সম্পাদকের পাতা

জর্জিয়ায় এক বাংলাদেশি তরুণীর অমীমাংসিত বিদায়

নজরুল মিন্টো

নাযাহ

আটলান্টার আকাশে তখন থেমে আছে সন্ধ্যার শেষ আলো। মে মাসের মাঝামাঝি এক দিন। আকাশে কোনো বাদলের রেখা নেই, অথচ কোথা থেকে যেন নামছে ভারী এক শোকের স্রোত। নিঃশব্দে বয়ে চলেছে এক তরুণীর জীবনাবসানের খবর—যে তরুণী এসেছিল জ্ঞান ও স্বপ্নের মহাসাগরে ভেসে বেড়াতে, তার নাম নাযাহ আনবার।

পাবনা জেলার মেয়ে, বাংলাদেশের ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা, সদ্য কৈশোর পেরোনো এক কন্যা—নাযাহ। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছিল উচ্চশিক্ষার জন্য। জর্জিয়ার আটলান্টার ‘সাউদার্ন ইউটাহ ইউনিভার্সিটিতে’ ভর্তি হয়েছিলো এফ-১ ভিসায়, অর্থনীতি বিভাগে।

প্রযুক্তির যুগে মানুষ আর মুখোমুখি না হয়েও বন্ধুত্ব গড়ে তোলে। অনলাইন দাবা খেলার মাধ্যমে নাযাহ পরিচিত হয় আমেরিকান নাগরিক ডেভিড উ বেকওয়াই-এর সঙ্গে। পরিচয় থেকে প্রেম, প্রেম থেকে বিয়ে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে তারা পরিণয়ে আবদ্ধ হয়। কিন্তু সেই সম্পর্ক যে একসময় বিষিয়ে উঠবে, তা হয়তো কেউ কল্পনাও করেনি।

নাযাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের বরাতে জানা যায়, বিয়ের পর ডেভিড নাযাহকে পরিবার ও বন্ধুদের থেকে বিচ্ছিন্ন করতে শুরু করে। নাযাহর ফেসবুক অ্যাকাউন্ট ডেভিডের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, এবং তার ব্যক্তিগত জিনিসপত্র—পাসপোর্ট, ফোন, ল্যাপটপ—সবই ডেভিডের কাছে থাকে। নাযাহর এক বন্ধু, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, তিনি দাবি করেন, “নাযাহ একবার ফিসফিস করে বলেছিল, ডেভিড তাকে মারধর করে, কিন্তু কাউকে বলার সাহস পাচ্ছিল না সে।”

২০২৫ সালের ৮ মে। একটি ফোনকল আসে পাবনার বাড়িতে। ফোনের ওপাশে ডেভিড। জানায়, নাযাহ অতিরিক্ত মদ্যপানে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। কিছুক্ষণ পর আরও একটি ফোন—নাযাহ আর নেই।

এখান থেকেই শুরু হয় সন্দেহ। পরিবারের কাছে ডেভিড আর কোনো তথ্য দেয়নি। মরদেহ কোথায়? তার মৃত্যু কীভাবে ঘটল? আদৌ কি ময়নাতদন্ত হয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর নেই। ঢাকার মিরপুরে বসে একজন পিতা মেয়ের মৃত্যুর খবর শুনেছেন, কিন্তু জানেন না কোথায় আছে তার সন্তানের দেহ!

প্রাথমিক মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছে, নাযাহর শরীরে “অ্যালকোহল ও অজানা রাসায়নিকের মিশ্রণ” পাওয়া গেছে। তবে, আত্মহত্যা নাকি হত্যা—তা নিশ্চিত করতে আরও টক্সিকোলজি রিপোর্টের অপেক্ষায় আছে কর্তৃপক্ষ। জর্জিয়া পুলিশের একটি সূত্রে জানা যায়, ডেভিডের বিরুদ্ধে “গৃহ নির্যাতন” এর কোনো রেকর্ড নেই, কিন্তু নাযাহর ফোন ও ইমেইল ডেটা পরীক্ষা করা হচ্ছে।

নাযাহর বাবা জাকিউর রহমান ও তার পরিচিতরা যোগাযোগের চেষ্টা করেন ডেভিডের সঙ্গে। কিন্তু ডেভিড উল্টো তাদের বিরুদ্ধে ‘উত্ত্যক্ততা’র অভিযোগ করে স্থানীয় পুলিশে। সেই অভিযোগে জর্জিয়ার পুলিশ দ্বিধান্বিত। তারা একটি কেস নাম্বার ইস্যু করলেও, মৃত্যুর কারণ বা তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে জানাতে অপারগ।

নাযাহর মা তৌহিদা ইবাদী কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “আমার মেয়েকে শেষবার দেখতে চাই। সে কীভাবে মরল, কে মেরেছে—আমি জানতে চাই।” পরিবার এখন Change.org-এ একটি পিটিশন শুরু করেছে, যেখানে তারা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও ইউএস স্টেট ডিপার্টমেন্টের হস্তক্ষেপ চেয়েছে।

এদিকে স্থানীয় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে নেমে আসে শোক ও ক্ষোভ। আটলান্টার বাংলাদেশি কমিউনিটি, ‘বাংলাধারা’ সংগঠনের সভাপতি মাহবুব ভূঁইয়া এবং জর্জিয়া বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট মাহবুবর রহমান ঘটনাটিকে ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন বলে জানা যায়।

নাযাহর মরদেহ কি এখনো মর্গে রয়েছে? নাকি ইতিমধ্যে দাফন হয়ে গেছে কোনো নামহীন কবরস্থানে? এসব প্রশ্ন বারবার ঘুরে ফিরে আসে। প্রাথমিক মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছে মানসিক স্বাস্থ্যজনিত চিকিৎসা চলছিল তার। কিন্তু তা থেকে কি আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত আসে? নাকি এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড? এই দ্বন্দ্ব নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে গোটা ঘটনা।

বাংলাদেশ কনসুলেট জর্জিয়া নাযাহর মরদেহ ফেরত আনতে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। তবে, ডেভিডের আইনজীবীরা ইতিমধ্যে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট প্রকাশে বাধা দিয়েছেন, যা আরও সন্দেহের জন্ম দিয়েছে।

যদি হত্যার প্রমাণ মেলে, ডেভিডের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার যদি কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করে, তাহলে মরদেহ ফেরত আনা যেতে পারে।

এই মৃত্যুর গল্প যেন এক অসমাপ্ত পাণ্ডুলিপি। নাযাহর পরিবার এখনো জানে না, সত্য কোনটি: নীরব আত্মহত্যা, না গোপন এক হত্যা। একটাই প্রার্থনা—সত্য যেন কোনো অন্ধকার ফাইলের পাতায় আটকে না থাকে।


Back to top button
🌐 Read in Your Language