
সন্তানের জন্য মায়ের ত্যাগ, কষ্ট এবং অবদান অসংখ্য। প্রতিটি মা তার সন্তানদের জন্ম থেকে লালন-পালন পর্যন্ত নিজের সকল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে থাকেন। সন্তান অসুস্থ হলে রাত জেগে তার পাশে বসে থাকা, নিজের প্রিয় জিনিসটি সন্তানকে দিয়ে দেওয়া কিংবা সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করা মায়েদের প্রতিদিনের ত্যাগেরই একটি ছোট উদাহরণ মাত্র।
বাংলা সাহিত্যে মা নিয়ে অনেক আবেগঘন লেখা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন, “মা যেমন করে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন, তেমন করে আর কেউ দেয় না।” কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত কবিতা “মা”-তে তিনি উল্লেখ করেছেন, “মায়ের বুকেই শান্তির নীড়, মায়ের পায়েই স্বর্গের চাবি।”
এশীয় মায়েরা পরিবার ও সন্তানদের কল্যাণে অত্যন্ত নিবেদিতপ্রাণ হন। তারা সন্তানদের সুখ ও সাফল্যের জন্য নিজেদের স্বপ্ন ও চাওয়া-পাওয়া বিসর্জন দিতে দ্বিধা করেন না। এশীয় সমাজে সন্তানদের শিক্ষাগত ও পেশাগত সফলতার ওপর মায়েদের বিশেষ গুরুত্ব থাকে। তারা সন্তানদের কাছ থেকে শ্রদ্ধা, সম্মান, সামাজিক মর্যাদা এবং বৃদ্ধ বয়সে সেবা প্রত্যাশা করেন। দক্ষিণ এশীয় মায়েরা বিশেষত সন্তানদের শিক্ষাগত সফলতা ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেন। সন্তানদের জীবনে নিজের স্বপ্ন পূরণের চেষ্টা করেন তারা।
পশ্চিমা মায়েরা তুলনামূলকভাবে স্বাধীন ও উদার মানসিকতার অধিকারী। তারা সন্তানদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে সম্মান করেন। সন্তানদের আত্মনির্ভরশীল এবং আত্মবিশ্বাসী করে গড়ে তুলতে তাদের প্রাধান্য থাকে। তারা সন্তানদের কাছে মানসিক সংযোগ, ভালোবাসা এবং পারিবারিক বন্ধনের প্রত্যাশা করেন। পশ্চিমা মায়েদের ক্ষেত্রে সন্তানদের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মায়ের প্রতি অগাধ ভালোবাসা আর গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশের অনন্য উদ্যোগ হিসেবে ১৯০৮ সালের ১০ মে, যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম ভার্জিনিয়ার গ্রাফটন শহরে প্রথম পালিত হয় বিশ্ব মা দিবস। আনা জার্ভিস নামের এক কৃতজ্ঞ কন্যা তার প্রয়াত মা আনা মারিয়া রিভস জার্ভিসের স্মৃতিকে শ্রদ্ধা জানাতে এই দিনটির সূচনা করেন। আনা মারিয়া ছিলেন এক সমাজসেবিকা, যিনি গৃহযুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের সেবা করে মানবতার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন।
মায়েদের নিঃস্বার্থ ত্যাগ ও অবদানকে জাতীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে আনা জার্ভিস এ উদ্যোগ নেন এবং বিভিন্ন স্থানে মা দিবস পালনের জন্য নিরলস প্রচারণা চালান। তার এই চেষ্টাকে সম্মান জানিয়ে ১৯১৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। ধীরে ধীরে এই দিনটি সীমা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে এবং আজ তা মায়ের ভালোবাসা উদযাপনের এক বিশেষ বৈশ্বিক দিবস হিসেবে স্বীকৃত।
একজন মায়ের কাছে তার প্রতিটি সন্তানই সমান প্রিয় আমাদের সমাজে এ কথাটি খুব প্রচলিত। কিন্তু বাস্তবে কি সত্যিই তাই? সম্প্রতি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে ভিন্ন তথ্য।
গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৮০ শতাংশ মা স্বীকার করেছেন যে তাদের সন্তানদের মধ্যে বিশেষ একজনের প্রতি দুর্বলতা বা বেশি ভালোবাসা রয়েছে। গবেষণায় অংশগ্রহণকারী সন্তানদের মধ্যেও ৮০ শতাংশ নিশ্চিত করেছেন যে, তাদের মা একজন সন্তানকে বেশি ভালোবাসেন। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, বেশিরভাগ সন্তানই মায়ের সবচেয়ে প্রিয় সন্তানটি নির্ধারণ করতে গিয়ে ভুল করেন।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সমাজবিজ্ঞান বিভাগের গবেষক জিল স্যুইটর ২৫ বছর ধরে পারিবারিক সম্পর্ক বিষয়ে বিস্তৃত গবেষণা চালিয়ে এই ফলাফল সামনে এনেছেন। তিনি ৬৫ থেকে ৭৫ বছর বয়সী ৩০ জন মাকে সরাসরি প্রশ্ন করেন, ‘আপনার প্রিয় সন্তান কে?’
প্রশ্নটি শুনেই মায়েরা প্রথমে বলেছিলেন যে তারা প্রত্যেক সন্তানকেই সমান ভালোবাসেন। কিন্তু একটু গভীর আলোচনার পর তারা সবাই স্বীকার করেন, নির্দিষ্ট একজন সন্তানের প্রতি তাদের মনোযোগ ও ভালোবাসা একটু বেশি। তবে অধিকাংশ মা-ই এর কারণ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।
গবেষণায় উঠে এসেছে যে, মায়েদের এই বিশেষ দুর্বলতার পিছনে কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক কারণও রয়েছে। এক মা বলেন, তার যে সন্তানটি মানসিক সমস্যার কারণে সবচেয়ে বেশি ঝামেলা তৈরি করে, তার প্রতি তিনি বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য হন এবং এ থেকেই ঘনিষ্ঠতা বাড়ে।
আরেকজন মা বলেছেন, তার সন্তানদের মধ্যে একজন খুবই ধার্মিক প্রকৃতির, যিনি সমাজ থেকে কিছুটা বিচ্ছিন্ন, একা থাকেন এবং বাকি ভাই-বোনদের মতো সংসার করেননি। এই সন্তানটিকেই তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।
প্রফেসর বলেন, গবেষণায় যদিও দেখা গেছে যে, বেশির ভাগ সন্তানেরা মনে করে মা তাদের ভাই-বোনের মধ্যে একজনকে বেশি ভালোবাসে, এতে তারা কিছু মনে করে না। তারা বলে, এটা তেমন কোনো বড় বিষয় নয়। মা তো তাদেরকেও ভালোবাসে।
সন্তানদের উচিত মাকে সম্মান করা, তার মতামতের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, তার সার্বিক সুস্থতা ও মানসিক প্রশান্তি নিশ্চিত করা। বৃদ্ধ বয়সে মায়ের পাশে থাকা, তার দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো এবং আর্থিক ও মানসিক সহযোগিতা প্রদান করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। নিয়মিত মায়ের খোঁজ-খবর নেওয়া, তার ভালো-মন্দের প্রতি খেয়াল রাখা, তাকে একাকিত্বের হাত থেকে রক্ষা করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মায়ের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের সবচেয়ে চমৎকার উপায় হলো তার প্রতি সম্মান প্রদর্শন, বিশেষ দিনগুলোতে তার পছন্দের খাবার তৈরি করা, তাকে পছন্দের জায়গায় বেড়াতে নিয়ে যাওয়া বা তার পছন্দের উপহার প্রদান করা।
মায়ের ভালোবাসা নিঃস্বার্থ ও অনন্ত। মা-ই পৃথিবীর একমাত্র আপনজন যার ভালোবাসা কোনো শর্ত বা সীমারেখা মানে না।









