সম্পাদকের পাতা

হোয়াইট লেকের নীল মৃত্যু

নজরুল মিন্টো

আফরিদ হায়দার, স্ত্রী নাঈমা ও শ্যালক বশির

হেমন্তের প্রান্তে দাঁড়িয়ে হাওয়ারা অনেক বেশি বিষণ্ণ হয়ে পড়ে নিউইয়র্কের আকাশে। শহর তখনও জেগে থাকে, কিন্তু মন থেমে যায় কোনো এক অপরাহ্ণে—যেদিন পৃথিবীর সবচেয়ে ছোট সুখের ভেলায় ভেসে থাকা এক তরুণ পরিবার হারিয়ে যায় গভীর জলের অভিমানে।

হোয়াইট লেকের ঢেউ সেদিন ছিল চুপচাপ। কেউ জানত না, তার তলদেশে নিঃশব্দে নিঃশেষ হয়ে যাবে তিনটি জীবন। শ্বাসরুদ্ধ সেই সকালের গল্পটা এখন পড়ে আছে কেবল তিনটি সমান্তরাল কবরের মাঝখানে, নিউইয়র্কের ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল পার্কে।

২৭ আগস্ট, ২০২২। সাপ্তাহিক ছুটির সকাল। আফরিদ হায়দার স্ত্রী নাঈমাকে নিয়ে বেড়াতে গেছেন শ্যালক বশির আর শ্যালিকা নাসরিন-সহ নিউইয়র্কের সুলিভান কাউন্টির হোয়াইট লেক এলাকায়। হোয়াইট লেকের পাশে একটি এয়ারবিএনবির হাউস বুক করেছিলেন আফরিদ।

পরদিন সকালে তারা একসঙ্গে নাস্তা করেন। গরম কফি, ব্যাগেল, হাসি—সবকিছুই ছিল জীবনের স্বাভাবিকতার মতো। কেউ জানত না, ঘড়ির কাঁটা কিছু সময় পর উল্টো দিকে ঘুরতে শুরু করবে।

সকাল গড়িয়ে তখন সবে দুপুরের দিকে। লেকের নীল জল চোখে পড়ে—কিছুটা রহস্যময়, কিছুটা আমন্ত্রণমূলক। বশির সবার আগে পানিতে নামে। হয়তো ঠান্ডা জলে শরীর একটু ঝরঝরে করবে বলে। কিন্তু কয়েক কদম এগোনোর পরেই তার পা পড়ে যায় এক গভীর গর্তে। অস্থিরভাবে হাত-পা ছুড়তে থাকে সে। তার আর্তচিৎকার শুনে ভগ্নিপতি আফরিদ দৌড়ে নামেন পানিতে।

ভাইয়ের মতো ভালোবাসতেন বশিরকে। স্ত্রী নাঈমার ছোট ভাই—যার সঙ্গে মাত্র এক বছর হলো আত্মীয়তা তৈরি। আফরিদ এগিয়ে যান তাকে ধরতে, টেনে তুলতে। কিন্তু সাঁতারের চর্চা ছিল না কারোরই। দুজনেই তলিয়ে যেতে থাকেন পানির নিচে।

নাসরিন তখন উপকূল থেকে ছুটে আসেন। ভাই আর দুলাভাইকে ডুবতে দেখে চিৎকার করে ওঠেন তিনি। চোখের পলকে তিনিও পানিতে ঝাঁপ দেন। তারও জানা ছিল না লেকের মাঝখানে কত মারাত্মক এই ঘূর্ণি!

নাসরিন

এই তিন প্রাণ যখন লড়ছিলো পানির বিপরীতে, তখন পৃথিবী থেমে ছিল তাদের জন্য। দূরে দাঁড়িয়ে বাকিরা বোবা হয়ে তাকিয়ে ছিলেন।

স্থানীয় এক বাসিন্দা পুলিশে ফোন করেন। খবর পেয়ে ছুটে আসে দমকল বাহিনীর ডুবুরিদল। তিনজনকে টেনে তোলা হয় লেকের গভীরতা থেকে। তাদের শরীর তখন নিথর, নিঃসাড়।

হাসপাতালে নেওয়ার পর জানা যায়, আফরিদ হায়দার আর বশির আমিন বেঁচে নেই। হৃদস্পন্দন নেই, দেহে প্রাণ নেই। শুধু চোখজোড়া অদ্ভুতভাবে বন্ধ হয়ে আছে—যেন তারা ঘুমিয়ে পড়েছেন খুব গভীর ঘুমে।

নাসরিন তখনও প্রাণে ছিলেন, কিন্তু আশঙ্কাজনক অবস্থায়। গারনেট হাসপাতালে তাকে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। সাত দিন ধরে লড়াই করে ৩ সেপ্টেম্বর, ২০২২ তিনিও বিদায় নিলেন।

নাঈমা সেদিন পানিতে নামেননি। তিনি আফরিদের স্ত্রী, বশিরের বোন। তিনি বেঁচে যান, কিন্তু হারিয়ে ফেলেন তার পুরো জগৎটা। সংজ্ঞাহীন অবস্থায় তাকেও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ফেরার পর তাকে আর আগের মতো পাওয়া যায়নি। চোখে ঘুম নেই, কণ্ঠে ভাষা নেই, হৃদয়ে আলো নেই।

ওয়াশিংটন মেমোরিয়াল পার্কে তিনজনের কবর পাশাপাশি। এ যেন এক জীবন্ত স্মৃতিচিহ্ন—একসঙ্গে বেড়াতে গিয়ে আর কখনও ফিরে না আসা তিন আত্মার।

বি. দ্র: হোয়াইট লেক- নিউইয়র্কের একটি জনপ্রিয় পিকনিক স্পট, তবে গভীরতা ও স্রোতের জন্য বিপজ্জনক বলে পরিচিত।

সতর্কতা: যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি বছর ৩,৫০০+ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যায় (সিডিসি ডেটা)।


Back to top button
🌐 Read in Your Language