সম্পাদকের পাতা

একটি কানাডিয়ান ট্র্যাজেডি

নজরুল মিন্টো

এআই দ্বারা নির্মিত হাসিনা খানমের একটি কল্পিত ছবি

টরন্টোর আকাশে সেদিন কুয়াশা ছিলো, বাতাসে হিম। স্কারবোরোর একটি ছোট অ্যাপার্টমেন্টে বসে এক তরুণী কাঁদছিল চুপচাপ। বয়স মাত্র কুড়ি কিংবা বাইশ। কে জানতো তার নামটি নিঃশব্দে লেখা হয়ে থাকবে কানাডার দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী সমাজের ইতিহাসে।

হাসিনার জন্ম ১৯৮১ সালের ১৫ জুন, সিলেটের বিয়ানীবাজারে। ১৯৯৩ সালে পরিবারটি কানাডায় পাড়ি জমায়। টরন্টোর ড্যানফোর্থ এলাকায় প্রথম বসতি গড়ে তারা। স্কারবোরোর একটি হাই স্কুল থেকে হাসিনা গ্র্যাজুয়েশন করে এবং নার্স হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো টরন্টোর জর্জ ব্রাউন কলেজে। এদিকে তার বাবা- মা চেয়েছিলেন হাসিনা যেন বাংলাদেশে তার এক দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাইয়ের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়। আর এই জোরপূর্বক বিয়ের চাপই তাকে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়।

২০০১ সালের ডিসেম্বরে হাসিনার পরিবার বাংলাদেশে গিয়ে তার বিয়ে ঠিক করে (হাসিনার ভাইয়ের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, বিয়ের জন্য ১৫ হাজার ডলার দেনমোহর নেওয়া হয়।)। টরন্টো ফিরে এসে হাসিনা যখন জানায় সে এই বিয়ে মানছে না, তখন থেকেই শুরু হয় নির্যাতন। তাকে কলেজে যেতে বাধা দেওয়া হয়। তার বইপত্র পুড়িয়ে দেওয়া হয়, মোবাইল কেড়ে নেওয়া হয়। প্রতিবেশী মারিয়া গোমেজ সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, কীভাবে হাসিনাকে প্রায়ই রাতে বারান্দায় ঠান্ডায় দাঁড় করিয়ে রাখা হতো শাস্তি হিসেবে।

হাসিনার ডায়েরিতে পাওয়া যায় চাঞ্চল্যকর লেখা: “আজ আব্বু বললেন, যদি আমি বিয়ে মানি না, তাহলে আমাকে বাংলাদেশে রেখে আসবেন। আম্মু কান্না জড়িত গলায় বললেন, ‘মেয়েদের তো এভাবেই বিয়ে দিতে হয়।’ রাত তিনটে পর্যন্ত তারা আমার হাত-পা বেঁধে রেখেছিলেন…আমি বুঝতে পেরেছি, এই বাড়িটাই আমার জন্য সবচেয়ে বড় জেলখানা।”

২০০২ সালের ১৪ মার্চ হাসিনা শেষ চেষ্টা হিসেবে টরন্টো পুলিশের ৪৩ নং ডিভিশনে গিয়েছিল। তবে পুলিশ কর্মকর্তা ডেভিড মিলারের ভাষ্যমতে, “সে শুধু বলেছিল পারিবারিক সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে চায়, জোরপূর্বক বিয়ের কথা উল্লেখ করেনি।” পরের দিনই তার লাশ পাওয়া যায় বাথরুমে, এক বোতল স্লিপিং পিলের পাশে।

হাসিনার ঘরে পাওয়া যায় একটি চিঠি—যেখানে সে স্পষ্ট ভাষায় লিখেছে, “আমাকে ভালোবাসা হয়নি। আমাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। আমার পড়াশোনা, আমার স্বপ্ন—সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।”

২০০৪ সালে অন্টারিও করোনার্স কোর্ট রুলিং দেয়, এটি “প্রেশার রিলেটেড সুইসাইড”

হাসিনার আত্মহত্যার খবর প্রকাশ্যে আসতেই কানাডার গণমাধ্যমে তোলপাড় শুরু হয়। Toronto Star ঘটনাটিকে সামনে এনে প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম করে: “A forced marriage, a tragic death”। পুরো কাহিনী বিশ্লেষণ করে তারা তুলে ধরে দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী নারীদের নির্যাতনের নেপথ্য সামাজিক সংকট।

CBC হাসিনার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করে একটি তথ্যচিত্র: Silent Cry: Forced Marriages in Canada; সেখানে দেখানো হয়, কীভাবে অভিবাসী পরিবারগুলোতে মেয়েরা শারীরিকভাবে নয়, বরং সংস্কার, নিয়ন্ত্রণ, এবং ভয়ের মাধ্যমে নিঃশব্দে দমন হয়। সেখানে হাসিনার চিঠির অংশ পাঠ করে শোনানো হয়।

বিভিন্ন রেডিও প্রোগ্রাম, প্যানেল আলোচনা ও ইউনিভার্সিটি কনফারেন্সে এই ঘটনা ঘুরে ফিরে আসে। ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর এক গবেষণায় বলা হয়: “Gender-Based Violence in South Asian Communities is often hidden under the veil of family honour. Hasina’s death opened a conversation long overdue.”

সাউথ এশিয়ান উইমেন্স সেন্টারের কর্মীরা বলেছিলেন, হাসিনার মতো অনেক মেয়েই জোরপূর্বক বিয়ের শিকার হয়, কিন্তু ভয় ও লজ্জায় তারা মুখ খুলতে পারে না। হাসিনার পরিবার দাবি করে, সে মানসিকভাবে অসুস্থ ছিল। কিন্তু তার আত্মহত্যাপূর্ব চিঠি এবং প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য—সবই বলছিল বিপরীত কথা।

এই ঘটনার সামাজিক অভিঘাত দীর্ঘস্থায়ী হয়। বিশেষ করে দক্ষিণ এশীয় কমিউনিটিতে বেড়ে যায় বিতর্ক—স্বাধীনতা বনাম পারিবারিক সম্মান, ব্যক্তিস্বাধীনতা বনাম সমাজের নিয়ম। Barbra Schlifer Clinic, South Asian Women’s Centre, ও Women’s Legal Education and Action Fund (LEAF)-এর মতো সংগঠনগুলো শুরু করে জোরপূর্বক বিবাহবিরোধী আন্দোলন।

জোরপূর্বক বা ব্যবস্থিত বিবাহ কী, এবং কেন?
জোরপূর্বক বিবাহ (Forced Marriage) এমন একধরনের বিবাহ, যেখানে কোনো একজন বা উভয় পক্ষের পূর্ণ সম্মতি ছাড়া বিবাহ সংঘটিত হয়—পারিবারিক চাপ, সামাজিক নিয়ম, অর্থনৈতিক লেনদেন, বা সম্মান রক্ষার অজুহাতে। দক্ষিণ এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য, এবং আফ্রিকার কিছু দেশে এই প্রথা এখনও বিদ্যমান। তবে অভিবাসনপ্রবণ সমাজগুলোতে, বিশেষত যেখানে সাংস্কৃতিক রক্ষণশীলতা প্রবল, সেখানে এটি কখনো কখনো রূপ নেয় সহিংসতার।

জোরপূর্বক বিবাহ এবং ব্যবস্থিত (arranged) বিবাহ একই নয়। ব্যবস্থিত বিবাহে সাধারণত পরিবার পাত্রপাত্রীর পরিচিতি ঘটায়, তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থাকে তাদের হাতে। কিন্তু জোরপূর্বক বিবাহে ব্যক্তির মতামতের কোনো মূল্য নেই। এটি একরকম মানবাধিকার লঙ্ঘনের শামিল।

কানাডীয় আইনে জোরপূর্বক বিবাহ একটি অপরাধ
হাসিনা খানমের আত্মহত্যার প্রেক্ষিতে কানাডার সরকার ২০১৫ সালে Criminal Code-এ Section 293.1 যুক্ত করে। যেখানে জোরপূর্বক বিবাহকে “অপহরণ ও বন্দিদশার সমতুল্য অপরাধ” হিসেবে গণ্য করা হয়।

এতে বলা হয়: “Every person who celebrates, aids or participates in a marriage ceremony in which one party is marrying without their free and enlightened consent is guilty of an indictable offence and liable to imprisonment for a term of not more than five years.”
অর্থাৎ, সম্মতি ছাড়া কাউকে বিবাহে বাধ্য করা এখন সরাসরি ফৌজদারি অপরাধ। অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড হতে পারে। এই আইন জোরপূর্বক বিবাহের বিরুদ্ধে একটি কাঠামোগত প্রতিরোধ গড়ে তোলে।

সংগঠনগুলোর ভাষ্যমতে, আইন থাকা সত্ত্বেও শাস্তির পরিসংখ্যান আশাব্যঞ্জক নয়। বেশিরভাগ ঘটনা পরিবার বা সম্প্রদায়ের ভেতরে চাপা পড়ে যায়। ভুক্তভোগীরা মুখ খুলতে সাহস পান না, বা সামাজিক ও পারিবারিক চাপ তাদের নীরব করে রাখে। হাসিনার ক্ষেত্রেও তার পরিবার বা তার মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে বিচারের সম্মুখীন করা হয়নি। সোশ্যাল ওয়ার্কারদের রেকর্ড, প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য ও চিঠির তথ্য থাকা সত্ত্বেও পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে অভিযুক্ত করেনি।

হাসিনার মৃত্যুর পর টরন্টোতে অভিবাসী নারীদের জন্য নতুন করে হেল্পলাইন চালু হয়। যেখানে অভিবাসী মেয়েরা সরাসরি সাহায্য চাইতে পারে। স্কুল ও কলেজে সচেতনতা কর্মসূচি চালু হয়, যেখানে মেয়েদের জানানো হয়, তাদের ‘না’ বলার অধিকার আছে। অনেকে বলেছে, যদি এই সুযোগ হাসিনার সময় থাকতো, সে হয়তো বেঁচে যেত।

সম্প্রতি টরন্টোর পিয়ারসন বিমানবন্দরে বিশেষ একটি পোষ্টার স্থাপন করা হয়েছে; যে পোস্টারে লেখা রয়েছে: “যদি কেউ আপনাকে জোরপূর্বক বিয়ে করতে বাধ্য করে, ডায়াল করুন ৯১১। আমরা আপনাকে রক্ষা করব।”

দক্ষিণ এশিয় কমিউনিটি সহায়তা কেন্দ্রগুলো জানায়, হাসিনার মতো অনেক মেয়ে এখন এগিয়ে আসছে। কেউ আশ্রয়কেন্দ্রে যাচ্ছে, কেউ আইনগত সহায়তা নিচ্ছে। এরপরও প্রশ্ন থেকে যায়—কতজন হাসিনা এখনও নিঃশব্দে কাঁদছে, কতজনকে জোর করে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে, আর কতজন হাসিনার মতোই শেষ পর্যন্ত আত্মঘাতী হচ্ছে; কারো কাছে কোনো পরিসংখ্যান আছে কি?

তথ্যের উৎস:

  • Toronto Star-এর ২০০২ সালের আর্টিকেল: “A forced marriage, a tragic death”​
  • CBC ডকুমেন্টারি: “Silent Cry: Forced Marriages in Canada” (২০০৩)​
  • University of Toronto-এর গবেষণা: “Gender-Based Violence in South Asian Communities” (২০০৫)​
  • Bangladeshi Canadian Community Services-এর রিপোর্ট


Back to top button
🌐 Read in Your Language