
সিডনির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত ‘মিন্টো’—এক শান্ত, গাছপালায় ঘেরা উপশহর, সিডনি সিটি থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। এখানে বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে একটি বহুজাতিক কমিউনিটি, যার মধ্যে বাংলাদেশি অভিবাসীদের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য। মসজিদ, বাংলা বাজার, হালাল মাংসের দোকান আর ছোট ছোট বুটিক দোকান নিয়ে গড়ে উঠেছে এক অনন্য সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। দুপুরবেলা শিশুদের খেলাধুলা, সন্ধ্যায় মায়েদের হাঁটাহাঁটি আর ছুটির দিনে একসাথে বারবিকিউ—এই সব মিলেই মিন্টো যেন এক প্রবাসী বাঙালির চেনা উঠোন।
কিন্তু সেই চেনা উঠোনের ঠিক মাঝখানে, একদিন ভোরে, এক গ্যারেজ থেকে নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে এক বিভীষিকাময় দৃশ্য—একটি থেমে যাওয়া নিঃশ্বাস, এক রক্তাক্ত দেহ। সেদিন মিন্টো জেগে উঠেছিল ভোরের আলোয় নয়, পুলিশের নীলবাতিতে; বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল কান্নার ভারে।
সৈয়দা নিরূপমা—বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত এক নারী, মাত্র ৩৩ বছর বয়স, দুই সন্তানের মা। তার দেশের বাড়ি বাংলাদেশের নোয়াখালীর এক গ্রামে। মিষ্টি বানিয়ে বিক্রি করতেন স্থানীয় বাংলাদেশি দোকানে। হাসিমুখ, নরম কণ্ঠ, প্রতিবেশীদের প্রিয় মুখ। অথচ সেই মুখটাই এক ভোরবেলায় পড়ে ছিল নিজের বাড়ির গ্যারেজে, নিথর, রক্তাক্ত। তাকে উদ্ধার করেছিল নিউ সাউথ ওয়েলস পুলিশ, ভোর চারটায়, একটি অজ্ঞাত ফোনকলের সূত্র ধরে।
তার স্বামী, আলতাফ হোসেন—মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার বাসিন্দা। ২০০০ সালের দিকে একটি সাংস্কৃতিক দলের সদস্য হিসেবে অস্ট্রেলিয়ায় এসেছিলেন। অনুষ্ঠান শেষে দেশে ফেরার বদলে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়ে থেকে যান।
২০০৪ সালে ছুটিতে আলতাফ বাংলাদেশে গিয়ে বিয়ে করেন সৈয়দা নিরূপমাকে। এই বিয়ের ঘটকালি করেন নিরূপমার মামাতো ভাই আবদুল্লাহ খান, যিনি তখন অস্ট্রেলিয়ার বোটানিতে বসবাস করতেন। তাদের সংসার ছিল মিন্টোতে, সাত বছরের ঘর। বাইরে থেকে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও, ভেতরে ছিল অনুচ্চারিত উত্তেজনা, অসহ্য চুপচাপ সহ্য।
আলতাফ ছিলেন TAFE-এ কনট্রাকচুয়াল (contractual) টেকনিক্যাল স্টাফ হিসেবে কর্মরত। কিন্তু কর্মস্থলে একটি দুর্ঘটনার শিকার হয়ে পিঠে গুরুতর আঘাত পান। সে সময় থেকে ধীরে ধীরে কর্মজীবন থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েন। নিরূপমা পরিবার টিকিয়ে রাখতে গ্যারেজে বসেই মিষ্টি তৈরির কাজ করতেন। প্রতিদিন সকালে সেই মিষ্টি পৌঁছে দিতেন স্থানীয় বাংলা দোকানে। অথচ তার ভেতরে ছিল এক অসম লড়াই, নিজের স্বামীর সঙ্গে, নিজের ভাগ্যের সঙ্গে। তাঁর মুখের হাসির আড়ালে জমে উঠছিল অভিমান, শঙ্কা আর কিছু না বলা কথা।
সেদিন, ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল, ইস্টার সানডের ভোররাতে সেই অব্যক্ত শঙ্কাই রক্ত হয়ে ঝরে পড়েছিল। জানা যায়, রাত একটার দিকে নিরূপমা ফোন করেন তার ভাইকে, বলেন তিনি বিপদে আছেন। এরপর কিছুক্ষণ, একটা অডিও রেকর্ডিংয়ে ধরা পড়ে ঝগড়ার শব্দ।
গ্যারেজে চলছিল ঝগড়া, হঠাৎ করেই আলতাফ চলে যান রান্নাঘরে, ফিরেই শুরু করেন এক তাণ্ডব। একটি বড় ছুরি নিয়ে তিনি বারবার আঘাত করেন নিরূপমাকে। মুখ, গলা, বুক, পিঠ, বাহু—কোনোটাই রেহাই পায়নি। মোট ছুরিকাঘাতের সংখ্যা ৮০-এর বেশি। ময়নাতদন্তে দেখা যায়, ছুরির একটি ফলার অংশ ছিল নিরূপমার মুখগহ্বরে। তার শরীরে প্রতিরোধের চিহ্নও ছিল, যা প্রমাণ করে তিনি বাঁচার জন্য লড়েছিলেন।
এত কিছুর পর আলতাফ নিজেই ফোন করেন এক বন্ধুকে, বলেন—“I killed her.” বন্ধুর স্ত্রী পুলিশের কাছে খবর দেন। পুলিশ এসে দেখে এক নারীর শরীর নিথর হয়ে পড়ে আছে গ্যারেজে, ঘরে রক্তের ছাপ, রান্নাঘরে, লন্ড্রিতে, এমনকি বাচ্চাদের ঘরেও।
আরও হৃদয়বিদারক বিষয় হলো, নিরূপমার দুই সন্তান তখন ঘুমাচ্ছিলো। বড় ছেলে আলিফ (১০), মেয়ে আকিতা (৬)। পুলিশ তাদের নিরাপদে সরিয়ে নিয়ে যায়। পরে তারা যায় DOCS (Department of Community Services)-এর হেফাজতে। এরপর আদালতের নির্দেশে এবং বাবা আলতাফের সম্মতিতে প্রতিবেশী শামসুল হুদা ও তাঁর স্ত্রী সাময়িকভাবে শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিশুরা বর্তমানে সেই পরিবারেই আছেন, যেখানে নিরূপমা একসময় প্রায় প্রতিদিন যেতেন।
আলতাফ আদালতে দোষ স্বীকার করেন, তবে বলেন এটি আত্মরক্ষার্থে ঘটেছে। বিচারক বলেন, এমন রকম নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড আত্মরক্ষার অজুহাতে চাপা পড়ে না। তিনি বলেন, “This attack was ferocious… she must have experienced not only pain, but terror in her final moments.”
আদালত আলতাফকে ১৯ বছর ৬ মাসের কারাদণ্ড দেন, যার মধ্যে কমপক্ষে ১৪ বছর ৭ মাস জেলে কাটাতে হবে। তার শাস্তি শুরু হয়েছে ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল থেকেই। তিনি প্যারোলে মুক্তি পেতে পারেন ২০৩৩ সালের নভেম্বর মাসে।
নিরূপমার মামাতো ভাই আবদুল্লাহ খান বলেন, “আমি ওকে বলেছিলাম পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে। সে ভয় পেত। চুপ করে থাকত। আমি আর কিছু করতে পারিনি।”
আরেক আত্মীয় আফরিনা বলেন, “সে খুব শান্তশিষ্ট মেয়ে ছিল। ওর চোখে সব সহ্য করবার সাহস ছিল, কিন্তু মুখে প্রতিবাদ করার শক্তি ছিল না।”
এই গল্প শুধু নিরূপমার মৃত্যু নয়, এটি একসময়ের ভালোবাসার ছায়া-ছবির ভেতর জমে ওঠা বিষণ্নতার নীরব বিস্ফোরণ। প্রতিটি ঘর, প্রতিটি সমাজে যে অপ্রকাশিত কষ্টগুলো দুঃস্বপ্ন হয়ে থেকে যায়, এটি তাদেরও প্রতিচ্ছবি। নিরূপমা প্রতিবাদ করেননি—এ দোষ নয়, এ ইতিহাস।
কারণ, প্রতিটি রক্তাক্ত গৃহেই একদিন কোনো না কোনো নিরূপমা জেগে উঠে বলে ওঠে—“আমি শুধু বাঁচতে চেয়েছিলাম।”
জীবনানন্দ দাশের “আট বছর আগের একদিন” কবিতার লাইন—”লাশকাটা ঘরে শুয়ে ঘুমায় এবার / কোনোদিন জাগিবে না আর”—যেন নিরূপমার নির্মম পরিণতির প্রতিধ্বনি।









