সম্পাদকের পাতা

তুষারে ঢাকা নিধুয়ার শেষ পদচিহ্ন

নজরুল মিন্টো

কানাডার জানুয়ারি মানেই দীর্ঘ শীতের প্রবাহ। অন্টারিও প্রদেশ তখন বরফে আচ্ছাদিত, রাস্তাঘাট সাদা চাদরে ঢাকা পড়ে যেন জমাট সৌন্দর্যের ভেতর ঘুমিয়ে থাকে। কাঁচের মতো চকচকে পথ, বাড়ির ছাদ, গাছের ডালপালা, আর মাঝে মাঝে তুষার উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া কোনো হাওয়া পুরো দৃশ্যটিকে আরও রহস্যময় করে তোলে। এমনই এক ভোরে, যখন পূর্ব আকাশে সূর্যের আলো মৃদু আভা ছড়িয়ে কেবল উঠছে, যখন শহরের মানুষ ঘরের জানালা দিয়ে শীতের দৃশ্য দেখছে, ঠিক সেই সময় পোর্ট ব্রুসের সৈকত ধরে হাঁটছিলেন এক মাঝবয়সী কানাডিয়ান।

সেই নির্জন সৈকতে সাধারণত হাঁটেন প্রকৃতিপ্রেমীরা, যারা নিজের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসেন। পায়ের নিচে তুষারের খসখসে শব্দ ছাড়া তাঁর সঙ্গী কেউ ছিল না। দূরে লেক ইরির জল কুয়াশার মধ্যে মিশে তৈরি করছিল অদ্ভুত এক রেখা, যেখানে আকাশ আর জলের ফাঁক বোঝা যায় না। ঠিক তখনই তাঁর চোখ আটকে যায় কুয়াশার ভেতর ভেসে থাকা এক অচেনা বস্তুর দিকে। প্রথমে মনে হয়েছিল জলে ভেসে থাকা কোনো গাছের গুঁড়ি, হয়তো পরিত্যক্ত কিছু। কিন্তু কয়েক পা এগিয়েই তিনি থমকে যান। হৃদয়ের ভেতর বয়ে যায় শীতের থেকেও ঠান্ডা এক স্রোত। তিনি বুঝতে পারেন লেকের জলে ভেসে আছে এক তরুণীর নিথর দেহ।

সে তরুণী নিধুয়া মুক্তাদির, বয়স মাত্র উনিশ। বাংলাদেশি লেখক ও টেলিভিশন উপস্থাপিকা সামিনা নাসরিন চৌধুরীর একমাত্র মেয়ে। নয় বছর বয়সে মা’র হাত ধরে কানাডায় পাড়ি জমান। টরন্টোর স্কারবারোর ক্রিসেন্ট টাউনে ছিল তাঁদের ছোট্ট পরিবার। পরে অন্টারিওর লণ্ডন শহরে ফানশাওয়ে কলেজে নার্সিংয়ের দ্বিতীয় বর্ষে ভর্তি হন তিনি। মানুষের পাশে দাঁড়ানোর স্বপ্ন ছিল নিধুয়ার খুব প্রিয়। অসুস্থকে সুস্থ করে তোলা, মায়ের মতো সমাজের আলো হয়ে ওঠার স্বপ্ন যেন প্রতিদিন নতুন রঙ ছড়াত তার জীবনে। কিন্তু সেই সমস্ত স্বপ্ন থেমে গেল ইরি লেকের হিমজলে, এক শীতল সকালে।

৩ ডিসেম্বর ২০২৩ ছিল নিধুয়ার নিখোঁজ হওয়ার দিন। তাকে সর্বশেষ দেখা যায় পোর্ট স্ট্যানলির কাছের হক ক্লিফ রোড এলাকায়। তার পরনে ছিল কালো জ্যাকেট, বেগুনি হুডি, গোলাপি সাদা স্কার্ফ, সাদা জুতা। সাথে ছিল একটি সাদা ব্যাকপ্যাক এবং একটি স্যুটকেস। পুলিশ নিশ্চিত করে তার মোবাইল ফোনের শেষ লোকেশনও ছিল লেক ইরির ধারে। তারপর নিধুয়া যেন মিলিয়ে যায় কুয়াশামাখা এক অজানা দিগন্তে।

৪ ডিসেম্বর পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে নিখোঁজ ডায়েরি করে। এলগিন কাউন্টি এবং অন্টারিও প্রভিন্সিয়াল পুলিশ নিধুয়ার সন্ধানে নামেন। ড্রোন, বিশেষ অনুসন্ধানী দল এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় চলে অনুসন্ধান। সংবাদপত্রে ছাপা হয় নিধুয়ার ছবি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জুড়ে বেড়ে যায় তার খোঁজখবর জানতে চাওয়ার আবেদন।

মা সামিনা নাসরিন চৌধুরীর কাছে সেই দিনগুলো আজও দুঃসহ স্মৃতি। তিনি বলেন, “২৯ নভেম্বর মেয়ের সঙ্গে আমার শেষ কথা হয়েছিল। সে আনন্দিত ছিল, সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়েছিল। এখন মনে হয় যেন দুঃস্বপ্নের ভেতর হাঁটছি। বারবারই ইচ্ছে হয়, যেন ঘুম ভেঙে ওকে আবার দেখতে পাই।” ক্যামেরার সামনে বলা এই কথাগুলো ছিল জমাট শীতের দিনের মতোই শীতল ও ভারী।

পরিবারের স্মৃতিতে নিধুয়া ছিলেন প্রাণবন্ত একজন তরুণী। হাসিমুখে কথা বলা, ক্লাস, বন্ধুবান্ধব সবই ছিল নিয়মিত ছন্দে। তারপরও এমন এক সকালেই তিনি কীভাবে পোর্ট স্ট্যানলির মতো দূরবর্তী জায়গায় পৌঁছালেন, তা এখনো কারও কাছে স্পষ্ট নয়।

পুলিশ যখন নিধুয়ার মরদেহ উদ্ধার করে, তখন শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন দেখা যায়নি। পুলিশের ভাষায়, “There were no signs of foul play.” পরিবারের কাছে এই বক্তব্য শান্তির পরিবর্তে নতুন প্রশ্নই তৈরি করে। নিধুয়া শক্ত মনের মানুষ ছিল, তার জীবনে সংগ্রাম ছিল, স্বপ্ন ছিল। তাই তার এই অস্বাভাবিক মৃত্যু তাদের কাছে আরও রহস্যময় মনে হয়। তার ভাই আব্রাহাম মুক্তাদির উদ্ধারকর্মীদের প্রতি পরিবারের পক্ষ থেকে গভীর কৃতজ্ঞতার কথা জানান।

তদন্ত এখনো চলমান। নিধুয়ার ল্যাপটপ ও মোবাইল ফোন থেকে পাওয়া তথ্য, তার যোগাযোগ ও অনলাইন কার্যকলাপ সবই পর্যালোচনা করছে তদন্তকারী দল। পোস্টমর্টেম এবং টক্সিকোলজি রিপোর্টের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেও বিস্তারিত প্রকাশ করা হয়নি। পুলিশ জানিয়েছে সব সম্ভাবনাই তারা সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং প্রতিটি দিক সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তবু নিধুয়ার অকাল প্রস্থান রেখে গেছে অসংখ্য প্রশ্ন। তার মা বহন করছেন হৃদয়ের গভীরে সঞ্চিত অশ্রু, ভাইয়ের মনে তীব্র শূন্যতা, বন্ধুদের স্মৃতিতে চিরস্থায়ী হয়ে গেছে ৩ ডিসেম্বরের সেই দিন।

শীত কেটে গেলে বসন্ত আসে। পাখিরা ফিরে আসে। রঙ ফিরে পায় প্রকৃতি। কিন্তু নিধুয়া আর ফিরবে না। তার স্মৃতি এবং প্রশ্নগুলো পরিবারের চারপাশে অব্যক্ত শূন্যতার মতো স্থির হয়ে আছে।

বি. দ্র. এই লেখাটি নিধুয়া মুক্তাদিরের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন। তার অকাল প্রস্থান যে শোকের স্রোত সৃষ্টি করেছে তা পরিবার ছাড়িয়ে স্পর্শ করেছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়। আমরা তার পরিবারকে জানাই আন্তরিক সমবেদনা। নিধুয়ার গল্প মনে করিয়ে দেয় জীবন কখনও অজানা পথে হারিয়ে যায়, তবুও স্মৃতি হয়ে থাকে মানুষের অন্তরে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language