সম্পাদকের পাতা

একটি প্রিন্সটন ট্রেইলের গল্প

নজরুল মিন্টো

সাজ্জাদ ও এমা

১৭ জানুয়ারি ২০২৪। জর্জিয়ার আকাশে যেনো এক অজানা ভার জমে ছিল। ভোরের আলো তখনো ফুটে ওঠেনি, অথচ বাতাসে ছিল অচেনা এক আশঙ্কার ছায়া। কুয়াশা ঢেকে রেখেছিল গাছের ডাল, বিদ্যুতের তার, আর শহরের প্রতিটি ঘুমন্ত জানালা। এ সময় গুনেইট কাউন্টির জনসক্রিক এলাকায় পুলিশের গাড়ির নীল আলো ভেদ করে উঠে আসে এক করুণ দৃশ্য—একটি গাড়ির ভেতর নিঃশ্বাসহীন এক দেহ। তিনি সাজ্জাদ হাসান, বাংলাদেশের ঢাকার সন্তান, একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, জর্জিয়া পাওয়ার কোম্পানির কর্মী, স্বামী ও দুই সন্তানের পিতা।

সাজ্জাদ পরিবার নিয়ে থাকতেন টাকার শহরের প্রিন্সটন রান ট্রেইলে। কেউ ভাবতেও পারেনি, একদিন তার জীবন থেমে যাবে নিজ গাড়ির মধ্যে, নিজেরই ছোড়া গুলির আঘাতে।

জীবন কখনো কখনো এমন সব প্রশ্ন রেখে যায় যার উত্তর খুঁজতে গিয়ে মানুষ হারিয়ে ফেলে নিজেকেই। প্রাথমিকভাবে পুলিশ জানিয়েছে, সাজ্জাদ নিজেই নিজের জীবন শেষ করেছেন। কিন্তু এই ঘটনায় যে ব্যথা, যে শূন্যতা ছড়িয়ে পড়েছে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মনে, তা কোনো রিপোর্টে ধরা যায় না।

গাড়ির ভেতর পাওয়া গেছে একটি চিরকুট—অস্ফুট ইংরেজিতে লেখা: “My wife and parents are innocent. I made Ema file case against Jash Uddin.”

এমা তার স্ত্রী, আর জস উদ্দিন এক প্রভাবশালী কমিউনিটি নেতা। ফোবানার সাথে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। একসময় সাজ্জাদেরই ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। কিন্তু কখন যেনো সেই বন্ধুত্বের ফাঁদে পা দিয়ে এমা ও জস উদ্দিনের মধ্যে তৈরি হয় এক গোপন সম্পর্কের আভাস। সাজ্জাদের মৃত্যুর পর এই লেখাটিই ছড়িয়ে দেয় অজস্র কল্পনা, অভিযোগ আর গুজবের ঝড়।

ছবিতে বাঁদিক থেকে সাজ্জাদ, জস উদ্দিন, জস উদ্দিনের স্ত্রী ও এমা তানজিম

ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ বলেছে, এটি আত্মহত্যা। কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যায়—কেন? সত্যিই কি তিনি স্বেচ্ছায় জীবন সমাপ্ত করেছিলেন? নাকি কেউ তাকে ঠেলে দিয়েছিল এই চূড়ান্ত পরিণতির দিকে?

প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, তাদের পরিবারে দাম্পত্য কলহ ছিল দীর্ঘদিনের। স্ত্রী এমা একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন বলেও জানা গেছে। এমনকি বাড়িতে পুলিশ আসত বারবার। একসময় তার শ্বশুর-শাশুড়িও একই বাড়িতে থাকতেন, পরে তারা অন্য রাজ্যে চলে যান এই অস্থিরতার কারণে।

আরও আলোড়ন তোলে ‘রূপান্তর’ নামের এক অনলাইন পোর্টালে প্রকাশিত খবর, যেখানে এমার পরকীয়ার ইঙ্গিত দিয়ে জস উদ্দিনকে জড়িয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। যদিও জস উদ্দিন এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করে বলেছেন, এটি ছিল ‘জাস্ট প্রোপাগান্ডা’।

সাজ্জাদ ও এমার মধ্যে দাম্পত্য কলহের পাশাপাশি আদালতেও মামলা চলছিল। সাজ্জাদের বন্ধুদের মতে, তিনি জস উদ্দিনের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।

আত্মহত্যা, না কি নিখুঁতভাবে পরিকল্পিত হত্যা সে রহস্য আজও অমীমাংসিত। নানান প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে।

১) সাজ্জাদ কেন বললেন স্ত্রী ও বাবা-মা নির্দোষ?

২) ‘আমি এমাকে দিয়ে মামলা করিয়েছি’—এই স্বীকারোক্তির পেছনে কী ঘটনা?

ঘটনার দিন সাজ্জাদের বাড়িতে এমা ছিলেন না। পুলিশ যখন চিরকুটের বিষয়ে তার কাছে জানতে চায়, তখন তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। বলা হয়, মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত। কিন্তু অনেকে বলেন, সেটি ছিল পরিস্থিতি সামলানোর এক কৌশল।

মৃত্যুর তিন দিন আগে সাজ্জাদ ফেসবুকে লিখেছিলেন একটি পোস্ট—“Silence is sometimes louder than words. Not all battles are visible.” কেউ কিছু বুঝতে পারেনি। সাজ্জাদ হয়তো নিজের যুদ্ধের কথা বলছিলেন!

মৃত্যু সবসময় উত্তর দেয় না—অনেক সময় রেখে যায় আরও গভীর প্রশ্ন। সাজ্জাদের এই গল্পও তেমনই—একটি অসমাপ্ত রক্তলেখা, যার শেষ বাক্যটি কেউ কোনোদিন পড়তে পারল না…।


Back to top button
🌐 Read in Your Language