবা প্রতিবন্ধিতার কারণে সহায়তা প্রয়োজন এমন মানুষের জন্য সামাজিক পরিচর্যা ব্যবস্থার সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছেন বার্নহ্যাম। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়তে থাকা ব্রিটেনে এ ব্যবস্থার অর্থায়ন ও সেবা পাওয়ার নিয়ম নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট রয়েছে। তিনি একটি সর্বজনীন জাতীয় পরিচর্যা ব্যবস্থা গড়ার কথা বললেও এর অর্থায়ন কীভাবে হবে, তা এখনো স্পষ্ট করেননি। একই সঙ্গে সামাজিক ও কাউন্সিল আবাসন নির্মাণ বাড়িয়ে গৃহহীনতা ও বাড়িভাড়ার চাপ কমাতে চান তিনি।

২০২৪ সালের নির্বাচনে বিপুল বিজয়ের মাধ্যমে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। কিন্তু সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক, দলের অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ এবং জনসমর্থনের দ্রুত পতন তাঁর অবস্থান দুর্বল করে দেয়। মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বিপর্যয় এবং জনমত জরিপে অভিবাসনবিরোধী রিফর্ম ইউকের কাছে পিছিয়ে পড়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় বিদ্রোহ তীব্র হয়। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ সামলাতে না পেরে গত মাসে পদত্যাগের ঘোষণা দেন স্টারমার।

বার্নহ্যাম তাই শুধু সরকারের নয়, জনসমর্থন হারানো এবং অভ্যন্তরীণ বিভাজনে দুর্বল হয়ে পড়া একটি দলের দায়িত্ব নিচ্ছেন। তাঁর সামনে রয়েছে ধীর অর্থনীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, চাপে থাকা স্বাস্থ্য ও সরকারি সেবা এবং আবাসন সংকট। ইউক্রেন ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধও ব্রিটেনের জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও অর্থনৈতিক নীতির ওপর চাপ তৈরি করেছে।

সোমবার রাজা তৃতীয় চার্লসের আমন্ত্রণে সরকার গঠনের পর বার্নহ্যাম হবেন ২০১৬ সালের পর যুক্তরাজ্যের সপ্তম প্রধানমন্ত্রী। ব্রিটেনের সংসদীয় ব্যবস্থায় ক্ষমতাসীন দল সাধারণ নির্বাচন ছাড়াই নেতা পরিবর্তন করতে পারে এবং নতুন দলীয় নেতাই প্রধানমন্ত্রী হন। ফলে বার্নহ্যামকে এখনই জাতীয় নির্বাচনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে না। পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন ২০২৯ সালের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা।

তবে সাংবিধানিকভাবে বৈধ হলেও ব্যালট ছাড়াই ডাউনিং স্ট্রিটে পৌঁছানো বার্নহ্যামের জন্য সুবিধা যেমন, ঝুঁকিও তেমন। জনগণ তাঁকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সরাসরি বেছে নেয়নি। ফলে তাঁর সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে মানুষের চোখে নিজের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করা। ম্যানচেস্টারে তিনি দেখিয়েছেন, কেন্দ্র থেকে দূরে থেকেও রাজনৈতিক কণ্ঠ শক্তিশালী করা যায়। এবার তাঁকে প্রমাণ করতে হবে, সেই কণ্ঠ দিয়ে পুরো ব্রিটেনের দীর্ঘশ্বাস, ক্ষোভ ও প্রত্যাশাকে একটি কার্যকর সরকারের ভাষায় রূপ দেওয়া সম্ভব।

তথ্যসূত্র:
Associated Press (July 17, 2026)
Reuters (July 17, 2026)
The Guardian (July 17, 2026)


Back to top button
🌐 Read in Your Language