সম্পাদকের পাতা

রফিক-সালামের ভ্যাঙ্কুভার

নজরুল মিন্টো

ভ্যাঙ্কুভার—নামের মধ্যেই একধরনের মাধুর্য আছে। এমন এক শহর, যার কথা শুনলেই কল্পনায় ভেসে ওঠে সাগরের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা তুষারঢাকা পাহাড়, কাঁচের মতো স্বচ্ছ নদী, আর সবুজে মোড়ানো এক নীরব নগরজীবন। পৃথিবীর বহু শহরের সৌন্দর্য চোখে পড়েছে, কিন্তু ভ্যাঙ্কুভার যেন তাদের সকলকে ছাপিয়ে এক ধরণের আত্মিক প্রশান্তি দেয়। এই শহর শুধু প্রাকৃতিক নয়, সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যেরও এক উজ্জ্বল উদাহরণ। এখানে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সহাবস্থান এতটাই নিখুঁত যে মনে হয়, একে আর শহর বলা চলে না—এ যেন এক চলমান কবিতা, যেখানে প্রতিটি মোড়, প্রতিটি দৃশ্য একেকটি অনুভব। এতদিন মরিশাসকে স্বর্গরাজ্য ভেবেছি, কিন্তু ভ্যাঙ্কুভারে এসে অনুভব করলাম, প্রকৃত স্বর্গ তো এখানেই।

কানাডার অন্যতম প্রদেশ ব্রিটিশ কলাম্বিয়া। প্রশান্ত মহাসাগরের তীর ঘেঁষে নদী আর পর্বতঘেরা এ প্রদেশটির অন্যতম শহর হচ্ছে ভ্যাঙ্কুভার। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সমুদ্র। নিচে পাহাড়ের গায়ে আছড়ে পড়ছে সমুদ্রের জলরাশি, আর উপরে পাহাড়ের চূড়ায় ভাসছে সাদা মেঘের ভেলা। কী অপরূপ দৃশ্য! চারদিকে সবুজের ছোঁয়া। নজরুলের সেই গান মনে পড়ে—‘আকাশে হেলান দিয়ে পাহাড় ঘুমায় ঐ…’।

ভ্যাঙ্কুভার সম্পর্কে প্রথম জানতে পারি আমার প্রিয় লেখক শংকরের বই থেকে। এরপর আবিষ্কার করি—স্বয়ং কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও পা রেখেছিলেন এই নগরীতে। সেই ১৯২৯ সালে। সে স্মৃতিরক্ষার্থে ব্রিটিশ কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর একটি আবক্ষ মূর্তি স্থাপন করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে ভ্যাঙ্কুভারের নাম বাঙালিদের কাছে বিশেষভাবে পরিচিত হয়ে ওঠে ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ঘটনার পর। এই ঐতিহাসিক উদ্যোগটির পেছনে ছিলেন ভ্যাঙ্কুভার শহরেরই দুই প্রবাসী বাঙালি—রফিক ও সালাম।

বহুদিন ধরে মনে ছিল ভ্যাঙ্কুভারে যাবো, কিন্তু হয়ে উঠছিল না। বছর তিনেক আগে একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেয়েও যাওয়া হয়নি। এবার হঠাৎ করেই ইচ্ছে জাগলো ঘুরে আসি। প্লেনে চড়ে রওনা হলাম।

বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই মন ভরে গেলো। এ যেন আরেক বাংলাদেশ! যখন কানাডার অন্যান্য শহর তুষারে ঢাকা, তখন ভ্যাঙ্কুভারে বসন্তের হাওয়া। প্রখর সূর্যালোকে সতেজ প্রকৃতি, বিশুদ্ধ হাওয়া, আর মানুষজন ফুরফুরে মেজাজে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যাত্রাপথের সমস্ত ক্লান্তি মুছে গিয়ে মনটা হালকা হয়ে উঠলো।

এমন পরিবেশে কেউ গান গায়, কেউ কবিতা লেখে। আমারও অনেক কিছু করতে ইচ্ছে হলো একসঙ্গে। আজ কোথাও আমার হারিয়ে যেতে নেই মানা। পাহাড়ের উপরে উঠে গলা ছেড়ে গান ধরার, সমুদ্রসৈকতে শুয়ে কল্পনার জগতে হারিয়ে যাওয়ার, আবার হঠাৎ করে ঘরে ফিরে গিয়ে এই অনুভবগুলো লিখে ফেলার এক অদম্য ইচ্ছা জাগলো মনে।

বিমানবন্দর থেকে আমাকে তুলে নেন আমাদের ভ্যাঙ্কুভার প্রতিনিধি রুহুল জামান। ইচ্ছে ছিল হোটেলে থাকার, কিন্তু তাঁর জোর-জবরদস্তিতে শেষ পর্যন্ত তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করতে হলো।

রুহুল জামান দীর্ঘদিন ধরে ভ্যাঙ্কুভারে বসবাস করছেন। বহু কিছুতেই তিনি যুক্ত। পেশায় একজন একাউন্টেন্ট, ভালোবাসেন সাংবাদিকতা, বর্তমানে আইন বিষয়ে পড়াশোনা করছেন। নগদ নারায়ণ উপার্জনের জন্য অটোমোটিভ ইন্ডাস্ট্রির সাথেও তিনি জড়িত—সহজ ভাষায়, তিনি উইকএন্ডে ট্যাক্সি চালান। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে তাঁর সুখের সংসার।

তাঁর বাসায় পৌঁছেও মনটা স্থির হচ্ছিল না। জানালার ফাঁক দিয়ে দেখি পাহাড় যেন আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। বেরিয়ে পড়লাম। জামান আমাকে নিয়ে গেলেন সাইপ্রাস বুল পর্বতের চূড়ায়। সেখানে গিয়ে দেখি লোকে লোকারণ্য। বরফ আর পাহাড়ের সংমিশ্রণে যত রকমের খেলার আয়োজন সম্ভব, সবই সেখানে।

খেলাধুলা যে কত ব্যয়বহুল হতে পারে, পশ্চিম কানাডায় না এলে বুঝতাম না। পৃথিবীতে বোধহয় বরফের উপর খেলাধুলা করতেই সবচেয়ে বেশি খরচ হয়। পাহাড়ের উপরের ঠান্ডা যে কী রকম তা না গেলে বোঝা যাবে না। বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। ঘুরে ঘুরে নিচে নেমে এলাম।

এরপর শুরু হলো সমুদ্র দর্শন। ভ্যাঙ্কুভার একটি বন্দরনগরী হিসেবেও বিশ্বজুড়ে পরিচিত। কানাডার অন্যতম বন্দরনগরী এটি। মহাসাগরের ওপারেই আমাদের মহাদেশ, আমাদের দেশ। সমুদ্রতটে দাঁড়িয়ে কত ভাবনা এসে জড়ো হতে লাগলো। ভাবতে অবাক লাগে—মানুষ কীভাবে হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে পৃথিবীর এ প্রান্তে এসে নতুন করে বেঁচে থাকার স্বপ্ন গড়েছে!

ভ্যাঙ্কুভার শহরটিকে ঘিরে রেখেছে ফ্রেজার রিভার। এই নদী যেন গোটা নগরীর শিরায় শিরায় প্রাণসঞ্চার করে। এখানে দক্ষিণ এশীয় মানুষের সংখ্যা কানাডার অন্য যেকোনো শহরের তুলনায় অনেক বেশি—বিশেষ করে ভারতীয়। এখানকার দুইটি ভারতীয় বাজার টরন্টোর জেরার্ড বা মাল্টনের চাইতেও বড়। চাইনিজরা সংখ্যায় দ্বিতীয়। এ ছাড়াও পূর্ব ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও দূরপ্রাচ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের বসবাস এই শহরে। পর্যটকরা বলে থাকেন—ভ্যাঙ্কুভারই হচ্ছে সত্যিকারের বহুজাতিক মানুষের শহর।

বাঙালিরা বহুদিন ধরে এখানে বসবাস করলেও কে প্রথম এসেছিলেন, কেউ তা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। কেউ কেউ এসেছিলেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করতে, কেউ বা পড়াশোনা করতে এসে আর ফিরে যাননি। এত বড় শহরে কে কোথায় থাকে, কী করে—তা জানাও সহজ নয়। ব্রিটিশ কলাম্বিয়ার রাজধানী ভিক্টোরিয়াতেও কিছু বাঙালি বসবাস করছেন।

তবে একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো—ভ্যাঙ্কুভারের বাঙালি কমিউনিটির মধ্যে একধরনের আন্তরিক সম্প্রীতি আছে। এখানে বাঙালিদের মধ্যে হতাশা নেই। সুখী বাঙালি দেখতে চাইলে আপনাকে ভ্যাঙ্কুভারেই আসতে হবে।

ভ্যাঙ্কুভার আমার কাছে শুধু একটি সফরের নাম নয়, বরং এক প্রাণময় অভিজ্ঞতা হয়ে রয়ে গেল। পাহাড়-সমুদ্রের সৌন্দর্য যেমন হৃদয় ছুঁয়েছে, তেমনি প্রবাসী বাঙালিদের উচ্ছ্বাস, রফিক-সালামের মাতৃভাষার প্রতি দায়বদ্ধতা ও কবিগুরুর স্মৃতিচিহ্ন আমাকে এক অনন্য আবেগে ভাসিয়েছে। এই শহর প্রমাণ করে দিয়েছে—প্রবাস মানেই নিঃসঙ্গতা নয়। বরং সংস্কৃতি ও স্বপ্ন যদি সঙ্গে থাকে, তবে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তেই একটি বাংলাদেশ তৈরি করা যায়।


Back to top button
🌐 Read in Your Language