সম্পাদকের পাতা

জ্যাকসন হাইটসের এক ফাতেমার গল্প

নজরুল মিন্টো

এআই দ্বারা নির্মিত ফাতেমার একটি কল্পিত ছবি

নিউইয়র্ক শহরের বুক চিরে চলে যাওয়া পাতাঝরা নভেম্বরের এক সন্ধ্যা। ম্যানহাটনের ঝলমলে আলো যতটা উজ্জ্বল, জ্যাকসন হাইটসের সেই বহুতল অ্যাপার্টমেন্টগুলোর অন্তর ততটাই কালো, ততটাই নিঃশব্দ। ঠিক সেই সন্ধ্যায়, জ্যাকসন হাইটসের ৭৩তম রোডে এক নির্জন অ্যাপার্টমেন্টে ঘটে গেল এমন একটি ঘটনা। একটি জানালার পর্দা উড়ছিলো বাতাসে, আর সেই পর্দার আড়ালেই থেমে গিয়েছিল এক তরুণী জীবনের গল্প—ফাতেমা আক্তার (বিয়ের পর ফাতেমা বেগম)। যে স্বপ্ন দেখেছিল নার্স হবার, মানুষকে বাঁচানোর, সে নিজেই প্রাণ হারাল রক্তাক্ত ছুরির কোপে।

নোয়াখালীর এক প্রান্তিক গ্রামের নাম চরজানগর। এখানে সূর্য ওঠে ধানের শীষের ফাঁক দিয়ে, আর বৃষ্টি নামে টিনের চালে ঝমঝম করে। এই গ্রামেই, ১৯৯৫ সালের ১২ জুন, জন্ম নিয়েছিল একটি মেয়ে—ফাতেমা আক্তার। বাবা আলতাফ হোসেন, একজন দিনমজুর। তিন ভাইবোনের মেঝো ফাতেমা ছিল সবার চেয়ে স্বপ্নবিলাসী। স্কুলের খাতায় লিখে রেখেছিল: “বড় হয়ে আমেরিকায় যাবো। নার্স হবো। সাদা পোশাক পরবো। মানুষকে বাঁচাবো।” তার সেই খাতা আজো আছে মা জাহানারার কাছে, পাতাগুলোর কিনারা হলুদ হয়ে এসেছে, ঠিক যেমন তার হৃদয়ের রং।

২০১৮ সালে আসে ফাতেমার জীবনের এক টার্নিং পয়েন্ট। ফেনীর দাগনভূঁইয়া থেকে আসা এক প্রবাসী তরুণ—রফিকুল ইসলাম(৩২)-এর সঙ্গে তার বিয়ে ঠিক হয়। ২০১৫ সালে ডিভারসিটি লটারিতে বাংলাদেশ থেকে আমেরিকায় আসে রফিকুল। সে নিউইয়র্কে এক রেষ্টুরেন্টের কিচেনে কাজ করতো। শ্বশুরবাড়ির শর্ত ছিল কঠিন: ‘মেয়েকে আমেরিকা পাঠাবার টাকা দিতে হবে, নইলে এই বিয়ে হবে না।’ বাবা আলতাফ অনেক কষ্টে টিকিটের টাকা জোগাড় করে দেন।

ফাতেমা আক্তার যুক্তরাষ্ট্রে তার স্বামী রফিকুল ইসলামের মাধ্যমে পারিবারিক পুনর্মিলন ভিসায় (Family Reunification Visa) প্রবেশ করে। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে বিমানে চড়ে ফাতেমা যখন নিউইয়র্ক পৌঁছায়, তখন তার চোখে ছিল আশার আলো। কিন্তু এই আলো-আবেগের শহরে তার স্বপ্ন ছিন্নভিন্ন হতে সময় লাগেনি। এয়ারপোর্টেই রফিক তার পাসপোর্ট জব্দ করে।

ফাতেমা কন্ডিশনাল গ্রিনকার্ড (CR-1) পেয়েছিলো ২০২০ সালে। রফিকুল ইচ্ছাকৃতভাবে I-751 জয়েন্ট পিটিশন দাখিল না করে তাকে ব্ল্যাকমেইল করত: “আমি সই করব যদি তোমার বাবা আরও ১৫ হাজার ডলার দেয়”।

ফাতেমার নিজের হাতে লেখা ডায়েরিতে পাওয়া যায় এক লাইন: “আজ রফিক আবার মারল। রক্ত গায়ে লেগে শুকিয়ে গেছে… কাউকে বলতে পারিনি।”

২০২০ সালে ২০২১ সালে যখন ফাতেমা স্থানীয় মসজিদের ইমামের কাছে সাহায্য চায়, তখন জবাব আসে—“সহ্য করো, সংসার টিকিয়ে রাখো।”

২০২২ সালে BAWDI-র হেল্পলাইনে ফোন করে ফাতেমা, কিন্তু রফিক তার হাত থেকে ফোন কেড়ে নেয়। বদ্ধঘরের মধ্যে প্রতিদিনের নির্যাতন আর আত্মহননের প্রলোভন একে একে গিলে ফেলছিল ফাতেমাকে। কিন্তু সে গর্ভবতী ছিল—মা হবার আশায়, সে মরতে পারেনি।

২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর, সকালটা শুরু হয়েছিল একটি ফোনকল দিয়ে—রফিকের বাবার নির্দেশ: “আরও ১০ হাজার ডলার পাঠাও।”

বেলা ১:১৫। প্রতিবেশী মারিয়া গনজালেস চিৎকার শুনতে পান: “আমাকে মারো না, বাচ্চাটা নষ্ট হবে!”

রাত ৮:৪৭। ৯১১-এ কল করা হয়। গলা কাঁপা এক নারীর আর্তনাদ: “Help! My husband has a knife!”

রাত ৯:০৩। পুলিশ লাথি দিয়ে দরজা ভেঙ্গে অ্যাপার্টমেন্টে ঢোকে। রক্তে লাল মেঝে, ফাতেমার শরীরে ১২টি ছুরিকাঘাত। এবং তিন মাসের অনাগত শিশুটিও থেমে যায় চিরতরে।

রফিককে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালতের কক্ষে দেখা যায় রফিকুলের চোখে কোনো অনুতাপ নেই। বিচারক জিজ্ঞাসা করলেন: “কেন করলেন?” তার স্বীকারোক্তি ছিল জঘন্য ও নির্লজ্জ। রফিকুল বলে: “সে আমাকে অপমান করেছিল… আমি শুধু শাস্তি দিতে চেয়েছি। সে আমার স্ত্রী ছিল,। তাকে মারার সে অধিকার আমার আছে।” ফরেনসিক রিপোর্ট বলে—ফাতেমার হাতে ছিল প্রতিরক্ষামূলক আঘাতের চিহ্ন। সে লড়েছিল। প্রাণের জন্য, শিশুর জন্য, জীবনের জন্য।

২৮ মার্চ ২০২৪, আদালত রায় দেয়—২৫ বছর থেকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। প্যারোলের কোনো সম্ভাবনা নেই। জরিমানা: $৫০,০০০।

ফাতেমার পরিবার লাশ দেশে পাঠাবার আবেদন জানালেও বাংলাদেশ কনস্যুলেট মরদেহ পাঠানোর খরচ ($৭,২০০) পরিবার দিতে পারেনি বলে পাঠায়নি।

ফাতেমা বেগমের মরদেহ নিউইয়র্কের হার্ট আইল্যান্ডে দাফন করা হয়েছে। হার্ট আইল্যান্ড নিউইয়র্ক সিটির একটি পাবলিক কবরস্থান, যেখানে অজ্ঞাত বা আর্থিকভাবে অক্ষম ব্যক্তিদের দাফন করা হয়। ফাতেমার পরিবার আর্থিক সংকটে থাকায় এবং মরদেহ বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা না হওয়ায়, তাকে সেখানে দাফন করা হয়। সমাধিফলকে খোদাই করা ছিল: ‘ফাতেমা বেগম – ১৯৯৫-২০২৩, কারো না কারো মেয়ে’।

ফাতেমা বেগমের হত্যাকাণ্ড নিউইয়র্কের বাংলাদেশি কমিউনিটিতে গভীর শোক ও ক্ষোভের সঞ্চার করে। Jackson Heights Bangladeshi Alliance আদালতের বাইরে বিক্ষোভ করে এবং “Justice for Fatema” স্লোগান দেয়। Bangladeshi American Women’s Development Initiative (BAWDI) নারী নির্যাতন বিরোধী ক্যাম্পেইন চালায় এবং ফাতেমার নামে একটি তহবিল গঠন করে, যা নির্যাতিত নারীদের সহায়তা প্রদান করার জন্যে। রফিকুলের সম্পত্তি (কুইন্সের $৪২০,০০০ মূল্যের কন্ডো) ফাতেমার পরিবার পাবে কি না, তা নিয়ে এখনও আদালতে মামলা চলছে।

সর্বশেষ, নিউইয়র্ক স্টেটে পাশ হয়েছে একটি নতুন আইন: “Fatema’s Law”। এখন থেকে যে কোনো নারী ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স রিপোর্ট করলে, তার ভিসা স্ট্যাটাস বিবেচনায় আনা হবে না।


Back to top button
🌐 Read in Your Language